মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত।
মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত। অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ এবং জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কেন বিদুরকে একজন শূদ্রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল, তার নেপথ্যে রয়েছে মহর্ষি মাণ্ডব্যের এক অভিশাপ। সেই কাহিনীটি নিচে বর্ণনা করা হলো:
অণিমাণ্ডব্যের উপাখ্যান ও বিদুরের জন্মকথা
মহর্ষি মাণ্ডব্যের কঠোর তপস্যা
প্রাচীনকালে মাণ্ডব্য নামে এক প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ ঋষি ছিলেন। তিনি ছিলেন অসীম ধৈর্যের অধিকারী, পরম বিদ্বান এবং সত্যনিষ্ঠ। নিজের কুটিরের সামনে একটি বৃক্ষতলে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে তিনি কঠোর মৌনব্রত পালন করছিলেন। দীর্ঘকাল ধ্যানে মগ্ন থাকার কারণে তিনি বাহ্যিক জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত ছিলেন।
চৌর্যপ্রবাদ ও রাজার দণ্ড
একদিন একদল দস্যু রাজকোষ লুণ্ঠন করে পালাবার সময় মাণ্ডব্যের আশ্রমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। রক্ষীবাহিনীর তাড়া খেয়ে দস্যুরা ভীত হয়ে ঋষির কুটিরে লুণ্ঠিত দ্রব্যসহ লুকিয়ে পড়ে। রাজা সৈন্যরা আশ্রমে এসে মৌনব্রতী ঋষিকে দস্যুদের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু ব্রতভঙ্গের ভয়ে ঋষি কোনো উত্তর দিলেন না।
সৈন্যরা তল্লাশি চালিয়ে কুটির থেকে চারজন দস্যু এবং লুণ্ঠিত ধনরত্ন উদ্ধার করে। তারা ধরে নিল যে ঋষিও এই চুরির সঙ্গে লিপ্ত। রাজা কোনো বিচার না করেই ঋষি মাণ্ডব্য ও চার দস্যুকে শূলে চড়ানোর আদেশ দিলেন।
শূলে অবস্থান ও অলৌকিক ক্ষমতা
শূলে বিদ্ধ হওয়ার পরও মহর্ষি মাণ্ডব্য প্রাণত্যাগ করলেন না। তিনি শূলবিদ্ধ অবস্থাতেই নিজের তপোবলে জীবিত রইলেন। কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাজদূতরা দেখল ঋষি জপ করছেন এবং তাঁর তেজ ম্লান হয়নি। এই অদ্ভুত সংবাদ শুনে রাজা ভীত হয়ে ঋষির কাছে ছুটে এলেন এবং নিজের ভুলের জন্য করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
দয়াশীল ঋষি রাজাকে ক্ষমা করলেন। শূল থেকে নামানোর সময় দেখা গেল শূলের অগ্রভাগ ঋষির দেহের ভেতরেই থেকে গেছে। সেই অবস্থাতেই তিনি পুনরায় কঠোর তপস্যা শুরু করেন এবং অসাধারণ শক্তি অর্জন করেন। তারপর থেকে তিনি জগতে 'অণিমাণ্ডব্য' নামে পরিচিত হন।
ধর্মরাজকে অভিশাপ
তপোবলে ঋষি অণিমাণ্ডব্য যমলোকে ধর্মরাজের কাছে উপস্থিত হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, "হে ধর্মরাজ! আমার কোন অপরাধের কারণে আমাকে এই অমানবিক যন্ত্রণা ও শূলদণ্ড ভোগ করতে হলো?"
ধর্মরাজ উত্তর দিলেন, "হে ঋষি, শৈশবে আপনি একটি ফড়িংকে লোহার কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করেছিলেন। সেই পাপের ফলেই আপনাকে এই দণ্ড ভোগ করতে হয়েছে।"
ক্রুদ্ধ ঋষি তখন ধর্মরাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, "শাস্ত্রানুসারে বারো বছর বয়সের নিচে কোনো শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝে না, তাই সেই বয়সের কোনো কাজই 'পাপ' হিসেবে গণ্য হতে পারে না। আপনি আমাকে অন্যায়ভাবে দণ্ড দিয়েছেন।"
শাস্ত্রের মর্যাদা লঙ্ঘনের অপরাধে ঋষি ধর্মরাজকে অভিশাপ দিয়ে বললেন:
"যেহেতু তুমি বিচারহীনভাবে আমাকে শাস্তি দিয়েছ, তাই তোমাকে মর্ত্যলোকে কোনো শূদ্রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করতে হবে।"
বিদুরের জন্ম
ঋষি মাণ্ডব্যের সেই অভিশাপের ফলেই ধর্মরাজ মর্ত্যে বিদুর রূপে অবতীর্ণ হন। কুরুবংশের উত্তারাধিকার সংকটের সময় মহর্ষি বেদব্যাস যখন অম্বিকাকে আহ্বান করেন, তখন অম্বিকা নিজে না গিয়ে নিজের এক পরিচারিকাকে ব্যাসদেবের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই ধর্মপ্রাণ ও বুদ্ধিমতী পরিচারিকার গর্ভেই বিদুর জন্মগ্রহণ করেন।
দাসীপুত্র বা শূদ্রাণীর গর্ভজাত হলেও বিদুর ছিলেন ধর্মরাজের অংশ। তাই তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী, শান্ত এবং কুরুবংশের প্রকৃত হিতাকাঙ্ক্ষী। তাঁর পাণ্ডিত্য ও ন্যায়পরায়ণতা আজও মহাভারতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

Comments
Post a Comment