পঞ্চমভাগ উদ্যোগপর্ব- (বিদুর নীতি-প্রথম অধ্যায়) -নিদ্রাহীন রাজা আর বিদুরের সেই রাতের উপদেশ
পঞ্চমভাগ উদ্যোগপর্ব- (বিদুর নীতি-প্রথম অধ্যায়) -নিদ্রাহীন রাজা আর বিদুরের সেই রাতের উপদেশ:
(মহাভারতের 'শিল্প ও নীতি শাস্ত্রের' অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন হলো বিদুর নীতি (Vidura Niti)। এটি মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে (Udyoga Parva) বর্ণিত ধৃতরাষ্ট্র এবং মহাত্মা বিদুরের মধ্যকার এক ঐতিহাসিক সংলাপে ফুটে উঠেছে।)
সঞ্জয় বিদায় নিতেই বুদ্ধিমান রাজা ধৃতরাষ্ট্র দ্বারপালকে ডেকে বললেন, "বিদুরের সঙ্গে কথা বলতে চাই, তাঁকে এক্ষুনি ডেকে আনো।"
সঞ্জয়ের কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন
বি:দ্র: বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত জানতে এখানে ক্লিক করুন
দূত গিয়ে বিদুরকে খবর দিল—মহারাজ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। বিদুর তখনই রাজপ্রাসাদে এলেন, দ্বারপালকে বললেন তাঁর আসার খবরটা রাজাকে জানাতে। ধৃতরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "বিদুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমার কোনো সময়ই অসময় নয়, তাঁকে ভেতরে নিয়ে এসো।"
বিদুর ভেতরে গিয়ে দেখলেন রাজা চিন্তায় ডুবে আছেন। হাতজোড় করে বললেন, "মহারাজ, আমি বিদুর, আপনার ডাকে এসেছি। বলুন, কী সেবা করতে পারি।"
ধৃতরাষ্ট্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বিদুর, সঞ্জয় এসেছিল। অনেক কথা বলে গেছে, ভালো-মন্দ দুটোই। কাল সভায় সে যুধিষ্ঠিরের কথা বলবে। কিন্তু আজ রাতে কুরুবীর যুধিষ্ঠিরের সব খবর জানতে না পেরে আমার মন অস্থির হয়ে আছে, ঘুম আসছে না। তুমি ধর্ম আর অর্থশাস্ত্রে পারদর্শী, আমার মঙ্গলের জন্য যা বলার তুমি বলো। সঞ্জয় ফিরে আসার পর থেকে আমার শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে। কাল সভায় সে কী বলবে, সেই ভাবনাতেই আমি ছটফট করছি।"
বিদুর একটু থমকে থেকে বললেন, "মহারাজ, রাত জেগে থাকার রোগ তো তিন রকম মানুষের হয়—যে দুর্বল অথচ শক্তিশালীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে, যে কামাসক্ত, আর যে চোর। আপনার মধ্যেও কি এমন কোনো বড় দোষ ঢুকে পড়েছে? অন্যের সম্পদের লোভেই কি আপনার এই কষ্ট?"
ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "আমি তোমার কাছ থেকে ধর্মের কথা, মঙ্গলের কথা শুনতে চাই। এই রাজবংশে তুমিই একমাত্র মানুষ, যাকে বিদ্বানরাও মান্য করেন।"
বিদুর তখন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন। বললেন, যুধিষ্ঠির আসলে ত্রিভুবনের অধিপতি হওয়ার যোগ্য, কারণ তাঁর মধ্যে সেই সব লক্ষণই আছে। তিনি সবসময় ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞা পালন করে এসেছেন, অথচ তাঁকেই বনে পাঠানো হয়েছে। ধৃতরাষ্ট্র ধর্ম জানেন, ধর্মাত্মাও বটে—কিন্তু চোখ না থাকায় যুধিষ্ঠিরের প্রকৃত মূল্য তিনি চিনতে পারেননি, তাই তাঁর প্রতি এমন আচরণ করেছেন, রাজ্যাংশও ফিরিয়ে দিতে গড়িমসি করছেন। যুধিষ্ঠিরের মধ্যে নিষ্ঠুরতা নেই, আছে দয়া, ধর্ম, সত্য আর বীরত্ব। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি এখনও ধৃতরাষ্ট্রকে শ্রদ্ধা করেন। এই সব গুণের জন্যই তিনি এত কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করছেন। তাহলে দুর্যোধন, শকুনি, কর্ণ, দুঃশাসনের মতো অযোগ্য মানুষের হাতে রাজ্যের ভার দিয়ে ধৃতরাষ্ট্র আসলে কীভাবে নিজের ঐশ্বর্য বাড়াতে চান?
তারপর বিদুর যেন এক নদীর মতো বয়ে চললেন জ্ঞানের কথায়—কে আসলে পণ্ডিত, কে মূর্খ, সেই পার্থক্যটা কীভাবে বোঝা যায়।
যে মানুষ নিজের অবস্থান বোঝেন, কষ্ট সহ্য করতে জানেন, ধর্মে অটল থাকেন, যাঁকে কোনো লোভ নিজের পথ থেকে সরাতে পারে না—তিনিই পণ্ডিত। যিনি ভালো কাজ করেন, মন্দ থেকে দূরে থাকেন, শ্রদ্ধাশীল—তিনিই পণ্ডিতের যোগ্য। রাগ, আনন্দ, অহংকার, লজ্জা—এসব যাকে টলাতে পারে না, নিজেকে বড় ভাবার অহংকার যাকে গ্রাস করে না, তাকেই পণ্ডিত বলে। যাঁর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ টেরই পায় না তাঁর পরিকল্পনার কথা—তিনিই আসল পণ্ডিত। শীত-গ্রীষ্ম, ভয়-ভালোবাসা, ধন-দারিদ্র্য—কোনোকিছুই যাঁর কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তিনিই পণ্ডিত। যাঁর বুদ্ধি সবসময় ধর্ম আর অর্থের পথে চলে, যিনি ভোগবিলাস ছেড়ে পুরুষার্থকেই বেছে নেন—তিনিই পণ্ডিত।
বিদুর বলে চললেন—বিবেকী মানুষ নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করেন, কোনো কিছুকেই তুচ্ছ মনে করে অবহেলা করেন না। কথা ধৈর্য ধরে শোনা, তার মর্মটা দ্রুত বুঝে নেওয়া, বোঝার পর সঠিক পথে এগোনো—এটাই পণ্ডিতের লক্ষণ। যা হারিয়ে গেছে তার জন্য শোক না করা, বিপদে বুদ্ধি না হারানো, কাজ শুরু করার আগে ভেবে নেওয়া, তারপর মাঝপথে না থামা—এসবই পণ্ডিতের গুণ। যিনি সম্মান পেয়ে অতি আনন্দিত হন না, অসম্মানে দুঃখী হন না, গঙ্গার মতো শান্ত থাকে যাঁর মন—তিনিই পণ্ডিত।
মূর্খের কথাও বললেন বিদুর। যে না পড়েই গর্ব করে, গরিব হয়েও বড় বড় কথা বলে, বিনা পরিশ্রমে ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে—সে মূর্খ। নিজের কাজ ছেড়ে অন্যের কাজ করা, বন্ধুর সঙ্গেও শত্রুর মতো ব্যবহার করা—এও মূর্খতা। যে নিজের চেয়ে শক্তিশালীর সঙ্গে শত্রুতা করে, শত্রুকে বন্ধু ভাবে আর বন্ধুকে কষ্ট দেয়—সে বোকা। এমন মানুষ ডাকা ছাড়াই কারো ঘরে ঢোকে, জিজ্ঞেস না করলেও অনেক কথা বলে, অবিশ্বাসী মানুষকে বিশ্বাস করে বসে।
বিদুর একটু থেমে বললেন, নিজের দোষ থাকা সত্ত্বেও যে অন্যের দোষ ধরে বেড়ায়, নিজে অক্ষম হয়েও যে অকারণে রাগ করে—সে চূড়ান্ত মূর্খ। যে নিজের সাধ্য না বুঝে অসাধ্য জিনিস পেতে চায়, ধর্ম আর অর্থের বিরুদ্ধে গিয়েও কিছু পাওয়ার আশা করে—তাকে জগৎ মূঢ়বুদ্ধি বলে। যিনি অনেক ধন, বিদ্যা, ঐশ্বর্য পেয়েও অহংকারী হন না—তিনিই পণ্ডিত। কিন্তু যে নিজে ভালো খায়, ভালো পরে, অথচ যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার, তাদের বঞ্চিত করে—তার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কে?
এক জায়গায় বিদুর বললেন একটা গভীর কথা—একজন মানুষ পাপ করে, অনেকে তা নিয়ে মজা করে। মজা করা মানুষরা পার পেয়ে যায়, কিন্তু পাপী নিজেই তার দোষের ভাগী হয়। কোনো তীর হয়তো লক্ষ্যভেদ নাও করতে পারে, কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধি চাইলে গোটা রাজ্যকেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
এরপর বিদুর এক অদ্ভুত সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে নীতিকথা সাজালেন—এক থেকে দশ পর্যন্ত। এক বুদ্ধি দিয়ে দুই ধরনের কর্তব্য-অকর্তব্য ঠিক করে, তিন ধরনের মানুষকে (শত্রু-মিত্র-উদাসীন) বশে এনে, চার উপায়ে (সাম-দান-দণ্ড-ভেদ), পাঁচ ইন্দ্রিয়কে জয় করে, ছয় গুণ জেনে, সাতটা দোষ ত্যাগ করে মানুষ সুখী হতে পারে। বিষ শুধু একজনকে মারে, অস্ত্র শুধু একজনকে আঘাত করে, কিন্তু ভুল পরামর্শ গোটা রাজ্য আর রাজাকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। একা ভালো খাবার খাওয়া উচিত নয়, একা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, একা পথ চলা ঠিক নয়—আর সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন জেগে থাকতে হয়।
তারপর বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে সরাসরি বললেন—"রাজন, সমুদ্র পার হতে যেমন নৌকা ছাড়া উপায় নেই, স্বর্গে যাওয়ার একমাত্র সিঁড়িও তেমনই সত্য। কিন্তু আপনি সেটা বুঝতে পারছেন না।"
ক্ষমার কথাও বললেন তিনি। ক্ষমাশীল মানুষের একটাই দোষ ধরা হয়—লোকে তাকে অক্ষম ভাবে। কিন্তু আসলে ক্ষমাই সবচেয়ে বড় শক্তি। অক্ষম মানুষের গুণ যদি ক্ষমা হয়, তবে সক্ষম মানুষের সেটাই ভূষণ। যার হাতে শান্তির তলোয়ার, দুষ্ট লোক তার কী করবে? খড়কুটো না থাকলে আগুন এমনিতেই নিভে যায়। ধর্মই একমাত্র প্রকৃত কল্যাণ, ক্ষমাই শান্তির শ্রেষ্ঠ পথ, বিদ্যাই একমাত্র সন্তোষ, অহিংসাই একমাত্র প্রকৃত সুখ।
বিদুর এরপর ধৃতরাষ্ট্রকে একটা রূপক দিয়ে সতর্ক করলেন—জলের ব্যাঙকে যেমন সাপ গিলে খায়, তেমনই শত্রুকে প্রতিরোধ না করা রাজাকে, আর তীর্থ না করা ব্রাহ্মণকে এই পৃথিবী শেষ করে দেয়। যারা কড়া কথা বলে না, দুষ্টকে সম্মান দেয় না, তারাই এই জগতে আসল সম্মান পায়।
আরও অনেক কথা বললেন বিদুর—কাম, ক্রোধ আর লোভ, এই তিনটে নরকের দরজা, এগুলো ত্যাগ করা উচিত। ভক্ত, সেবক, আর যে বলে "আমি আপনার শরণাগত"—এই তিন ধরনের মানুষকে বিপদেও ত্যাগ করা উচিত নয়। নিজের ঘরে সবসময় চার ধরনের মানুষকে জায়গা দেওয়া উচিত—বৃদ্ধ আত্মীয়, বিপদগ্রস্ত উচ্চকুলজাত মানুষ, দরিদ্র বন্ধু, আর সন্তানহীনা বোন।
কাম-ক্রোধ ছেড়ে যে সঠিক পাত্রে দান করে, যে শাস্ত্র জানে আর কর্তব্য দ্রুত সম্পন্ন করে—তাকেই সবাই আদর্শ মানে। যে মানুষের ওপর সবাই বিশ্বাস রাখতে পারে, যে অপরাধ প্রমাণিত হলে তবেই শাস্তি দেয়, দণ্ড আর ক্ষমার মাত্রা বোঝে—প্রজারা তার সেবায় ছুটে আসে। যে দুর্বলকে অপমান করে না, শত্রুর সঙ্গে বুদ্ধি দিয়ে ব্যবহার করে, বলবানের সঙ্গে অকারণ লড়াই এড়িয়ে চলে, সময়মতো শক্তি দেখায়—সে-ই আসল ধীর মানুষ।
বিদুর বললেন, বিপদে যে দুঃখী না হয়ে সাবধানে উদ্যোগ নেয়, পরিস্থিতি বুঝে কষ্ট সহ্য করে, তার শত্রু হারতে বাধ্য। যে অকারণে বিদেশে থাকে না, পাপীর সঙ্গে মেশে না, পরস্ত্রীর দিকে তাকায় না, অহংকার-চুরি-মদ্যপান করে না—সে সবসময় সুখী। যে ক্রোধে বা তাড়াহুড়োয় ধর্ম-অর্থ-কাম নষ্ট করে না, মিথ্যা বলে না, বন্ধুর জন্য অকারণে ঝগড়া করে না, অসম্মানে ক্ষুব্ধ হয় না, নিজের বিবেক ত্যাগ করে না, অন্যের দোষ খোঁজে না, সবার প্রতি সদয়—এমন মানুষ সবজায়গায় প্রশংসিত হয়।
যে উগ্র সাজ ধরে না, নিজের বীরত্ব নিয়ে অহংকার করে না, রেগে গেলেও কটু কথা বলে না—তাকে সবাই ভালোবাসে। শান্ত শত্রুকে যে আবার খুঁচিয়ে তোলে না, গর্বও করে না, দীনতাও দেখায় না, "আমি বিপদে আছি" বলে অন্যায় করে না—সেই মানুষকেই আর্যরা সবচেয়ে বড় বলে মানেন।
শেষে বিদুর ফিরে এলেন আসল কথায়। বললেন, "অম্বিকানন্দন, শাপগ্রস্ত পাণ্ডুর যে পাঁচ ছেলে বনে জন্মেছিলেন, তাঁরা সত্যিকারের বলবান, আর তাঁদের তো আপনিই ছোটবেলা থেকে লালনপালন করেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁরাও তো আপনার আদেশ মেনেই চলেছেন। তাত, এবার তাঁদের ন্যায্য রাজ্যাংশ ফিরিয়ে দিন, নিজের পুত্রদের সঙ্গে তাঁদেরও নিয়ে আনন্দে থাকুন। রাজন, এভাবে করলে দেবতা আর মানুষ, কেউই আর আপনার সমালোচনা করতে পারবে না।"
ঘরের প্রদীপটা তখন টিমটিম করে জ্বলছিল। বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। আর অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র বসে রইলেন, শুনলেন সব, কিন্তু মনের গভীরে সেই পুরনো মোহ আর পুত্রস্নেহ তখনও তাঁকে ছেড়ে যায়নি।
বি:দ্র:পরবর্তী ভাগে থাকবে উদ্যোগপর্বের বিদুর নীতি-দ্বিতীয় অধ্যায়
বি:দ্র: পাঠকদের সুবিধার্থে উপরিউক্ত অংশটি মহাভারতের 'উদ্যোগ পর্ব'-এর অন্তর্গত বিখ্যাত বিদুর নীতি-র প্রথম অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ- নিচে মূল বিষয়গুলোকে সহজ ও প্রাঞ্জল পয়েন্টে তুলে ধরা হলো:
১. ধৃতরাষ্ট্রের মানসিক অস্থিরতা ও বিদুরের আগমন
সঞ্জয়ের বার্তা শোনার পর অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যান এবং রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলেন।
ধৃতরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ জানতে পেরে গভীর রাতে মহাত্মা বিদুর তাঁর কাছে উপস্থিত হন।
২. পাপ ও মোহের প্রতি বিদুরের ইঙ্গিত
বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, কেবল চোর, কামাসক্ত এবং দুর্বল হয়ে শক্তিশালীর সঙ্গে বিরোধে জড়ানো মানুষই রাতে ঘুমাতে পারে না।
যুধিষ্ঠিরের মতো ধার্মিক, ক্ষমতাবান ও অনুগত রাজপুত্রকে অন্যায়ভাবে বনে পাঠিয়ে এবং দুর্যোধনের মতো অযোগ্য পুত্রের হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে ধৃতরাষ্ট্র ঘোর অন্যায় করেছেন।
৩. ‘পণ্ডিত’ বা প্রজ্ঞাবান মানুষের লক্ষণ
যিনি সুখে-দুঃখে, শীতে-গ্রীষ্মে, রাগে-অনুরাগে বিচলিত হন না এবং যাঁর বুদ্ধি সনাতন ধর্মের পথে চলে।
যিনি সাধ্য অনুযায়ী কাজ করেন, গোপন পরিকল্পনা সঠিক সময় না আসা পর্যন্ত প্রকাশ করেন না এবং হারানোর পর শোক করেন না।
যিনি সম্মান পেয়ে অহংকারী হন না এবং অসম্মানে ভেঙে পড়েন না।
৪. ‘মূর্খ’ বা মূঢ় মানুষের লক্ষণ
না পড়েও বিদ্যা জাহির করা, না খেটেও ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখা এবং অসাধ্য জিনিস পাওয়ার চেষ্টা করা।
শক্তিশালী ব্যক্তির সঙ্গে অকারণ শত্রুতা করা, না ডেকেই অন্যের বিষয়ে নাক গলানো এবং অবিশ্বাসী মানুষকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা।
নিজের অক্ষমতা ও দোষ সত্ত্বেও অন্যের খুঁত ধরে বেড়ানো এবং নিজের পরিজনকে বঞ্চিত করে একা সুখ ভোগ করা।
৫. নীতি, ধর্ম ও ক্ষমার উপদেশ
নরকের তিনটি দ্বার: কাম, ক্রোধ এবং লোভ।
ক্ষমার গুরুত্ব: ক্ষমা দুর্বলতা নয়, বরং সবচেয়ে বড় শক্তি ও ভূষণ। শান্ত হৃদয়ের মানুষের কোনো শত্রু ক্ষতি করতে পারে না।
সত্য ও ধর্মে নিষ্ঠা: সত্যই হলো স্বর্গে যাওয়ার একমাত্র সিঁড়ি। ভুল পরামর্শ ও অন্যায় সিদ্ধান্ত কেবল একজন মানুষকে নয়, পুরো রাজ্য ও বংশকে ধ্বংস করে দেয়।
যাদের ত্যাগ করা উচিত নয়:শরণাগত, ভক্ত, সেবক এবং বিপদে পড়া দরিদ্র বা বৃদ্ধ স্বজন।
৬. ধৃতরাষ্ট্রকে চূড়ান্ত বার্তা
পাণ্ডবরা ধৃতরাষ্ট্রের নিজের সন্তানের মতোই পুণ্যবান ও বলবান।
বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে পুত্রমোহ ত্যাগ করে পাণ্ডবদের তাঁদের প্রাপ্য রাজ্যাংশ ফিরিয়ে দিয়ে রাজ্যে শান্তি বজায় রাখার চূড়ান্ত উপদেশ দেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের পঞ্চমভাগ (বিদুর নীতিরপ্রথম অধ্যায়) আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের চতুর্থভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment