১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায় ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,
১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায়
ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,
ধৃতরাষ্ট্র অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, "হে মহামতি, ঈশ্বর আর এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের পরম সত্য নিয়ে আপনি যেসব গভীর কথা শোনালেন, সেখানে তো পার্থিব আনন্দ বা বিষয়বাসনার কোনো জায়গাই নেই! তবু আমার মনটা এখনো শান্ত হচ্ছে না। দয়া করে এই দুর্লভ তত্ত্বটা আরেকবার বুঝিয়ে বলুন আমাকে।"
একটু হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "রাজা, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নগুলো করছ, তোমার ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা ব্যাকুলতা কাজ করছে বুঝতে পারি। মন যদি এমন চঞ্চল, উদ্বেলিত থাকে, তাহলে পরম সত্যের বা ব্রহ্মের অনুভূতি পাওয়া যায় না। বুদ্ধি দিয়ে যখন মনের সব চঞ্চলতাকে শান্ত করা যায়, মন যখন একদম নিশ্চল হয়ে যায়, তখনই আসল ব্রহ্মজ্ঞান জন্ম নেয়। আর সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র পথ ব্রহ্মচর্য পালন করা।"
হাত জোড় করে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "কিন্তু যা কোনো বস্তুগত কর্মের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, কর্মের শেষ ফল হিসেবেও যাকে ধরা যায় না—সেই সনাতন সত্য, যা কেবল আত্মার ভেতরে চিরকাল থেকে যায়—বলুন তো, সাধারণ মানুষ কি শুধু ব্রহ্মচর্য দিয়েই সেই অমরত্ব বা মোক্ষ পেতে পারে? আমার মতো একজন সংসারী মানুষ তা পাবে কীভাবে?"
শান্ত গলায় সনৎসুজাত বললেন, "তবে শোনো। আমি তোমাকে সেই প্রাচীন, অব্যক্ত ব্রহ্মবিদ্যার কথাই বলছি, যা কেবল সৎ বুদ্ধি আর কঠোর আত্মসংযমের মধ্য দিয়েই পাওয়া যায়। জ্ঞানী মানুষেরা এই বিদ্যার জোরেই একদিন এই ক্ষণভঙ্গুর, মরণশীল দেহ ছেড়ে চিরন্তন সত্যের দেখা পান। আর এই পরম জ্ঞান সবসময় গুরুজনদের হৃদয়ে প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকে।"
কৌতূহল আরও বেড়ে গেল ধৃতরাষ্ট্রের, "হে ব্রহ্মর্ষি! ব্রহ্মচর্য পালন করেই যদি এত সহজে পরম সত্যকে জানা যায়, তাহলে আগে বলুন—এই ব্রহ্মচর্য ঠিক কীভাবে পালন করতে হয়?"
বলতে শুরু করলেন সনৎসুজাত, "যাঁরা গুরুর আশ্রমে থেকে নিঃস্বার্থ সেবা আর গভীর ভক্তি দিয়ে গুরুর মন জয় করেন, তাঁরাই আসলে ব্রহ্মচর্যের প্রথম শিক্ষাটা পান। এই অনুশীলনের জোরেই একদিন তাঁরা শাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন, দেহত্যাগের পর পরমাত্মার সঙ্গে মিলিয়ে যান। এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকেও যিনি নিজের সব কামনাবাসনাকে জয় করেছেন, সুখে-দুঃখে যিনি অবিচল, আর সত্যের আলোয় স্থির থাকার জন্য হাসিমুখে সব দুঃখকষ্ট সয়ে নেন—তিনিই নিজের বোধ দিয়ে অনাত্মীয় দেহ থেকে আত্মাকে আলাদা করে চিনতে পারেন।
হে ভারত, মা-বাবা আমাদের কেবল এই রক্তমাংসের শরীরটাই দেন। কিন্তু গুরু বা আচার্যের উপদেশ আমাদের যে দ্বিতীয় জন্মটা দেয়, তা পরম পবিত্র, অমলিন, অবিনাশী। যিনি সত্যের পথ দেখান, আলোর দিশা দেন, আত্মাকে অমরত্বের স্বাদ পাইয়ে দেন—তিনিই তো প্রকৃত পিতামাতা। তাঁর এই বিশাল ঋণ চিরকাল মনে রাখা উচিত, তাঁর অমঙ্গল কখনো চিন্তাও করা উচিত নয়।
ব্রহ্মচারী শিষ্যের রোজকার কাজ হলো গুরুকে প্রণাম করা। ভেতরে-বাইরে নিজেকে পবিত্র রাখতে হবে, মন থেকে অহংকার, আলস্য, ক্রোধ পুরোপুরি ধুয়েমুছে ফেলে শুধু অধ্যয়নেই মন দিতে হবে। এটাই ব্রহ্মচর্যের প্রথম ধাপ।
