২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার


২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার

​ধৃতরাষ্ট্রের দুই চোখের অন্ধকার যেন আজ আরও ঘন হয়ে এসেছে। সঞ্জয়ের মুখে পাণ্ডবশিবিরের প্রস্তুতির বিবরণ শুনতে শুনতে বৃদ্ধ রাজার বুক কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কায়।

​সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভগ্নকণ্ঠে ধৃতরাষ্ট্র বললেন—

"সঞ্জয়, তুমি যাদের কথা বললে, তারা প্রত্যেকেই এক-একজন দিগ্বিজয়ী বীর। কিন্তু সেই বিশাল তালিকার একপাশে সবাইকে রাখো, আর অন্যপাশে একক ভীমকে বসাও। বনের হিংস্র জীবেরা যেমন সিংহকে দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপে, রাতভর এই ভীমের কথা ভেবে আমারও চোখের পাতা এক হয় না। কৌরবদের প্রতি তার ঘৃণা অপরসীম, প্রতিশোধের আগুন তার চোখে জ্বলছে। সে মহা শক্তিশালী, একরোখা আর উন্মত্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে সে যে আমার দুর্বল পুত্রদের কচুকাটা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলেবেলায় যখন ও আমার ছেলেদের সঙ্গে সাধারণ খেলাধুলো করত, তখনই ওদের হাতির মতো পিষে মারত। আর আজ যখন ও হাতে গদা তুলে নিয়ে রণক্ষেত্রে তাণ্ডব নাচ নাচবে, তখন রথ, হাতি, ঘোড়া আর মানুষের মাংসখণ্ড বাতাসে উড়বে। মগধের রাজচক্রবর্তী জরাসন্ধকে মনে আছে তো? কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে তার রাজপ্রাসাদে ঢুকে ভীম তাকে খালি হাতে চিড়ে ফেলেছিল। ভীমের বল শুধু আমি নই, ভীষ্ম, দ্রোণ আর কৃপাচার্যও ভালোই জানেন। বিদুর তো অনেক আগেই এই সর্বনাশের কথা সতর্ক করেছিল, আমরাই শুধু শুনিনি। পাশা খেলার সেই পাপই আজ কৌরবদের বিনাশ ডেকে আনছে। রাজ্য আর ঐশ্বর্যের লোভে আমি যে পাপ করেছি, তার মূল্য এখন মেটাতে হবে। হায় সঞ্জয়! আমি কোথায় যাব? কী করব? আমার এই মূর্খ পুত্রেরা কালের ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুর মুখে হেঁটে যাচ্ছে। এক এক করে একশো পুতুলের মতো ছেলেকে হারিয়ে যখন আমাকে তাদের বিধবা স্ত্রীদের বিলাপ শুনতে হবে, তখন মৃত্যুই বা কেন আমাকে মুক্তি দিতে আসবে? হাওয়া পেলে যেমন শুকনো ঘাসের বন এক পলকে ছাই হয়ে যায়, অর্জুন পাশে থাকলে ভীমও তেমনই আমার গোটা বংশকে ভস্ম করে দেবে।"

​একটু থেমে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন অন্ধ রাজা—

"সঞ্জয়, আমার জীবনে আমি যুধিষ্ঠিরকে কোনোদিন একটা মিথ্যা কথা বলতে শুনিনি। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অর্জুন। এমন কোনো বীর আমি দেখছি না, যে অর্জুনের গাণ্ডীবের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রোণাচার্য আর কর্ণ হয়তো এগোবেন, কিন্তু তাঁরাও অর্জুনকে হারাতে পারবেন—এ বিশ্বাস আমার নেই। অর্জুন তো দেবতাদেরও যুদ্ধে পরাস্ত করেছে! তার ওপর, যার রথের সারথি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তাকে কালান্তক যমের মতো পরাজিত করা অসম্ভব। সঞ্জয়! পাঞ্চাল, কেকয়, মৎস্য আর মগধের রাজারা তো শুধু সৈন্য নয়, তারা পাণ্ডবদের জন্য প্রাণ দিতে এসেছে। দেবকীনন্দন কৃষ্ণ যদি ইচ্ছা করেন, তবে ইন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে এক মুহূর্তে ত্রিলোক জয় করতে পারেন। সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন—সবাই আজ মৃত্যুর দূত হয়ে তৈরি। যুধিষ্ঠিরের শান্ত মুখের ভেতরের আগুন, অর্জুনের ধনুক, আর ভীম-নকুল-সহদেবের এই যৌথ ক্রোধে পুরো কুরুকুল ছারখার হয়ে যাবে। ওহে কৌরবগণ! আমার শেষ কথা শোনো—যুদ্ধ কোরো না। পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করাই একমাত্র বাঁচার পথ।"

​ধৃতরাষ্ট্রের এই হাহাকার শুনে সঞ্জয় নিচু স্বরে বললেন—

"মহারাজ, আপনি সত্যই বলেছেন। গাণ্ডীবের আগুনে সমস্ত ক্ষত্রিয়কুল ভস্ম হতে চলেছে। এই যে কুরুজাঙ্গল আর সুবিশাল সাম্রাজ্য আপনারা ভোগ করছেন, এ তো পাণ্ডবদেরই বাহুবলে জেতা রাজ্য! আপনারা তো শুধু প্রস্তুত থালায় ভাত খেয়েছেন। গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন যখন দুর্যোধনকে বন্দী করেছিল, তখন এই অর্জুনই তাকে মুক্ত করে এনেছিল। ধনুকের মধ্যে গাণ্ডীব শ্রেষ্ঠ, পুরুষোত্তম কৃষ্ণ শ্রেষ্ঠ, আর রথের ধ্বজায় স্বয়ং হনুমান বিরাজমান—এই চার শক্তির মিলন যেখানে, সেখানে জয় সুনিশ্চিত। ভীম আর অর্জুন যার পক্ষে, সমস্ত পৃথিবী আজ তারই চরণে নত হবে।"

বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২১তম ভাগের আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ২০তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)