৭ম ভাগ উদ্যোগপর্ব- (বিদুর নীতির-তৃতীয় অধ্যায়) সত্যের কাছে হার মানে অহংকার
ধৃতরাষ্ট্র তখনও তৃপ্ত হননি। বিদুরের কথা শুনতে শুনতে তাঁর মনে হচ্ছিল, আরও কিছু শোনা দরকার, আরও গভীরে যাওয়া দরকার। তিনি বললেন, "তুমি বুদ্ধিমান, বিদুর। আরও ধর্ম আর অর্থের কথা বলো। তোমার কথায় আমার তৃপ্তি হচ্ছে না।"
বিদুর একটু থামলেন। তারপর বললেন—
"সব তীর্থে স্নান করা আর সবার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করা, এই দুটোর ফল আসলে একই রকম। বরং বলা ভালো, নম্র ব্যবহারের মূল্য আরও বেশি। আপনি আপনার ছেলে কৌরব আর পাণ্ডব দুই পক্ষের সঙ্গেই সমান নম্র হয়ে চলুন। এতে এই জীবনে যেমন যশ পাবেন, মৃত্যুর পরেও স্বর্গে জায়গা হবে। যতদিন মানুষ কারও সুকীর্তির কথা বলে, ততদিন সে স্বর্গেও সম্মান পেতে থাকে।
এই প্রসঙ্গে একটা পুরনো গল্প মনে পড়ছে আমার। কেশিনী নামে একটি মেয়েকে নিয়ে সুধন্বা আর বিরোচনের মধ্যে যে বিবাদ হয়েছিল, সেই গল্প।"
কেশিনীর প্রশ্ন
অনেক আগেকার কথা। কেশিনী নামের এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে, সেরা বরের খোঁজে স্বয়ংবর সভায় এসে বসেছেন। সেই সভায় হাজির হলেন দৈত্যরাজের ছেলে বিরোচন, তাঁকে পাওয়ার আশায়।
কেশিনী তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, "বিরোচন, তুমি বলো তো, ব্রাহ্মণ বড়, না দৈত্য? ব্রাহ্মণ যদি শ্রেষ্ঠ হয়, তাহলে আমি সুধন্বাকে বিয়ে করব না কেন?"
বিরোচনের গলায় তখন তাচ্ছিল্য। তিনি বললেন, "আমরা প্রজাপতির সেরা সন্তান, কেশিনী। তাই আমরাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই গোটা জগৎ আমাদের। দেবতা কিংবা ব্রাহ্মণ, আমাদের কাছে তাদের কী মূল্য?"
মেয়েটি একটুও দমলেন না। বললেন, "তাহলে এক কাজ করা যাক। আমরা এখানেই থাকি, কাল সকালে সুধন্বা আসবেন। তখন তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখেই আমি বুঝে নেব কে বড়।"
বিরোচন রাজি হলেন। "তাই হোক। কাল সকালে তুমি আমাকে আর সুধন্বাকে একসঙ্গেই দেখবে।"
সিংহাসনের লড়াই
পরদিন ভোরে সুধন্বা এসে পৌঁছলেন। ইনি প্রহ্লাদের ছেলে বিরোচনের কাছে, আর কেশিনীর কাছেও। ব্রাহ্মণকে আসতে দেখে কেশিনী উঠে দাঁড়ালেন, আসন এগিয়ে দিলেন, পা ধোয়ার জল আর অর্ঘ্য নিবেদন করলেন।
সুধন্বা বললেন, "প্রহ্লাদের ছেলে, তোমার এই সোনার সিংহাসনটা আমি শুধু ছুঁয়েই দেখব। তোমার পাশে বসতে পারব না। বসলে তো আমরা সমান হয়ে যাব।"
বিরোচন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, "সুধন্বা, তোমার বসার উপযুক্ত আসন হলো কাঠের পিঁড়ে, চাটাই, নয়তো কুশাসন। আমার পাশে বসার যোগ্যতা তোমার নেই।"
সুধন্বা শান্ত গলায় বললেন, "বাবা আর ছেলে একসঙ্গে এক আসনে বসতে পারেন। দুজন ব্রাহ্মণ পারেন, দুজন ক্ষত্রিয় পারেন, দুই বৃদ্ধ পারেন, দুজন বৈশ্য বা দুজন শূদ্রও পারেন। কিন্তু অন্য যে কোনো দুজন মানুষ একসঙ্গে বসতে পারে না। তোমার বাবা প্রহ্লাদ তো নিচেই বসে আমার সেবা করতেন। তুমি এখনও ছেলেমানুষ, আরামে বড় হয়েছ, তাই এসব তোমার জানা নেই।"
কথাটা বিরোচনের গায়ে লাগল। তিনি বললেন, "ঠিক আছে সুধন্বা, আমাদের অসুরদের যত সোনা, গরু, ঘোড়া আছে, সব আমি বাজি রাখছি। চলো, দুজনে মিলে কোনো জ্ঞানী মানুষের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আমাদের মধ্যে কে বড়।"
সুধন্বা মাথা নাড়লেন। "সোনা, গরু, ঘোড়া তোমার কাছেই থাক, বিরোচন। এসব বাজি রেখে লাভ নেই। আমাদের দুজনের প্রাণ বাজি রাখা হোক, আর যিনি এসব বিষয়ে সত্যিকারের জ্ঞানী, তাঁকেই জিজ্ঞেস করা হোক।"
বিরোচন একটু থমকে গেলেন। "প্রাণ বাজি রেখে কার কাছে যাব আমরা? দেবতাদের কাছে যাওয়ার উপায় আমার নেই, আর মানুষকে বিচারক বানানোরও অধিকার নেই আমার।"
সুধন্বা বললেন, "তাহলে চলো, দুজনে মিলে তোমার বাবার কাছেই যাই। আমার বিশ্বাস, প্রহ্লাদ নিজের ছেলের জন্যও মিথ্যে বলবেন না।"
প্রহ্লাদের বিচার
দুজনে তখন রাগে আর উত্তেজনায় টগবগ করছেন, সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে প্রহ্লাদের কাছে গিয়ে হাজির হলেন।
প্রহ্লাদ তাঁদের দেখে মনে মনে ভাবলেন—এই দুজনকে তো কখনো একসঙ্গে দেখা যায়নি, আজ একসঙ্গে আসছে কেন! তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "বিরোচন, তোমার সঙ্গে সুধন্বার কি বন্ধুত্ব হয়েছে? না হলে একসঙ্গে আসবে কেন? আগে তো কখনো তোমাদের একসঙ্গে দেখিনি।"
বিরোচন বললেন, "বাবা, সুধন্বার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়নি। আমরা দুজনে প্রাণ বাজি রেখে এসেছি। আপনার কাছে একটা প্রশ্নের সত্যি উত্তর চাই। দয়া করে মিথ্যে বলবেন না।"
প্রহ্লাদ তখন চাকরদের ডেকে সুধন্বার জন্য জল আর মধুপর্ক আনালেন। সুধন্বাকে বললেন, "ব্রাহ্মণ, আপনি আমার পূজনীয় অতিথি। আপনার জন্য সাদা গাভীও প্রস্তুত রেখেছি।"
সুধন্বা বললেন, "প্রহ্লাদ, জল আর মধুপর্ক আমি পথেই পেয়ে গেছি। তুমি বরং আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দাও—ব্রাহ্মণ বড়, না বিরোচন?"
প্রহ্লাদের গলায় তখন অস্বস্তি স্পষ্ট। "ব্রাহ্মণ, আমার একমাত্র ছেলে একদিকে, আর আপনি স্বয়ং অন্যদিকে। আপনাদের এই বিবাদে আমার মতো মানুষ কী করে স্থির সিদ্ধান্ত দেবে?"
সুধন্বা নাছোড়। "প্রহ্লাদ, তোমার যত গরু-ধন আর প্রিয় সম্পত্তি আছে, সব তোমার ছেলে বিরোচনকেই দিয়ে দাও। কিন্তু আমাদের এই বিবাদে তোমাকে সত্যি উত্তরই দিতে হবে।"
প্রহ্লাদ তখন একটা প্রশ্ন করলেন, যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছেন সিদ্ধান্তের পথটা। "সুধন্বা, বলুন তো, যে মানুষ সত্যি কথা বলে না, কিংবা অন্যায় বিচার করে, তার কী পরিণতি হয়?"
সুধন্বা তখন যা বললেন, তা যেন একরকম সতর্কবাণী। সতীনসম্পন্না নারী, জুয়ায় হেরে যাওয়া জুয়াড়ি আর ভার বয়ে চলা ক্লান্ত মানুষের রাতে যেমন কষ্ট হয়, মিথ্যা বিচার করা মানুষেরও তেমনই কষ্ট হয়। যে রাজা মিথ্যা বিচার করেন, তিনি যেন নিজের শহরেই বন্দী হয়ে বাইরের দরজায় ক্ষুধা-তেষ্টায় কাতর হয়ে শত্রুর মুখোমুখি হন। মিথ্যা বলার শাস্তি শুধু বলার মানুষটির একার নয়—পশুর ব্যাপারে মিথ্যা বললে পাঁচ পুরুষ, গরুর ব্যাপারে দশ পুরুষ, ঘোড়ার ব্যাপারে একশো পুরুষ আর মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বললে হাজার পুরুষ নরকে যেতে হয়। সোনার লোভে মিথ্যা বললে ভবিষ্যতের গোটা বংশটাই নরকে তলিয়ে যায়। আর জমি কিংবা নারীর জন্য যে মিথ্যা বলে, সে নিজের হাতে নিজের সর্বনাশ করে। তাই স্ত্রীর জন্যও কখনো মিথ্যা বলতে নেই।
প্রহ্লাদ তখন আর এড়াতে পারলেন না। সত্যিটাই বলে দিলেন। "বিরোচন, সুধন্বার বাবা অঙ্গিরা আমার চেয়েও বড়, সুধন্বা তোমার চেয়ে বড়, আর তাঁর মা তোমার মায়ের চেয়েও বড়। তাই আজ তুমি সুধন্বার কাছে হেরে গেছ। এখন থেকে সুধন্বাই তোমার প্রভু।" তারপর সুধন্বার দিকে ফিরে বললেন, "যদি এখন বিরোচনকে আমাকে ফিরিয়ে দাও, আমি তাকে চাই।"
সুধন্বার মুখে তখন এক ধরনের প্রশান্তি। "প্রহ্লাদ, তুমি ধর্মকে ধরে রেখেছ, নিজের স্বার্থে মিথ্যে বলোনি। তাই তোমার ছেলেকে তোমাকেই ফিরিয়ে দিলাম। বিরোচনকে আমি তোমার কাছে সঁপে দিলাম। শুধু একটা কাজ বাকি—এবার কুমারী কেশিনীর কাছে গিয়ে আমার পা ধুইয়ে দাও।"
বিদুরের উপদেশ
গল্প শেষ করে বিদুর ফিরে এলেন ধৃতরাষ্ট্রের দিকেই। তাঁর গলায় তখন একরকম মিনতির সুর।
"রাজেন্দ্র, এই জন্যই বলছি, সাম্রাজ্যের লোভেও কখনো মিথ্যে বলবেন না। ছেলের স্বার্থে মিথ্যে বলে নিজেকে, ছেলেকে আর মন্ত্রীদের একসঙ্গে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবেন না। দেবতারা কিন্তু রাখালের মতো লাঠি হাতে পাহারা দেন না। তাঁরা যাকে বাঁচাতে চান, তাকে শুধু ভালো বুদ্ধিটা দিয়ে দেন। মানুষ যখন সৎপথে চলে, তখন তার সব ইচ্ছেই আপনা থেকে পূরণ হতে থাকে, এতে সন্দেহ নেই। কপট মানুষের পাপ বেদও ঘোচাতে পারে না। পাখির ডানা গজালে সে যেমন বাসা ছেড়ে উড়ে যায়, তেমনই মৃত্যুর সময় বেদও পাপীকে ছেড়ে চলে যায়।
মদ খাওয়া, ঝগড়া করা, সবার সঙ্গে শত্রুতা পাতানো, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভাঙন ধরানো, আত্মীয়দের মধ্যে ভেদ তৈরি করা, রাজার সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করা, আর ভুল পথে চলা—এসব থেকে দূরে থাকা উচিত। আর হাত দেখে ভাগ্য বলা মানুষ, চুরি করে ব্যবসা চালানো লোক, জুয়াড়ি, বৈদ্য, শত্রু, বন্ধু, আর চারণ—এই সাতজনকে কখনো সাক্ষী মানবেন না।
সম্মানের সঙ্গে অগ্নিহোত্র করা, সম্মানের সঙ্গে নীরবতা পালন করা, সম্মানের সঙ্গে স্বাধ্যায় করা, আর সম্মানের সঙ্গে যজ্ঞ করা—এই চারটে জিনিস ভয় দূর করে। কিন্তু এগুলো ঠিকমতো না করলে সেগুলোই আবার ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘরে আগুন লাগানো, বিষ দেওয়া, জারজ সন্তানের রোজগারে বেঁচে থাকা, মদ বিক্রি করা, অস্ত্র বানানো, ঝগড়াটে স্বভাব, বন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, পরস্ত্রীগামী হওয়া, গর্ভপাত করানো, গুরুপত্নীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, ব্রাহ্মণ হয়েও মদ খাওয়া, তীক্ষ্ণ স্বভাবের, কাকের মতো কর্কশ কথা বলা, নাস্তিক হওয়া, বেদের নিন্দা করা, ঘুষ খাওয়া, পতিত, নিষ্ঠুর, আর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আশ্রিতকে রক্ষা না করে আঘাত করা—এসব মানুষ ব্রহ্মহত্যার মতোই পাপী।
আগুনে যেমন সোনা চেনা যায়, তেমনই আচরণে সৎ মানুষ চেনা যায়, ব্যবহারে ভালো মানুষ চেনা যায়, বিপদে বীরের পরীক্ষা হয়, অভাবে ধৈর্যশীলের পরীক্ষা হয়, আর কঠিন সময়েই বোঝা যায় কে শত্রু আর কে বন্ধু। বার্ধক্য সৌন্দর্য কেড়ে নেয়, আশা ধৈর্য কেড়ে নেয়, মৃত্যু প্রাণ কেড়ে নেয়, দোষ ধরার স্বভাব ধর্মকে কেড়ে নেয়, রাগ লক্ষ্মীকে তাড়িয়ে দেয়, নীচ মানুষের সেবা সৎ স্বভাব নষ্ট করে, কাম লজ্জা কেড়ে নেয়, আর অহংকার সবকিছু শেষ করে দেয়।
ভালো কাজেই লক্ষ্মী জন্মায়, কথার মাধুর্যে সেই লক্ষ্মী বাড়ে, চতুরতায় সে টিকে থাকে, আর সংযমেই সে সুরক্ষিত থাকে। আটটা গুণ একজন মানুষকে সুন্দর করে তোলে—বুদ্ধি, বংশমর্যাদা, সংযম, শাস্ত্রজ্ঞান, সাহস, বাজে কথা না বলা, সাধ্যমতো দান, আর কৃতজ্ঞতা। কিন্তু বাবা, এসবের ওপরেও একটা গুণ আছে, যা হঠাৎ এসে বাকি সব গুণকে ছাপিয়ে যায়—রাজা যখন কাউকে সম্মান দেন, সেই সম্মানটাই তখন বাকি সব গুণের ওপর জ্বলজ্বল করে ওঠে।
রাজন, এই আটটা গুণ মানুষকে স্বর্গের পথ দেখায়। এর মধ্যে চারটে গুণ মানুষকে নিজে থেকেই অনুসরণ করে, আর বাকি চারটে মানুষকে নিজে গিয়ে অনুসরণ করতে হয়। যজ্ঞ, দান, অধ্যয়ন আর তপস্যা—এই চারটে মানুষের পিছু নেয়। আর ইন্দ্রিয় সংযম, সত্যবাদিতা, সরলতা আর কোমলতা—এই চারটেকে মানুষকে নিজেই অনুসরণ করতে হয়। যজ্ঞ, অধ্যয়ন, দান, তপ, সত্য, ক্ষমা, দয়া, আর লোভহীনতা—এই আটটাই ধর্মের পথ। এর প্রথম চারটে দেখানোর জন্যও করা যায়, কিন্তু বাকি চারটে যাঁরা সত্যিকারের মহৎ নন, তাঁদের মধ্যে থাকতেই পারে না।
যে সভায় বৃদ্ধ আর প্রবীণ মানুষ নেই, সেটা আসলে সভাই নয়। যিনি ধর্মের কথা বলেন না, তিনি বৃদ্ধ নন—বয়স যা-ই হোক না কেন। যেখানে সত্যি নেই, সেটা ধর্ম নয়। আর যেখানে কপটতা আছে, সেটা সত্যিও নয়। সত্যবাদিতা, বিনয়, শাস্ত্রজ্ঞান, বিদ্যা, বংশমর্যাদা, স্বভাবের ভালোত্ব, ধন, বীরত্ব, আর মিষ্টি করে কথা বলা—এই দশটা জিনিস মানুষকে স্বর্গে পৌঁছে দেয়।
যে মানুষ পাপ কাজে অভ্যস্ত, সে পাপ করেই পাপের ফল পায়। আর যে পুণ্য করে অভ্যস্ত, সে পুণ্যেরই ফল পায়। তাই ভালো কাজ করা মানুষের কখনো খারাপ কাজ করা উচিত নয়—বারবার খারাপ কাজ করলে বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়। উল্টোদিকে, বারবার ভালো কাজ করলে বুদ্ধি বাড়ে। যার বুদ্ধি বাড়ে, সে সবসময় ভালো কাজই করতে থাকে। আর যে ভালো কাজ করে, সে ভালো জায়গাতেই যায়। তাই মানুষের উচিত মন দিয়ে সবসময় ভালো কাজ করা।
যে মানুষ শুধু দোষ খুঁজে বেড়ায়, অন্যের মনে আঘাত দেয়, নির্দয় হয়, শত্রুতা পোষণ করে, আর ছলনা করে—সে খারাপ কাজ করলে খুব তাড়াতাড়ি বড় বিপদে পড়ে। আর যিনি দোষ খোঁজেন না, যাঁর বুদ্ধি শুদ্ধ, তিনিই আসলে জ্ঞানী মানুষ। কারণ বুদ্ধিমান মানুষই ধর্ম আর অর্থ দুটোই সহজে অর্জন করতে পারেন এবং নিজের উন্নতি করতে পারেন।
মানুষ সারাদিন খাটে, যাতে রাতে একটু আরাম করতে পারে। আট মাস পরিশ্রম করে, যাতে বছরের বাকি চার মাস সুখে কাটাতে পারে। জীবনের গোড়ায় টাকা রোজগার করা উচিত, যাতে বুড়ো বয়সে সুখে থাকা যায়। আর সারা জীবন এমন কাজ করা উচিত, যাতে মরার পরেও শান্তি থাকে। ভালো হজম হলে তবেই খাবারের প্রশংসা করা যায়, নিষ্কলঙ্ক যৌবন কাটালে তবেই স্ত্রীর প্রশংসা করা যায়, যুদ্ধ জিতলে তবেই বীরের প্রশংসা করা যায়, আর তত্ত্বজ্ঞান পেলে তবেই তপস্বীর প্রশংসা করা যায়।
অন্যায়ভাবে রোজগার করা টাকা দিয়ে যদি কোনো দোষ ঢাকতে চান, তাহলে সেই দোষ ঢাকাই পড়ে না, উল্টে তার থেকে নতুন আরেকটা দোষ জন্ম নেয়। যে শিষ্য নিজের মন আর ইন্দ্রিয়কে বশে রাখতে পারে, তার আসল শাসক তার গুরু। দুষ্ট লোকের শাসক রাজা। আর যারা লুকিয়ে পাপ করে, তাদের শাসক সূর্যের ছেলে যমরাজ স্বয়ং। ঋষি, নদী, মহাত্মাদের বংশ, আর মেয়েদের দুশ্চরিত্রের আসল কারণ—এসব কখনো পুরোপুরি জানা যায় না।
রাজন, যে রাজা ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করেন, দানশীল, আত্মীয়দের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করেন, আর ভালো স্বভাবের, তিনিই বহুদিন ধরে পৃথিবী শাসন করতে পারেন। বীর, বিদ্বান, আর সেবাধর্ম জানা মানুষ—এই তিনজনই আসলে পৃথিবী থেকে সোনার ফুল কুড়িয়ে নেন।
ভরতশ্রেষ্ঠ, বুদ্ধি দিয়ে করা কাজই সবচেয়ে ভালো, গায়ের জোরে করা কাজ তার চেয়ে খানিকটা কম, দৌড়ে করা কাজ আরও কম, আর ভার বওয়ার কাজ সবচেয়ে নিচু স্তরের। আপনি দুর্যোধন, শকুনি, বোকা দুঃশাসন, আর কর্ণের হাতে রাজ্যের ভার দিয়ে কী করে উন্নতির আশা করছেন? পাণ্ডবরা তো গুণে ভরা, আর আপনার সঙ্গে বাবার মতোই ব্যবহার করে। আপনিও তাদের প্রতি ছেলের মতো স্নেহ রেখেই চলুন।"
বি:দ্র: এর পরে চলবে উদ্যোগ পর্বের বিদুর নীতির-চতুর্থ অধ্যায়
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ৭ম ভাগ (বিদুর নীতির তৃতীয় অধ্যায়) আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ষষ্ঠভাগ (বিদুর নীতির দ্বিতীয় অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment