২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা!
২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা!
কৌরব সভায় তখন থমথমে নিস্তব্ধতা। সঞ্জয়ের দীর্ঘ বিবরণ শেষ হতেই শান্তনুনন্দন ভীষ্ম সোজা দুর্যোধনের দিকে স্থির দৃষ্টি পাত করে উঠে দাঁড়ালেন। কঠোর কণ্ঠে বললেন— "দুর্যোধন, একটি অতি প্রাচীন সত্যের কথা শোনো। বহুকাল আগে দেবগুরু বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে পরিবৃত্ত করে ব্রহ্মা যখন আসীন ছিলেন, ঠিক সেই সময় দুজন পরম তেজস্বী ঋষি নিজেদের অলৌকিক প্রভাবে সকলের চিত্ত ও জ্যোতি হরণ করে সেখান থেকে চলে যান। স্তব্ধ বৃহস্পতির প্রশ্নের উত্তরে ব্রহ্মা বলেছিলেন, এঁরা সাধারণ কোনো তাপস নন—স্বয়ং সনাতন নর ও নারায়ণ। জগতের কল্যাণ সাধনে এবং অসুর বিনাশে তাঁরা একই পরম সত্তার দুটি ভিন্ন রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন। আজ সেই প্রাচীন নরই অর্জুন, আর নারায়ণ হলেন শ্রীকৃষ্ণ। যেদিন শঙ্খ-চক্র-গদা ধারণকারী কৃষ্ণের পাশে গাণ্ডীব হাতে অর্জুনকে একই রথে দেখতে পাবে, সেদিন আমার এই সতর্কবাণী তোমার মনে পড়বে। তুমি আজ সূতপুত্র কর্ণের দম্ভ, শকুনির কুটিল চক্রান্ত আর দুঃশাসনের মূঢ়তার ওপর ভরসা করে কৌরব বংশকে ঘোর বিনাশের মুখে ঠেলে দিচ্ছ।"
পিতামহের এই তীব্র তিরস্কার সহ্য করতে না পেরে কর্ণ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে উঠলেন— "পিতামহ! বয়সের দোহাই দিয়ে আপনি আমার প্রতি এমন অন্যায় বাক্যাস্ত্র প্রয়োগ করতে পারেন না। আমি ক্ষত্রিয়ধর্মে স্থির, দুর্যোধনের একান্ত অনুগত। আমি এমন কী অপরাধ করেছি যে সর্বদা আমার নিন্দা করেন? পাণ্ডবদের ধ্বংস করতে আমি একাই যথেষ্ট।"
কর্ণের আত্মশ্লাঘা শুনে পিতামহ ভীষ্মের কণ্ঠস্বরে ছড়িয়ে পড়ল প্রগাঢ় অবজ্ঞা। তিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে বললেন— "মহারাজ! এই সূতপুত্রের ফাঁকা আস্ফালন আর বাচালতাই আপনার পুত্রদের মতিচ্ছন্ন ঘটিয়েছে। পাণ্ডবদের ষোলো ভাগের এক ভাগ পরাক্রমও এর নেই। বিরাট নগরে যখন অর্জুন এর চোখের সামনে প্রিয় ভ্রাতাকে বধ করল, তখন কোথায় ছিল এর আস্ফালন? অর্জুন যখন একাই কৌরব বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে এর পরাধেয় বস্ত্র কেড়ে নিল, কিংবা ঘোষযাত্রায় গন্ধর্বরা যখন দুর্যোধনকে বন্দী করল—তখন এই বীর কোথায় আত্মগোপন করেছিল? সেদিন তো ওই ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবই গন্ধর্বদের পরাস্ত করে আপনার পুত্রকে মুক্ত করেছিল। এই বাচাল লোকটাই কৌরবদের ধর্ম ও অর্থ দুই-ই নষ্ট করবে।"
আচার্য দ্রোণ পিতামহের কথার পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন— "মহারাজ, ভরতশ্রেষ্ঠ ভীষ্ম যা বলছেন, তা-ই শিরোধার্য করুন। লোভ ও মোহে অন্ধ পরামর্শদাতাদের কথায় কান না দিয়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে অবিলম্বে সন্ধি করাই একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ। অর্জুনের সমকক্ষ ধনুর্ধর এই ত্রিভুবনে দ্বিতীয় কেউ নেই।"
কিন্তু প্রজ্ঞাহীন ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম বা দ্রোণের হিতোপদেশে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে সঞ্জয়ের দিকে ফিরে আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— "সঞ্জয়! আমাদের এই বিপুল বাহিনীর প্রস্তুতির কথা শুনে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কী সিদ্ধান্ত নিলেন? কারা তাঁদের হয়ে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত?"
সঞ্জয় ধীর ও গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন— "মহারাজ, পাঞ্চাল, মৎস্য ও কেকয় রাজারা সবাই রাজা যুধিষ্ঠিরের একটিমাত্র নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও হিড়িম্ব রাক্ষস পাণ্ডবদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। দশ হাজার হস্তীর বলধারী ভীমসেন, যিনি বারণাবতের অগ্নিগ্রাস থেকে ভাইদের রক্ষা করেছিলেন এবং ক্রোধবশ রাক্ষসদের নিধন করেছিলেন, তিনি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন। আর অর্জুনের কথা নতুন করে কী বলব? যিনি পশুপত অস্ত্রের জন্য স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবকে যুদ্ধে সন্তুষ্ট করেছিলেন এবং সমস্ত লোকপালকে পরাস্ত করেছিলেন, তিনি ও কৃষ্ণই পাণ্ডবদের প্রধান শক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন নকুল, সহদেব এবং আপনার বংশের কালস্বরূপ শিখণ্ডী।"
সঞ্জয় আরও যোগ করলেন— "যাদববীর সাত্যকি, কেকয়ের পঞ্চভ্রাতা, পরাক্রান্ত কাশীরাজ এবং বীরত্বে কৃষ্ণের সমকক্ষ অভিমন্যু পাণ্ডবদের হয়ে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত। শিশুপালপুত্র, জরাসন্ধপুত্র সহদেব, জয়ৎসেন এবং মহাতেজস্বী দ্রুপদ বিশাল অক্ষৌহিণী বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত। পূর্ব ও উত্তর ভারতের বহু মহাবলশালী নৃপতি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সমর্থনে একত্রিত হয়েছেন। এই মহতী শক্তির মুখোমুখি হওয়ার আগে কৌরবপক্ষের সত্যটা উপলব্ধি করা প্রয়োজন।"
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২০তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ১৯তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment