২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া
২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া
কৌরব রাজসভায় উত্তেজনার পারদ তখন চরম শিখরে। যুদ্ধের দামামা বাজছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজসভায় শুরু হলো অহংকার, অপমান আর দূরদর্শিতার এক তীব্র সংঘাত।
দুর্যোধনের মনে জয়ের উন্মাদনা জাগিয়ে তুলতে কর্ণ দম্ভভরে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "রাজা, গুরু পরশুরামের দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র এখনো আমার কাছে অক্ষত। অর্জুনকে পরাস্ত করা আমার বাঁ হাতের খেল। শুধু অর্জুন নয়, পাঞ্চাল, করুষ, মৎস্যরাজ আর পাণ্ডবদের বংশকে একাই শেষ করব আমি। পিতামহ ভীষ্ম কিংবা দ্রোণাচার্যের যুদ্ধে নামারই দরকার নেই। আমার বাহিনী নিয়েই আমি পাণ্ডবদের ধূলিসাৎ করে দেব!"
কথাগুলো শুনে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মের মুখে ফুটে উঠল তিতা হাসি। তিনি রুক্ষ কণ্ঠে বললেন, "কর্ণ, তোমার বুদ্ধিতে বোধহয় কাল সাপের মতো ছোবল মেরেছে! তুমি কৌরবদের আগেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে, নিজের চামড়া বাঁচানোর চিন্তা করো আগে! খাণ্ডবদাহনের কথা ভুলে গেলে? শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের যে শক্তি বাণাসুর আর ভৌমাসুরকে ধ্বংস করেছিল, সেই শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তোমার মতো বীরেরা তাসের ঘরের মতো উড়ে যাবে।"
প্রবীণ পিতামহের এই কঠোর অপমান সহ্য করতে পারলেন না কর্ণ। অপমানে তাঁর রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। তিনি ক্ষোভ আর অভিমানে ফেটে পড়ে বললেন, "পিতামহ শ্রীকৃষ্ণের প্রশংসা করতেই পারেন, কিন্তু আমার সম্পর্কে যে বিষোদ্গার আপনি করলেন, তার জবাব শুনে রাখুন! আমি আমার ধনুক নামিয়ে রাখলাম। আজ থেকে আপনি বেঁচে থাকতে এই রণভূমিতে বা রাজসভায় আমাকে আর দেখতে পাবেন না। আপনার অধ্যায় শেষ হোক, তারপর পৃথিবীর লোক দেখবে কর্ণের আসল প্রভাব!" এই বলে মহাধনুর্ধর কর্ণ ক্রোধে রাজসভা ত্যাগ করলেন।
ভীষ্ম তখন মৃদু হেসে দুর্যোধনাকে বললেন, "দেখলে তো তোমার 'সত্যপ্রতিজ্ঞ' বীরের দশা? প্রতিদিন হাজার বীর মারার প্রতিজ্ঞা এখন কোথায় গেল? ব্রাহ্মণের পরিচয় লুকিয়ে গুরু পরশুরামের কাছ থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিখেছিল যে, তার ধর্ম ও তপস্যা তো সেদিনই নষ্ট হয়ে গেছে!"
কর্ণ সভা ছেড়ে গেলেও দুর্যোধনের অন্ধ অহংকার কমলো না। সে উল্টে ভীষ্মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলল, "পিতামহ, পাণ্ডবরাও মানুষ, আমরাও মানুষ। অস্ত্রচালনা বা শক্তিতে আমরা তো ওদের চেয়ে কম নই! তবে কেন ভাবছেন ওরাই জিতবে? আপনার বা দ্রোণাচার্যের ভরসায় আমি যুদ্ধ ক্ষেত্র সাজাচ্ছি না। পাঁচ পাণ্ডবকে মারার জন্য আমি, কর্ণ আর দুঃশাসন—এই তিনজনেই যথেষ্ট!"
ঠিক তখনই সভার পরিবেশ শান্ত করে মুখ খুললেন পরম প্রজ্ঞাবান বিদুর। স্বরের গাম্ভীর্যে সমগ্র সভা স্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি আত্মসংযম ও দমের গুরুত্ব বুঝিয়ে এক চমৎকার গল্প বললেন—
"একবার এক ব্যাধ জালে দুটো পাখিকে একসঙ্গে আটকে ফেলেছিল। কিন্তু পাখি দুটো আলাদা না হয়ে একসঙ্গে ডানা ঝাপটে জালটা নিয়েই আকাশে উড়ে গেল। ব্যাধ ব্যাকুল হয়ে নিচে নিচে দৌড়াতে লাগল। এক মুনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি এদের পেছনে ছুটছ কেন?' ব্যাধ বলল, 'ওদের মধ্যে মারাত্মক মিল, তাই জাল নিয়ে একজোট হয়ে উড়ছে। কিন্তু যেই ওদের মধ্যে ঝগড়া বাঁধবে, অমনি ওরা মাটিতে পড়বে আর আমি ধরে ফেলব।' হলোও তাই! কিছুটা দূরে গিয়ে পাখি দুটো নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল এবং নিচে আছড়ে পড়ল। ব্যাধ গিয়ে সহজেই তাদের ধরে ফেলল।"
বিদুর ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আত্মীয়দের মধ্যে ঝগড়া বাঁধলে শত্রুর লাভ হয়। একসঙ্গে বসে খাওয়া, মিষ্টি কথা বলা আর বিপদে পাশে থাকা—এটাই হলো সুসম্পর্ক। দুর্যোধন আজ পাহাড়ি গুহার সেই বিষধর সাপে ঘেরা সুস্বাদু মধুর মতো রাজ্যকে দেখছে, কিন্তু নিজের বিনাশ দেখতে পাচ্ছে না। দ্রুপদ, বিরাট আর ক্রুদ্ধ অর্জুন যখন আগুনে রূপ নেবে, তখন সব ভস্ম হয়ে যাবে। রাজন! আপনি যুধিষ্ঠিরকে বুকে টেনে নিন, নতুবা কৌরব বংশের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।"
বিদুরের কথা শেষ হতেই অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র আকুল হয়ে তাঁর পুত্রকে শেষবারের মতো বোঝাতে চাইলেন, "পুত্র দুর্যোধন! তুমি এক মূর্খ পথিকের মতো ভুল পথকে সঠিক মনে করছ। পাণ্ডবদের হারানোর স্বপ্ন তোমার নিজের প্রাণ নেওয়ার সামিল। যে অর্জুনের পাশে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আছেন, সেই সেনাদলকে জয় করা ত্রিভুবনে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি পিতামহ ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য ও বিদুরের কথা শোনো। পাণ্ডবরা তোমার সহোদর ভাই। ধর্ম মেনে ওদের অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দাও, তাতেই সবার কল্যাণ!"
কিন্তু ভাগ্যের লিখন বোধহয় অন্যরকম ছিল। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের আকুতি আর প্রাজ্ঞ বিদুরের অনুনয়—কোনোটাই দুর্যোধনের অহংকারের দেয়াল ভাঙতে পারল না। কৌরবদের বিনাশের উল্টোরথ ততক্ষণে ছুটতে শুরু করে দিয়েছে।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৩তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ২২তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment