অষ্টমভাগ উদ্যোগপর্ব- (বিদুর নীতির-চতুর্থ অধ্যায়)-বিদুরের নিশাভাষণ: সাধ্য ও দত্তাত্রেয় আখ্যান


অষ্টমভাগ উদ্যোগপর্ব- (বিদুর নীতির-চতুর্থ অধ্যায়)-বিদুরের নিশাভাষণ: সাধ্য ও দত্তাত্রেয় আখ্যান, এবং এক অন্ধ রাজার শান্তি খোঁজা

রাত বাড়ছিল। হস্তিনাপুরের বিশাল রাজপ্রাসাদ তখন এক অদ্ভুত, নিচ্ছিদ্র নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। সেই গভীর অন্ধকারের মাঝে মুখোমুখি বসে দুজন মানুষ—ধৃতরাষ্ট্র আর বিদুর। রাজার চোখে আলো নেই, কিন্তু তাঁর বুকের ভিতরটা যেন এক উত্তাল, কালচে সমুদ্র। সেখানে আশঙ্কার ঢেউ ভাঙছে, অনুশোচনার ঝড় উঠছে। বিদুর সেই অন্ধকারের গায়ে শব্দের প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন। পরম মমতা, অথচ কঠিন সত্যের ধার নিয়ে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন।

তিনি বললেন—মহারাজ, বহুকাল আগের একটা কথা মনে পড়ছে। মহর্ষি দত্তাত্রেয় ছিলেন অদ্ভুত এক মানুষ। অসাধারণ তাঁর প্রজ্ঞা, আবার সংসারী বাঁধন ছিন্ন করে তিনি যেন এক মুক্ত পরমহংস। একদিন সাধ্য নামের একদল দেবতা তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁরা শুধোলেন, ‘হে মহর্ষি, আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি শাস্ত্রের শেষ কথাটি জানেন। আপনার ধৈর্য আর বুদ্ধির জ্যোতি আমাদের মুগ্ধ করছে। আমাদের এমন কিছু বলুন, যাতে আমাদের অন্তরাত্মা সমৃদ্ধ হয়।’

পরমহংস দত্তাত্রেয় তখন হেসেছিলেন। বলেছিলেন—ধৈর্য, আত্মসংযম আর সত্যের পথ—এই তিনটিই মানুষের আসল পরিচয়। এই তিনের স্পর্শে হৃদয়ের সব কঠিন গিঁট খুলে যায়। তখন প্রিয় আর অপ্রিয়কে আলাদা করে চেনা যায় না, দুটোকেই নিজের আত্মার মতো মনে হয়। কেউ যদি বিষাক্ত কটু কথা বলে, তবে তাকে পাল্টা গালি দিতে নেই। যে ক্ষমা করে, তার ভেতরের পুণ্য শক্তি বেড়ে যায়, আর যে অকাতরে গালি দেয়, তার নিজের জমে থাকা ক্রোধই নিঃশব্দে তার সব পুণ্য শুষে নেয়।

কাউকে অপমান কোরো না, বন্ধুর বিশ্বাস ভাঙো না, নীচ মানুষের সঙ্গে মেশা বন্ধ করো। যার মুখের কথা আগুনের মতো রুক্ষ, যে কথার বাণে অন্যের বুক ঝাঁঝরা করে আনন্দ পায়—জেনে রেখো, তার ধনসম্পদ যতই থাক, সে জগতের সবচেয়ে দরীয় মানুষ। কারণ আগুনের মতো রুক্ষ বাক্য মানুষের প্রাণকে একমুহূর্তে ছাই করে দেয়। ধার্মিক মানুষ তাই এই দাহকারী বাক্য চিরতরে বর্জন করেন।

বিদ্যান মানুষকে কেউ গালি দিলে তিনি ভাবেন—এ তো আমার ভেতরের অহংকার মুছে পুণ্যকেই বাড়িয়ে দিল! মনে রাখবে রাজন, সাদা কাপড়কে যে রঙে ডোবানো হয়, সে সেই রঙই নেয়। মানুষও যাদের সাথে থাকে—সজ্জন হোক বা দুর্জন, তপস্বী কিংবা চোর—তার মনের রং তেমনই হয়ে যায়। যে আঘাত পেয়েও প্রতিশোধের বিষ পুষে রাখে না, দেবতারাও তার আসার অপেক্ষায় থাকেন।

বিদুর থামলেন না। বলে চললেন—কথা না বলা ভালো, কিন্তু প্রিয় ও ধর্মসম্মত সত্য কথা বলা মৌনতার চেয়ে চারগুণ বেশি ফলদায়ী। মানুষ যা হতে চায়, যার সেবা করে, শেষ পর্যন্ত সে তাই হয়ে ওঠে। যে নিজের ইন্দ্রিয়কে বশ করেছে, যে জয়-পরাজয়ে সমান, যে অপরের অমঙ্গল তো দূরের কথা, হিংসার ভাবনাও মনে আনে না—সেই তো আসল উত্তম পুরুষ।

তারপর ধৃতরাষ্ট্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বিদুর এক চরম সত্য উচ্চারণ করলেন—‘মহারাজ, দুঃশাসনকে যখন গন্ধর্বরা রক্তে ভেসে দিয়েছিল, তখন এই পাণ্ডবরাই নিজেদের প্রাণ বাজি রেখে তাকে উদ্ধার করেছিল। অথচ সেই অকৃতজ্ঞ দুঃশাসন আজও পাণ্ডবদের ধ্বংস চায়। যে বন্ধুকে বিশ্বাস করে না, যে অহেতুক সবাইকে সন্দেহ করে, সে অধম। ধনবল বা পুরুষার্থ দিয়ে লোক ভুলোনো যায়, কিন্তু উত্তম কুলের সদাচার কেনা যায় না।’

ধৃতরাষ্ট্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধোলেন—‘বিদুর, দেবতারাও যে উত্তম কুলে জন্ম নিতে চান, সেই উত্তম কুল আসলে কী?’

বিদুর শান্ত স্বরে বললেন—তপস্যা, সংযম, অধ্যয়ন, অন্নদান আর সবচেয়ে বড় কথা সদাচার—এই গুণগুলোই কুলের পরিচয়। যে কুলে লক্ষ্মী আছেন কিন্তু সদাচার নেই, তা জঞ্জালের সমান। ধন তো আজ আছে, কাল নেই। কিন্তু চরিত্র হারালে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। আমাদের কুলে যেন কোনো কুটিল, অকৃতজ্ঞ বা ধর্মহীন মানুষের ঠাঁই না হয়। রাজন, একটি ছোট্ট কাঠভারী রথ যেমন বড় ভার বইতে পারে, উত্তম কুলের সন্তানই তেমনই বংশের গুরুভার বইতে জানে।

ধৃতরাষ্ট্রের কাঁধ দুটো এবার সত্যি সত্যি নুয়ে পড়ল। গলায় পুরনো ভয়টা ফিরে এল—‘বিদুর, তুষের আগুনের মতো সূক্ষ্ম ধর্মে যে যুধিষ্ঠির বাঁধার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আমি তার সাথে ছলনা করেছি। সে যদি এবার যুদ্ধ ঘোষণা করে? আমার মন যে ভয়ে কেঁপে উঠছে! আমাকে শান্তির পথ দেখাও, বিদুর!’

বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন—‘নিষ্পাপ নরেশ, বিদ্যাসাধনা, আত্মসংযম আর লোভে বিসর্জন দেওয়া ছাড়া শান্তির অন্য কোনো সহজ পথ নেই। যোগেই শান্তি মেলে। রাজন, যারা ঘরের লোক হয়েও ভেদাভেদ পুষে রাখে, তারা সোনার পালঙ্কেও শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। আলাদা থাকা একটিমাত্র কাঠ শুধু ধোঁয়া দেয়, কিন্তু একসঙ্গে অনেকগুলো কাঠ দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। আত্মীয়রা একা হলে দুর্বল, কিন্তু একজোটে থাকলে অপরাজিত। একা দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছও এক ঝড়ে উপড়ে যায়, কিন্তু জঙ্গলের গাছেরা একে অপরকে ধরে ঝড় সামলে নেয়। পাণ্ডবরা আপনারই সন্তান, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সন্ধি করুন। দুর্যোধনকে সংযত করুন, তবেই এই কুরুবংশ টিকবে, তবেই আপনি সত্যি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।’

এখানে মহাভারতের উদ্যোগ পর্বের অন্তর্ভুক্ত 'বিদুর নীতি' থেকে বর্ণিত মূল শিক্ষা ও নীতিগুলো সহজ ও সুস্পষ্ট  আকারে নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আত্মসংযম, ধৈর্য ও সত্যের পথ

  • প্রকৃত ব্যক্তিত্বের ভিত্তি: ধৈর্য, আত্মসংযম এবং সততাই মানুষের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলে। এগুলো অন্তরের সব দ্বিধা ও কুটিলতা দূর করে।
  • সমদর্শিতা: সংযমী মানুষ প্রিয় ও অপ্রিয় উভয় পরিস্থিতিকেই সমভাবে ও আত্মবৎ গ্রহণ করতে পারেন।