দ্বিতীয় ধাপ—নিজের শক্তি আর সাধ্যমতো অর্থ দিয়ে, মনেপ্রাণে ও কাজে গুরুকে সন্তুষ্ট রাখা। গুরুকে যেমন শ্রদ্ধা করতে হয়, তেমনি গুরুর স্ত্রী আর সন্তানদেরও ঠিক সেই সম্মানই দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপটা কৃতজ্ঞতার। গুরু আমাকে কতটা উঁচুতে তুলে ধরেছেন, জীবনের কতটা কল্যাণ করেছেন—তা বুঝে শিষ্য মনে মনে গুরুর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন, আনন্দিত থাকবেন।
আর চতুর্থ ধাপ হলো—গুরুকে যথাযথ দক্ষিণা দিয়ে সন্তুষ্ট না করে শিষ্য কখনো আশ্রম ছাড়বেন না। তবে মনে রাখতে হবে, গুরুকে সেবা বা দক্ষিণা দেওয়ার পরও শিষ্যের মনে যেন কখনো এই অহংকার না জাগে যে 'আমিই গুরুর বড় উপকার করলাম'। মুখেও যেন কখনো এমন কথা না আসে।
মনে রেখো রাজা, জ্ঞান অর্জনের এই যাত্রাটা চারটে চরণে সম্পূর্ণ হয়: প্রথম চরণ আসে গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা আর সৎ আচরণের মধ্য দিয়ে; দ্বিতীয়টা লাভ হয় নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর উৎসাহে; বহুদিনের মনন আর গভীর চিন্তায় ফোটে তৃতীয় চরণ; আর সবশেষে সহপাঠী বা সতীর্থদের সাথে আলোচনায় স্পষ্ট হয় চতুর্থ চরণটা। এই সাধনার পথে শিষ্য যা কিছু ধনসম্পদ পায়, তা গুরুর পায়েই সমর্পণ করা উচিত। এতে শিষ্য পুণ্যবান মানুষের গুণ পান, সমাজে খ্যাতি ছড়ায়, পান পরম সুখ আর প্রতিষ্ঠা।
এই ব্রহ্মচর্যের জোরেই দেবতারা দেবত্ব পেয়েছেন, ঋষিরা পেয়েছেন পরম ধাম, সূর্যদেবও পেয়েছেন বিশ্বকে আলোকিত করার শক্তি। তাই স্বর্গের দেবতা থেকে মর্ত্যের ঋষি—সবাই এই পথেই হেঁটেছেন। যে মানুষ ব্রহ্মচর্য পালন করে, সে নিজের শরীর আর মনকে খাঁটি সোনায় বদলে ফেলে। সে পায় এক পরম আত্মবল, যা মৃত্যুকেও জয় করতে শেখায়। মনে রেখো, পার্থিব কামনায় করা পুণ্যকাজ শুধু ক্ষণস্থায়ী স্বর্গসুখ দেয়, কিন্তু জ্ঞানীরা পান সর্বব্যাপী পরমাত্মাকেই। মোক্ষ বা মুক্তির জন্য জ্ঞান ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।"
সব শুনে ধৃতরাষ্ট্রের চোখে গভীর বিস্ময় ফুটে উঠল। জিজ্ঞেস করলেন, "হে পরম জ্ঞানী, পণ্ডিতেরা যে অবিনাশী, অমর সত্যের কথা বলেন—তার রূপ কেমন? সেই পরমাত্মা কি দেখতে ধবধবে সাদা, রক্তের মতো লাল, ঘন কালো, নাকি খাঁটি সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ?"
মৃদু হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "রাজা, পরম সত্যের রূপ চোখে দেখার মতো রূপ নয়। আমরা চোখে যা দেখি—সাদা, লাল, কালো বা সূর্যের মতো রূপ, যা-ই হোক না কেন—ব্রহ্মের আসল রূপ এই মাটিতে নেই, নীল আকাশেও নেই। সাগরের গভীরে বা রাতের তারার ভেতরেও লুকিয়ে নেই সে। এমনকি বিদ্যুৎ, মেঘ, বাতাস, চাঁদ বা সূর্যের মধ্যেও তাঁকে দেখা যায় না।
ঋগ্বেদের ঋচা, যজুর্বেদের মন্ত্র, অথর্ববেদের সূক্ত বা সামবেদের সুর—কোথাও তাঁর বাহ্যিক রূপের হদিশ মিলবে না। পরমাত্মা কোনো দৃশ্যমান বস্তু নন, তিনি অজ্ঞানতার সব অন্ধকারের অনেক ওপারে। মহাপ্রলয়ের সময় কাল বা সময় নিজেই যাঁর ভেতরে বিলীন হয়ে যায়, তিনি অণুর চেয়েও সূক্ষ্ম, আবার মহাবিশ্বের চেয়েও বিশাল। তিনিই সবকিছুর আশ্রয়, তিনিই পরম অমৃত, তিনিই অক্ষয় ব্রহ্ম। যা কিছু দেখছ চারপাশে—সবই তাঁর থেকে জন্মায়, আবার তাঁর মধ্যেই মিলিয়ে যায়।
আমরা যে বিশ্বসংসার দেখি, তা কেবল কথার কথা, স্থূল জগতের এক বিকার মাত্র। কিন্তু যে বিজ্ঞ মানুষ এই দৃশ্যমান জগতের পেছনের নিত্য কারণস্বরূপ ব্রহ্মকে চিনতে পারেন, তিনিই চিরন্তন অমরত্ব পান। সেই পরম ব্রহ্ম সব রোগ, শোক আর পাপের অতীত—তাঁর পরম মহিমা এই মহাবিশ্বের অলিতেগলিতে চিরকাল ছড়িয়ে আছে।"
বি: দ্র: পরবর্তী ভাগে থাকবে সনৎসুজাতীয়-পঞ্চম অধ্যায়; "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার "সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৬তমভাগের (সনৎসুজাতীয়-চতুর্থ অধ্যায়) আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ১৫তম ভাগের (সনৎসুজাতীয়-তৃতীয় অধ্যায় ) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment