৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী


৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী

কৃষ্ণ যখন কৌরবদের রাজসভায় দাঁড়িয়ে তাঁর গভীর, অমোঘ বাণী উচ্চারণ করলেন, তখন গোটা সভাগৃহ এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। যেন কোনো এক বিপুল ঝড়ের পূর্বাভাসে থমকে গেছে চরাচর। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ থেকে শুরু করে উপস্থিত রাজন্যবর্গ—কারো মুখেই কোনো শব্দ নেই। তাঁদের গা ছমছম করে উঠল, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল রোমাঞ্চে। এক আশ্চর্য ও জটিল দোলাচলে দুলতে লাগল তাঁদের মন, কিন্তু প্রকাশ্যে সে কথা উচ্চারণ করার সাহসিকতা কারও ছিল না।

সভায় তখন শ্মশানের নীরবতা। সেই অচল নীরবতা চূর্ণ করে উঠে দাঁড়ালেন মহর্ষি পরশুরাম। দুর্যোধনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে, এক দৃঢ় ও শান্ত স্বরে তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো রাজন, আজ তোমাকে এক বহু প্রাচীন সত্য শোনাই। তোমার যদি বিন্দুমাত্র হিতবোধ অবশিষ্ট থাকে, তবে এই কথা শোনো এবং সেই অনুযায়ী পথ চলো।"

 

পরশুরামের কন্ঠে ভেসে এলো এক প্রাচীন উপাখ্যান—"পুরাকালে দম্ভোদ্ভব নামে এক সার্বভৌম রাজা ছিলেন। বিপুল শক্তি আর পরাক্রমের অহংকারে তাঁর মেদিনী কাঁপত। প্রাতঃকালে উঠে তিনি ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়দের সামনে বুক চিতিয়ে দম্ভভরে জানতে চাইতেন—এই চরাচরে এমন কোনো বীর শস্ত্রধারী কি আছে, যে যুদ্ধে তাঁর সমকক্ষ হতে পারে?

রাজার এই আসফালনে ক্ষুব্ধ হয়ে একদিন কতিপয় তপস্বী ব্রাহ্মণ তাঁকে সোজা জানিয়ে দিলেন, 'রাজন! ভুল ভাবছ। এই ধরণীতে এমন দুজন পরমপুরুষ আছেন, যাঁদের পরাভূত করার ক্ষমতা তোমার কেন, এই ব্রহ্মাণ্ডের কারও নেই। তুমি গন্ধমাদন পর্বতে যাও। সেখানে নর এবং নারায়ণ নামে দুই মহাপুরুষ ঘোর তপস্যায় মগ্ন আছেন। সাহস থাকে তো তাঁদের সঙ্গে গিয়ে যুদ্ধ করো।'

অহংকারে অন্ধ দম্ভোদ্ভব কালবিলম্ব না করে বিশাল চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে ছুটে গেলেন গন্ধমাদন পর্বতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কী দেখলেন? হাড় জিরজিরে, শিরা ভেসে থাকা দুজন তপস্বী ঋষি শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার তীব্র কষ্ট সহ্য করে ধ্যানমগ্ন। রাজা উপস্থিত হতেই সেই সাধকদ্বয় অতি পরম আদরে ফল, মূল আর জল দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলেন এবং বিনীতভাবে জানতে চাইলেন, তাঁদের আশ্রমে রাজার কী প্রয়োজন?

রাজা দম্ভোদ্ভব বিকট হেসে উঠে বললেন, 'আমি ফল-মূল খেতে আসিনি , এসেছি যুদ্ধ করতে! এটাই আমার আতিথ্য।'

নর ও নারায়ণ অত্যন্ত শান্তভাবে তাঁকে বোঝালেন, 'রাজন! এটি তপস্যা ও অহিংসার স্থান। এখানে রাগ, ক্ষোভ বা হিংসার স্থান নেই। অস্ত্র এখানে অর্থহীন। তুমি অন্য কোনো ক্ষত্রিয় বীরের সন্ধান করো।'

কিন্তু পাপিষ্ঠ রাজার মাথায় তখন রক্তচক্ষু আর যুদ্ধের নেশা। বারবার প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও তিনি আকুল হয়ে যুদ্ধের জন্য জেদ করতে লাগলেন। তখন নারায়ণ একটি সাধারণ ঘাসের টুকরো  নিয়ে মুচকি হাসলেন। বললেন, 'বেশ, তবে তোমার সেনাদলকে প্রস্তুত করো।'

পরমুহূর্তেই শুরু হলো সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ড! দম্ভোদ্ভব ও তাঁর সেনারা বাণের পর বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন, আর মহর্ষি নর সামান্য সেই ঘাসের সূচালো অংশকেই এক অমোঘ অস্ত্রে রূপান্তরিত করে ছুঁড়ে দিলেন। দেখতে দেখতে গোটা আকাশ শ্বেত তৃণে ঢেকে গেল। প্রতিটি সেনার চোখ, কান, নাক ঢেকে গেল সেই দিব্য তৃণে। মুহূর্তের মধ্যে অন্ধ ও অচল হয়ে পড়ল আস্ত এক চতুরঙ্গ বাহিনী!

রাজা দম্ভোদ্ভব বুঝতে পারলেন, তিনি ঈশ্বরদ্রোহিতা করেছেন। অহংকার চূর্ণ হয়ে রাজদণ্ড ধূলিসাৎ হলো। তিনি মুনিদ্বয়ের পায়ে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, 'আমাকে রক্ষা করুন! রক্ষা করুন!'

শরণাগতবৎসল নর তাঁকে ক্ষমা করে বললেন, 'রাজন, অহংকার ত্যাগ করো। ব্রাহ্মণ ও ধর্মের সেবা করো। জিতেন্দ্রিয়, শান্ত ও ক্ষমাশীল হয়ে প্রজাপালন করো। ভবিষ্যতে কোনোদিন সাধুপুরুষকে অপমান কোরো না।'

রাজা দম্ভোদ্ভব লজ্জিত মুখে নিজ নগরে ফিরে গিয়ে ধর্মাচরণ করতে লাগলেন।"

গল্প শেষ করে পরশুরাম তীব্র চোখে দুর্যোধনের দিকে চাইলেন। বললেন, "দুর্যোধন, সেই প্রাচীনকালের ‘নর’ই আজকের এই অর্জুন। আর তাঁর সঙ্গে যিনি সনাতন ‘নারায়ণ’, তিনি স্বয়ং এই কৃষ্ণ। অর্জুনের ধনুকে বাণ ওঠার আগেই নিজের মেকি অহংকার বিসর্জন দিয়ে তাঁর শরণ নাও। অর্জুন ও কৃষ্ণ—এঁরা সাধারণ মানব নন, পুরুষোত্তম। সুতরাং এখনো সময় আছে, পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করো।"

পরশুরাম থামতেই মহর্ষি কণ্ব উঠে দাঁড়িয়ে দুর্যোধনকে সাবধান করলেন, "ব্রহ্মা, নর ও নারায়ণ অক্ষয়। এই সৃষ্টিতে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, বাতাস—সবকিছুই প্রলয়ের সময় লীন হয়ে যায়, কিন্তু বিষ্ণু নিত্য ও অবিনাশী। সেই বিষ্ণুই আজ কৃষ্ণরূপে বিদ্যমান। দুর্যোধন, মনে কোরো না তুমিই সবচেয়ে বড় বলবান। পাণ্ডবরা দেবতা তুল্য পরাক্রান্ত—বায়ু, ইন্দ্র, ধর্ম ও অশ্বিনীকুমারদের সন্তান। মহাতপস্বী দেবর্ষি নারদও এখানে উপস্থিত, যিনি পরমাত্মার মাহাত্ম্য জানেন। তুমি কুলরক্ষার স্বার্থে কৃষ্ণের কথা মান্য করে সন্ধি করো।"

কিন্তু যাকে বিধাতা বিনাশ করতে চান, তার বুদ্ধি আগেই হৃত হয়।

মহর্ষি কণ্বের এত গভীর উপদেশ দুর্যোধনের পাপাচ্ছন্ন হৃদয়ে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করতে পারল না। তিনি এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের চাউনি আরও বাঁকা, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল। মহর্ষির মহৎ বাণীকে তাচ্ছিল্যের হাসিতে উড়িয়ে দিয়ে দুর্যোধন নিজ উরুতে সশব্দে তাল ঠুকে উঠলেন

উদ্ধত স্বরে অবজ্ঞার সাথে বলে উঠলেন, "মহর্ষি! বিধাতা আমাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন, আমার নিয়তি যা লিখেছে, আমি তো তেমনই আচরণ করব। আপনার এই দীর্ঘ উপদেশে আর কী-ই বা এসে যায়?"

কৌরব রাজসভা স্তব্ধ হয়ে রইল এক অন্ধ ও নিশ্চিত মহাবিনাশের প্রতীক্ষায়।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩২তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ৩১তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)