. বাকসংযম ও ক্ষমাবোধ

  • কটু কথার বর্জন: মুখের রুক্ষ ও বিষাক্ত কথা অন্যের হৃদয় ছাই করে দেয়। তাই ধার্মিক ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা সবসময় কটু বাক্য বর্জন করেন।
  • ক্ষমার শক্তি: গালি বা অপমানের উত্তরে যে ক্ষমা প্রদর্শন করে, তার পুণ্য বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, ক্রোধ প্রকাশকারী নিজের পুণ্য নিজেই বিনাশ করে।
  • মৌনতা ও সত্য ভাষণ: কথা না বলা বা মৌন থাকা ভালো, তবে প্রিয় ও ধর্মসম্মত সত্য কথা বলা মৌনতার চেয়েও চারগুণ বেশি ফলদায়ী।

৩. সৎসঙ্গ ও সঙ্গদোষ

  • মানসিক রঙ: সাদা কাপড় যেমন রঙের সংস্পর্শে এলে সেই রঙ ধারণ করে, মানুষও যার সাথে মেশে (সজ্জন বা দুর্জন) তেমনই মানসিকতা লাভ করে।
  • নীচ সঙ্গ বর্জন: অসাধু, প্রতারক বা নীচ মানুষের সঙ্গ পরিহার করা উচিত।

৪. প্রজ্ঞা ও উত্তম পুরুষের লক্ষণ

  • নিন্দাকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া: প্রাজ্ঞ ব্যক্তি অপমান বা গালিগালাজকে নিজের অহংকার মুছে ফেলার মাধ্যম হিসেবে দেখেন।
  • উত্তম পুরুষ: যিনি নিজের ইন্দ্রিয় সংবরণ করেছেন, জয়-পরাজয়ে অবিচলিত থাকেন এবং মনে হিংসা পোষেন না—তিনিই প্রকৃত উত্তম মানুষ।

৫. অকৃতজ্ঞতা ও অন্ধ সন্দেহের পরিণতি

  • অকৃতজ্ঞতা নিকৃষ্ট অপরাধ: বিপদের দিনে যে সাহায্য করে, তার ক্ষতি চাওয়া পরম অধর্ম।
  • অন্ধ সন্দেহ: যে নিজের বন্ধুদের অহেতুক সন্দেহ করে এবং কারো ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না, সে সমাজের চোখে অধম।

৬. 'উত্তম কুল' বা সৎ বংশের প্রকৃত পরিচয়

  • আচারের গুরুত্ব: কেবল ধনসম্পদ দিয়ে বংশের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার হয় না। চরিত্র ও সদাচারই বংশের আসল পরিচয়। সদাচারহীন ধনসম্পদ জঞ্জালতুল্য।
  • বংশের মূল গুণাবলী: তপস্যা, ইন্দ্রিয় সংযম, জ্ঞান চর্চা, অন্নদান এবং সদাচার—এই গুণগুলোই একটি কুলকে দেবতুল্য ও সম্মানিত করে তোলে।
  • দায়িত্ব বহন: উত্তম কুলের সন্তানরা বংশের গুরুভার ও মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

৭. একতা ও শান্তির পথ

  • একতার শক্তি: একা দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল গাছ এক ঝড়ে উপড়ে যেতে পারে, কিন্তু বনে দলবদ্ধভাবে থাকা গাছেরা ঝড় সামলে নেয়। তেমনি, আত্মীয়রা আলাদা হলে দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু একজোট থাকলে অপরাজিত থাকে।
  • গৃহবিবাদের কুফল: নিজ গৃহে ভেদাভেদ বা শত্রুতা পুষে রাখলে সোনার পালঙ্কেও শান্তিতে ঘুমানো যায় না।
  • প্রকৃত শান্তির উপায়: লোভে বিসর্জন দেওয়া, আত্মসংযম, জ্ঞান সাধনা এবং অহিংসাই পরম শান্তির একমাত্র পথ। বিবাদ বা যুদ্ধের পথ পরিহার করে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করাই কুরুবংশ রক্ষার একমাত্র উপায়।

বি:দ্র: এর পরে চলবে উদ্যোগপর্বের বিদুর নীতির-পঞ্চম  অধ্যায়

 আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের  অষ্টমভাগ (বিদুর নীতির চতুর্থ অধ্যায়)  আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।  

উদ্যোগপর্বের ৭মভাগ (বিদুর নীতির তৃতীয়  অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)