৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা
৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা
প্রাতঃকালের স্নান, জপ আর অগ্নিহোত্র শেষ করে শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেবকে প্রণাম জানাচ্ছেন, তখনও চারপাশ শান্ত। শরীর ঢেকে নিলেন উজ্জ্বল পীতবস্ত্র ও আভরণে। ঠিক তখনই ঘরে এলেন দুর্যোধন, সঙ্গে মামা শকুনি। দুর্যোধনের গলায় একধরনের কৃত্রিম ব্যস্ততা, "মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, পিতামহ ভীষ্ম—কৌরবদের বড় বড় সব মাথারাই এখন রাজসভায় আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন।"
কৃষ্ণ শুধু মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই অমলিন, মধুর অভ্যর্থনায় কোনো উত্তাপ ছিল না, ছিল না কোনো গোপন হিংসার আঁচ।
বাইরে রথ প্রস্তুত। সারথি প্রণাম করে দাঁড়াল, চারটে শুভ্র ঘোড়া অধৈর্য হয়ে পা ঠুকছে। রথে উঠলেন শ্রীযদুনাথ, সঙ্গে উঠলেন ধর্মজ্ঞ বিদুর। অন্য একটা রথে পেছন পেছন চললেন দুর্যোধন আর শকুনি।
রাজসভার দরজায় যখন রথ থামল, কৃষ্ণ পা রাখলেন মাটিতে। তাঁর পাশে বিদুর আর সাত্যকি। কৃষ্ণ যখন সভার ভেতর ঢুকছেন, তাঁর গায়ের সেই অদ্ভুত নীলচে জ্যোতি আর মহিমার সামনে মুহূর্তের জন্য কৌরবদের সব জাঁকজমক ম্লান হয়ে গেল। সভার ভেতরে সবার সামনে দুর্যোধন আর কর্ণ, পেছনে কৃতবর্মা আর অন্য যদুবংশীয়রা।
কৃষ্ণকে দেখেই হস্তিনাপুরের থমথমে রাজসভা এক নিমেষে বদলে গেল। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র দাঁড়ালেন, দাঁড়িয়ে উঠলেন পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণ। ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে সভার কেন্দ্রস্থলে আগে থেকেই রাখা ছিল একটি নিখুঁত, ঝলমলে সোনার সিংহাসন—'সর্বতোভদ্র'। কৃষ্ণ হাসিমুখে সেখানে গিয়ে বসলেন। চারপাশে চেনা-অচেনা রাজাদের ভিড়, সবাই মুখিয়ে আছেন তাঁর দিকে।
হঠাৎ কৃষ্ণ দেখলেন, সভার একপাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছেন নারদসহ বহু ঋষি-মুনি।
কৃষ্ণ শান্ত চোখে ভীষ্মের দিকে চাইলেন। "পিতামহ, এই ঋষিরা শুধু সভা দেখতে এসেছেন। আগে তাঁদের যথাবিহিত আসন দিন, পুজো করুন। পরমপূজনীয় মুনিরা না বসলে এখানে কারও বসে থাকা সাজে না।"
ভীষ্ম এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। সেবকরা তড়িঘড়ি আসন নিয়ে এল। মুনিরা পাদ্য-অর্ঘ্য গ্রহণ করে আসন পরিগ্রহ করার পরেই কৃষ্ণ এবং অন্য রাজারা যার যার আসনে বসলেন। কৃষ্ণের ঠিক পাশেই এক মণি-খচিত আসনে মৃগচর্মের ওপর স্থির হয়ে বসে রইলেন বিদুর।
সভার ভেতর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রাজাদের চোখ কৃষ্ণের ওপর আটকে গেছে। যেন কতকাল পর দেখছেন! অমৃত পান করলেও বুঝি তৃপ্তি শেষ হয়, কিন্তু কৃষ্ণকে দেখার তৃষ্ণা মেটে না। কেউ একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারলেন না।
সেই ভারী নীরবতা ভাঙলেন কৃষ্ণ নিজে। ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—যেন কোনো গভীর মেঘের ডাক।
"রাজন," কৃষ্ণ বললেন, "আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট। আমি চাই না এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়রা রক্তগঙ্গায় ভেসে যাক। আমি চাই কৌরব আর পাণ্ডবদের মধ্যে একটা সম্মানজনক সন্ধি হোক। কুরুবংশকে গোটা ভারতবর্ষ মান্য করে। দয়া, ক্ষমা, করুণা, সত্য আর সরলতা—এই গুণগুলো তো কুরুবংশেরই অলংকার হওয়ার কথা ছিল। সেই বংশের মাথার ওপর বসে আপনি কীভাবে এত বড় অনীতি সহ্য করছেন?"
সভায় কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে না। কৃষ্ণ থামলেন না।
"আপনার পুত্ররা লোভের বশে অন্ধ হয়ে ক্রূর আচরণ করছে। আপন ভাইদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে না, ধর্মকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আপনি সব জেনেও চুপ করে আছেন রাজন! যে ভীষণ বিপদ কৌরবদের মাথার ওপর ঘনিয়ে আসছে, আপনি চোখ বুজে থাকলে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এখনও সময় আছে। এই বিনাশ আটকানোর ভার আপনার আর আমার কাঁধে। আপনি পুত্রদের সামলান, পাণ্ডবদের সামলানোর দায় আমার।"
কৃষ্ণের গলার স্বর এবার আরও গম্ভীর, আরও আবেদনময়।
"ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, আর ওদিকে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব, সাত্যকি—এরা যদি একপাশে দাঁড়ায়, পৃথিবীর কোন মূর্খ এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাবে? কৌরব আর পাণ্ডব এক হলে পুরো পৃথিবী আপনার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। যুদ্ধের শেষ পরিণাম কেবল রক্ত আর মৃত্যু। আপনজনদের মেরে আপনি কোন ধর্ম হাসিল করবেন? আপনার প্রজা, আপনার বংশকে রক্ষা করুন রাজন।"
এরপর কৃষ্ণ পাণ্ডবদের বার্তা সভার সামনে তুলে ধরলেন।
"পাণ্ডবরা আপনাকে প্রণাম জানিয়ে একটি কথাই বলেছেন—'আমরা আপনার আদেশেই ১২ বছর বনে আর ১ বছর অজ্ঞাতবাসে কাটিয়েছি। আমরা কথা রেখেছি। এবার আপনিও আপনার কথা রাখুন। পিতা যেমন সন্তানকে পথ দেখায়, আপনি আমাদের আমাদের রাজ্য ফিরিয়ে দিন। আমরা যদি পথ ভ্রষ্ট হয়ে থাকি, গুরু হয়ে আমাদের সামলান।' পাণ্ডবরা কোনো অন্যায্য দাবি করেনি রাজন।"
কৃষ্ণ একবার চোখ বোলালেন পুরো রাজসভায়।
"এই সভায় মহতী রাজারা বসে আছেন। ধর্মের দোহাই দিয়ে বলছি—এই ক্ষত্রিয়দের মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচান। ক্রোধের বশে অর্থকে অনর্থ ভাববেন না। পাণ্ডবরা আপনার সেবার জন্যও প্রস্তুত, আবার যুদ্ধের জন্যও তৈরি। এবার পছন্দ আপনার, রাজন—আপনি সেবা নেবেন, না সংহার?"
গোটা রাজসভা তখন নিথর। কৃষ্ণের শেষ শব্দ কটি তখনও দরবারের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৩১তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ৩০তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment