২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র
২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র
হস্তিনাপুরের কৌরবসভায় তখন এক থমথমে উত্তেজনা। পাণ্ডবদের শান্তিপ্রস্তাব নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন—এই এক খবরি রাজপ্রাসাদের বাতাসকে যেন ভারী করে তুলেছে।
সংবাদটা শোনামাত্রই বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ দুই চোখের কোণে এক অদ্ভুত আনন্দের চমক খেলে গেল। তাঁর সারা শরীরে একটা বিদ্যুতের মতো শিহরণ বয়ে গেল। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। পাশে বসে থাকা ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর আর পুত্র দুর্যোধনকে ডেকে বেশ রোমাঞ্চিত গলায় বললেন, "শুনছ? আমাদের সৌভাগ্য! পাণ্ডবদের কাজ নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন এখানে। তিনি সাধারণ মানুষ নন, এই নিখিল বিশ্বের বিধাতা। তিনি প্রজ্ঞা আর বীর্যের আধার। কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হওয়া মানে আমাদের সমস্ত সংকট কেটে যাওয়া। দুর্যোধন, এখনই লোক পাঠাও! পথের মোড়ে মোড়ে পান্থশালা বানাও, সুগন্ধি জল ছড়িয়ে কৃষ্ণের স্বাগত অভ্যর্থনার আয়োজন করো। এমন কিছু করো যাতে কৃষ্ণ তোমার ওপর প্রসন্ন হন। পিতামহ, আমি কি ভুল কিছু বলছি?"
সভায় উপস্থিত সকলেই ধৃতরাষ্ট্রের এই শুভবুদ্ধির প্রশংসা করলেন। দুর্যোধনের হুকুমে পথের ধারে গড়ে উঠতে লাগল ইন্দ্রপুরীর মতো রাজকীয় বিশ্রামাগার। কিন্তু কৃষ্ণের গতিবিধি বড় অদ্ভুত। উপপ্লব্য থেকে বৃকস্থল হয়ে তিনি যখন হস্তিনাপুরের দিকে এগোলেন, পথের ওই মোড়ানো প্রাসাদ বা আলোর ঝলকানির দিকে একবার চোখ তুলে তাকালেনও না।
এদিকে ধৃতরাষ্ট্রের রাজকীয় উত্তেজনার পারদ আরও চড়ছে। তিনি বিদুরকে ডেকে বললেন, "বিদুর, কাল সকালেই তো কৃষ্ণ এসে যাবেন। শহরটা ধ্বজা আর পতাকায় মুড়ে দাও। দুঃশাসনের মহলটা সবচেয়ে বড় আর চমৎকার, ওখানেই কৃষ্ণকে রাখার ব্যবস্থা করো। আমার আর দুর্যোধনের মহলের সেরা উপহারগুলো ওখানে সাজিয়ে দাও।"
বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা ঠাণ্ডা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর গলায় স্পষ্ট এক ধরনের শ্লেষ ফুটে উঠল—"মহারাজ, আপনার এই রাজসিক আড়ম্বর আর উপাচার একদম নিষ্ফল। শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে আপনি যা-ই বলুন না কেন, আপনার আসল মনটা আমি জানি। উপহারের লোভে ভুলিয়ে কৃষ্ণকে অর্জুনের কাছ থেকে আলাদা করা যাবে না। কৃষ্ণ উপহার চান না, তিনি চান সামান্য একটু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জল। আপনি এই মিথ্যে নাটক বন্ধ করে কৃঞ্চের আসল উদ্দেশ্যটা বুঝুন। তিনি যুদ্ধ থামাতে সন্ধি করতে আসছেন। পাণ্ডবরা আপনার সন্তানের মতো, তাদের প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনুন।"
বিদুরের কথা শেষ হতে না হতেই রাজসভা কাঁপিয়ে চিল চিৎকার করে উঠল দুর্যোধন, "পিতা! বিদুর একদম ঠিক কথা বলেছে। কৃষ্ণকে কোনোদিন আমাদের দলে টানা যাবে না! তাই ওর পেছনে এসব ধন-রত্ন নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না!"
পিতামহ ভীষ্ম নিচু ও গম্ভীর গলায় বললেন, "দুর্যোধন, কৃষ্ণ যা স্থির করেন তা বদলানোর সাধ্য কারও নেই। তিনি যা বলবেন, তা ধর্ম আর হিতের জন্যই বলবেন। জেদ ছেড়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে সন্ধি করাই তোমার একমাত্র পথ।"
কিন্তু দুর্যোধনের চোখে তখন এক ভয়ংকর অন্ধকার ছায়া। বিষাক্ত হেসে পিতামহের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, "পিতামহ! পাণ্ডবদের সঙ্গে রাজ্য ভাগ করে বেঁচে থাকার কথা আমি চিন্তা করতেই পারি না। আমার মনে অন্য পরিকল্পনা আছে। কাল কৃষ্ণ সভায় এলেই আমি তাঁকে বন্দি করব! কৃষ্ণ বন্দি হলে গোটা যাদবকুল আর পাণ্ডবরা হাঁটু মুড়ে আমার পায়ে এসে পড়বে। আপনারা শুধু বলুন, কীভাবে কাল সকালে গোপনে এই কাজটা সারা যায়!"
এই কথা শোনামাত্র পুরো কৌরবসভায় এক চরম স্তব্ধতা নেমে এল। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও আঁতকে উঠে হাত বাড়িয়ে বললেন, "এ তুই কী কথা বলছিস দুর্যোধন! কৃষ্ণ আমাদের অতিথি, আমাদের সুহৃদ। দূতকে বন্দি করা চরম পাপ, এ তো সনাতন ধর্মের বিরোধী!"
কিন্তু বৃদ্ধ ভীষ্মের ধৈর্যের বাঁধ ততক্ষণে ভেঙে গেছে। তিনি তীব্র ঘৃণায় আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর সাদা দাড়ি কাঁপছে প্রচণ্ড ক্রোধে। ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, "ধৃতরাষ্ট্র, তোমার এই পাপী পুত্রকে নির্ঘাত মৃত্যুতে ধরেছে! শুভাকাঙ্ক্ষীরা শত বোঝালেও এ নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকে আনবে। আর তুমি অন্ধ হয়ে পুত্রের এই কুকীর্তি মেনে নিচ্ছ! তুমি জানো না, কৃঞ্চের গায়ে হাত দেওয়া মানে নিজেদের সম্পূর্ণ বিনাশ ডেকে আনা? ও ধর্ম হারিয়েছে, ওর বিবেক বলতে কিছু নেই। এই উন্মত্ত পশুর প্রলাপ আমি আর এক মুহূর্তও শুনব না!"
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, চরম বিরক্তি ও ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে পিতামহ ভীষ্ম সভাগৃহ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলেন। পেছনে পড়ে রইল হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদ আর এক নিশ্চিত মহাপ্রলয়ের কালো ছায়া।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৮তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ২৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment