২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত


২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত

প্রাতঃকালের স্নান-আহ্নিক সাঙ্গ করে বৃকস্থল থেকে যখন তিনি রথে উঠলেন, সকালের সোনাঝরা রোদে তাঁর তামাটে ত্বক চকচক করছিল। রথের চাকার ধূলো উড়িয়ে হস্তিনাপুরের দিকে যাত্রা শুরু হতেই গ্রামবাসীরা কিছু দূর সঙ্গে এল বটে, কিন্তু তাঁর মৃদু হাসির ইশারায় আবার ফিরেও গেল। হস্তিনাপুরের ঠিক সীমান্তে তখন এক রাজকীয় অভ্যর্থনার তোড়জোড়। দুর্যোধন ছাড়া ধৃতরাষ্ট্রের বাকী সব পুত্র, আর তাঁদের সঙ্গে ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপের মতো মহাধ্যানীরা দাঁড়িয়ে আছেন রাজকীয় পোশাকে। কৌতূহলী নগরবাসীর ভিড়—কেউ হেঁটে, কেউ গরুর গাড়িতে, কেউ বা ঘোড়ায় চড়ে এসেছে এই এক অলৌকিক মানুষকে চোখের দেখা দেখতে। পথজুড়ে রঙিন পতাকায় সাজানো নগরী, রাস্তায় রাস্তায় সুগন্ধি জল ছিটানো।

  

জনতার নতমস্তক অভিবাদন আর করতালির মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে এসে পৌঁছালেন ধৃতরাষ্ট্রের রাজপ্রাসাদে।

তিন-তিনটি ভারী ফটক পেরিয়ে তিনি যখন প্রধান সভায় প্রবেশ করলেন, অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ ভীষ্ম—সকলেই সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত স্থৈর্য ছিল। রাজপুরুষদের মর্যাদানুযায়ী সম্মান জানিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের প্রার্থনায় বসলেন তাঁর জন্য রাখা একটি নিখাদ সোনার সিংহাসনে। ক্ষণেকের সেই সৌজন্য বিনিময় শেষ হতেই তিনি কুরুরাজের অনুমতি নিয়ে সোজা চলে গেলেন বিদুরের গৃহে।

  

বিদুর চিরকালই অন্য ধাতুতে গড়া। কৃষ্ণকে ঘরে পেয়ে তিনি মাঙ্গলিক উপচারে পুজো করলেন, তারপর দু-হাত জোড় করে বললেন, "কমলনয়ন! তুমি সর্বভূতের অন্তরাত্মা, আজ তোমাকে দেখে যে আনন্দ হচ্ছে, তা মুখে প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার নেই।"

ভোজন শেষে ধর্মাত্মা বিদুর পাণ্ডবদের কথা জানতে চাইলে, কৃষ্ণ গোপন না করে তাঁদের সমস্ত পরিকল্পনার কথা সবিস্তারে বিদুরকে খুলে বললেন।

  

দুপুরের রোদ যখন কিছুটা ঢলে পড়েছে, কৃষ্ণ গেলেন পিসিমা কুন্তীর কাছে। কৃষ্ণকে দেখামাত্র কুন্তী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতুষ্পুত্রকে দেখে। হাহাকার করে উঠল এক মায়ের হৃদয়: "মাধব! আমার ছেলেরা ছোটবেলা থেকে সত্যবাদী, গুরুজনসেবী। কৌরবরা ছলে-বলে-কৌশলে ওদের বনবাসী করল। যে যুধিষ্ঠির গোটা পৃথিবীর রাজা হওয়ার যোগ্য, সে আজ বনের ধুলোয় বসে দিন কাটাচ্ছে! দশ হাজার হাতির বলধারী ভীম, যার ভয়ে হিড়িম্ব-কীচকেরা কেঁপে উঠত, সে কেমন আছে? যে অর্জুনের তেজে সূর্যও যেন ম্লান হয়ে যায়, সেই আমার ধনুর্ধর ধনঞ্জয় কুশলে তো? আর আমার সুকুমার দুই ছেলে নকুল-সহদেব... আর দ্রৌপদী? নিজের সন্তানদের ফেলে রেখে পতিদের সেবায় যে বনে চলে গেল, সেই আমার সর্বগুণসম্পন্না লক্ষ্মী বউটা ভালো আছে তো কৃষ্ণ?"

  

চোখের জল মুছতে মুছতে কুন্তীর কণ্ঠে নেমে এল এক কঠোর তেজস্বিতা। যেন এক রাজমাতার চরম হুঙ্কার: "যুধিষ্ঠিরকে বোলো—রাজ্য হারানো বা বনে থাকা কোনো দুঃখের নয়। কিন্তু ভরা সভায় একবস্ত্রা, রজস্বলা দ্রৌপদীর চুল ধরে যেভাবে অপমান করা হয়েছে, বীর পতিরা থাকতেও ও যেভাবে অনাথের মতো কেঁদেছে—তা আমি ভুলিনি। ভীম আর অর্জুনকে বোলো, ক্ষত্রিয় রমণী যে উদ্দেশ্যে পুত্র প্রসব করে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেছে। এবার যদি নিজের পরাক্রম না দেখায়, তবে আমি আর ওদের মুখদর্শন করব না!"

কৃষ্ণের চোখের দৃষ্টি তখন স্থির। তিনি কুন্তীর হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর শান্ত গলায় বললেন, "পিসিমা, তোমার মতো বীরমাতা আর এই সংসারে ক-জন আছে? পাণ্ডবরা ক্ষুধা-পিপাসা, শীত-গ্রীষ্ম জয় করে বীরের মতোই আছেন। শীঘ্রই তুমি ওদের জয়মাল্য পরতে দেখবে। শত্রুদের বিনাশ আসন্ন।"

কৃষ্ণের এই অভয়বাণীতে কুন্তীর বিষাদ যেন এক লহমায় কেটে গিয়ে এক অলৌকিক শ্রদ্ধায় পরিণত হলো। তিনি কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, "কৃষ্ণ, তুমিই আমাদের বংশের মূর্তিমান ধর্ম আর তপস্যা। তোমার দ্বারা সবই সত্য হবে।"

কুন্তীর আশীর্বাদ ও অনুমতি নিয়ে, তাঁকে প্রদক্ষিণ করে মহাবাহু শ্রীকৃষ্ণ ধীর পায়ে হেঁটে চললেন দুর্যোধনের প্রাসাদের দিকে। হস্তিনাপুরের বাতাসে তখন যুদ্ধের বারুদ ঘন হয়ে আসছে।

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৯তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ২৮তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)