২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা
২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা
উপস্থিত রাজাদের সভার গোলমাল তখন স্তব্ধ হয়ে এসেছে। নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে চেয়ে রইলেন যাদবশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের দিকে। বড় ক্লান্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভরতা। তিনি বললেন, "মিত্রবৎসল শ্রীকৃষ্ণ! এই ঘোর সংকটসময়ে তুমি ছাড়া এমন আর কে আছে, যে আমাদের রক্ষা করতে পারে? তোমার উপস্থিতিতেই আমি নির্ভীক, তাই তো আজও দুর্যোধনের কাছে নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস পাই।"
বাসুদেব হাসলেন। সে হাসিতে যেমন গভীর প্রজ্ঞা, তেমনই অগাধ স্নেহ। বললেন, "রাজন, আমি তো সর্বদা আপনার সেবায় প্রস্তুত। কী বলতে চান, নির্দ্বিধায় বলুন। আপনার ইচ্ছা পূরণ করাই আমার ধর্ম।"
যুধিষ্ঠির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্রদের মনোভাব তো সঞ্জয়ের মুখে শুনলেই। দূত কেবল প্রভুর বার্তা বহন করে, তার নিজের তো কোনো স্বর নেই। জনার্দন, বৃদ্ধ রাজার লোভ অপরিসীম। তিনি কৌরব আর পাণ্ডবদের সমচোখে দেখতে পারলেন না। বারো বছর বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাতবাসের চরম কায়িক ও মানসিক কষ্ট আমরা তো এই বিশ্বাসেই মেনে নিয়েছিলাম যে তিনি কথা রাখবেন। কিন্তু আজ দেখছি লোভ তাঁর ধর্মবোধকে ধূলিসাৎ করেছে। পুত্রের মোহে অন্ধ হয়ে তিনি অকল্যাণের পথই বাছলেন। এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে বলো, যে আমরা মায়ের সঠিক সেবা করতে পারছি না, আশ্রয়দাতা ও স্বজনদেরও ভরসা দিতে পারছি না? কাশীরাম, মৎস্যরাজ, পাঞ্চালরাজ আর তুমি স্বয়ং সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও আমি যুদ্ধ চাইনি। কেবল পাঁচটি গ্রাম চেয়েছিলাম— অবিস্থল, বৃকস্থল, মাকন্দী, বারণাবত আর অন্য যেকোনো একটি গ্রাম। চেয়েছিলাম যাতে ভরতবংশ বিনাশ না হয়। অথচ পাপিষ্ঠ দুর্যোধন এটুকুই ছেড়ে দিতে নারাজ! লোভ মানুষকে অন্ধ করে, লজ্জা বিসর্জন দেয়, আর ধর্ম চলে গেলে রাজ্যলক্ষ্মীও বিদায় নেন। লক্ষ্মীহীন মানুষকে আত্মীয়রাও ত্যাগ করে, ঠিক যেমন ফলহীন বৃক্ষকে পাখিরা ত্যাগ করে যায়।"
একটু থেমে যুধিষ্ঠির আবার বলতে শুরু করলেন, "আমার প্রথম ইচ্ছা, কৌরবদের সাথে শান্তিতে সন্ধি করে রাজত্ব ভাগ করে নেওয়া। আর তা না হলে চরম পথ— যুদ্ধে ওদের নিধন করা। কিন্তু যুদ্ধ মানেই তো বিবাদ, প্রাণহানি, কুলক্ষয়। নীতি মেনে আমি যুদ্ধ করতেই পারি, কিন্তু স্বজনঘাতী হয়ে জয় পাওয়ার মধ্যে কোনো গৌরব দেখি না। কুকুরের লড়াই দেখেছ শ্রীকৃষ্ণ? প্রথমে কেবল লেজ নাড়া, তারপর ঘোঁতঘোঁত শব্দ, দাঁত খিঁচানি, আর শেষমেশ পরস্পরকে কামড়ে ছেঁড়া। মানুষের অহংকারও তো ঠিক এই পথেই হাঁটে। তুমিই বলো মাধব, এই সংকটমুহূর্তে আমাদের কী করণীয়? কীভাবে ধর্ম আর অর্থ— দুই-ই রক্ষা পাবে?"
শ্রীকৃষ্ণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "আমি নিজে কৌরবসভায় যাব। দুই পক্ষের হিত চিন্তাই আমার লক্ষ্য। যদি যুদ্ধ এড়িয়ে কোনোভাবে শান্তিস্থাপন করা যায়, তবে তা হবে অত্যন্ত পুণ্যকাজ।"
কিন্তু যুধিষ্ঠির শিউরে উঠলেন। "না কৃষ্ণ, তোমার ওখানে যাওয়া আমার মন সায় দিচ্ছে না। দুর্যোধন যুক্তি বোঝে না। সেখানে তার অনুগত রাজারাও থাকবে। তোমার সামান্যতম অপমান বা কষ্ট হলে এই পৃথিবী, এমনকি দেবত্ব পেলেও আমি সুখী হব না।"
বাসুদেব পরম শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, "মহারাজ, দুর্যোধনের পাপের কথা আমি জানি। কিন্তু আমরা যদি শেষ চেষ্টাটুকু না করি, তবে ইতিহাস আমাদের দোষী ভাববে। আর আমার সুরক্ষার কথা ভাবছেন? সিংহের সামনে যেমন বনের কোনো হিংস্র পশু দাঁড়াতে পারে না, তেমনই আমি ক্রুদ্ধ হলে কোনো রাজাই আমার সামনা সামনা হতে পারবে না। আমার কৌরবসভায় যাওয়া বৃথা যাবে না— সফল হলে শান্তি আসবে, আর বিফল হলেও আমাদের ওপর কোনো অপবাদ থাকবে না।"
যুধিষ্ঠির বিনীতভাবে মাথা নোয়ালেন। "তাহলে তুমি প্রসন্ন মনে গমন করো মাধব। তুমি আমাদেরও চেনো, কৌরবদেরও বোঝো। যা শুভ, যা মঙ্গলময়— তুমি সেটাই কোরো।"
তখন শ্রীকৃষ্ণের চোখে ফুটে উঠল এক দীপ্ত অগ্নিশিখা। আধুনিক ক্ষাত্রধর্মের কঠোর সত্যকে উচ্চারণ করে তিনি বললেন, "রাজন! আপনার মন ধর্মে পূর্ণ, আর ওদের মন কপটতায় ভরা। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি ক্ষাত্রকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভিক্ষা করা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়। যুদ্ধ করে জয়লাভ করা কিংবা রণে প্রাণ দেওয়া— বিধাতা ক্ষত্রিয়ের জন্য এই পথই নির্দিষ্ট করেছেন। বিনয় আর দীনতা দিয়ে দুর্যোধনের মন গলবে না। যে দ্রৌপদীকে প্রকাশ্যে কুলটা বলে অপমান করেছিল, কেশ আকর্ষণ করে সভায় টেনে এনেছিল, তাকে ক্ষমা করা পাপ। আপনি ভ্রাতৃ স্নেহে আর ধর্মপাশে আবদ্ধ ছিলেন বলে ভীম-অর্জুন সেদিন চুপ ছিল, কিন্তু দুষ্টের দমনই পরম ধর্ম।"
কথা শেষ করে কৃষ্ণ সভার দিকে চেয়ে দৃপ্ত গলায় বললেন, "আমি কৌরবসভায় গিয়ে সব রাজাদের সামনে আপনার ধর্মবোধ তুলে ধরব আর দুর্যোধনের পাপাচার উন্মুক্ত করব। কিন্তু আমার অভিজ্ঞ চোখ বলছে— যুদ্ধ ঠেকানো অসম্ভব। তাই শান্তিদূতের কাজ আমি নিশ্চয়ই করব, তবে আপনারা অবিলম্বে প্রস্তুত হন। রথ, হস্তী, অশ্ব, কবচ আর শস্ত্র সাজিয়ে তুলুন। মনে রাখবেন, দুর্যোধন জীবিত থাকতে বিনাযুদ্ধে একসূচগ্র মেদিনীও ছাড়বে না।"
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৫তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ২৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment