২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা
২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা-
পাঞ্চালীর চোখে জল ছিল না, ছিল আগ্নেয়গিরির উত্তাপ।
যুধিষ্ঠির আর ভীমের নরম সুর শুনে দ্রৌপদীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণকে সামনে দেখে তাঁর চোখ থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল তেরো বছরের জমাট বাঁধা অপমান। বাঁ হাতে নিজের সেই দীর্ঘ, অগোছালো, রুক্ষ চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে দ্রৌপদী এসে দাঁড়ালেন মধুসূদনের সামনে।
বললেন, "মধুসূদন, তুমি তো সবই জানো। কৌরবদের সেই পৈশাচিক ক্রুরতা, ধৃতরাষ্ট্রের গোপন অভিসন্ধি—কিছুই তো তোমার অজানা নয়। আজ কোন যুক্তিতে তবে সন্ধির কথা উঠছে? অবধ্যকে বধ করলে যেমন পাপ, বধ্য শত্রু পার পেয়ে গেলেও তো সেই একই পাপ হয়! আমাকে সভাতলে দাসীর মতো টেনে আনা হয়েছিল, আর আমার স্বামীরা বেঁচে থেকেও নপুংসকের মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন। অর্জুনের ধনুর্ধারিতা আর ভীমের বাহুবলকে ধিক্কার! যদি সন্ধি করতেই হয়, তবে মনে রেখো দুঃশাসনের হাতে টানা আমার এই অভিশপ্ত চুলগুলোর কথা। পুরুষেরা না পারলে আমার বৃদ্ধ পিতা দ্রুপদ আর অভিমন্যুকে নিয়ে আমার ছেলেরা প্রতিশোধ নেবে। শত্রুর রক্তে এই চুল না ভিজলে কৃষ্ণা শান্ত হবে না!"
News
কথা বলতে বলতে দ্রৌপদীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, শরীর কেঁপে উঠল কান্নায়।
কৃষ্ণ স্থির চোখে চাইলেন কৃষ্ণার দিকে। সখা হিসেবে তাঁর হাত স্পর্শ করে গম্ভীর স্বরে বললেন, "ধৈর্য ধরো, কৃষ্ণে। আজ তুমি যেভাবে কাঁদছ, খুব শীঘ্রই কৌরব বংশের নারীরাও ঠিক এভাবেই আপনজনদের জন্য বিলাপ করবে। যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, হিমালয় স্থানচ্যুতও হয়, তাহলেও জেনে রেখো—আমার কথা মিথ্যা হবে না। হস্তিনাপুরের কাল ঘনিয়ে এসেছে।"
News
যাত্রার আয়োজন সম্পূর্ণ। শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের সূচনালগ্নে, কার্তিক মাসে রেবতী নক্ষত্রে মৈত্র মুহূর্তে রথে উঠলেন কৃষ্ণ। সঙ্গে অনুগামী সাত্যকি। গরুড়চিহ্নিত রথে চারটে অপরাজেয় ঘোড়া—শৈব্য, সুগ্রীব, মেঘপুষ্প আর বলাহক প্রস্তুত। স্বয়ং পাণ্ডবরা এবং মিত্র রাজারা বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে দিতে এলেন তাঁদের প্রিয় 'শ্যামসুন্দর'কে। বিদায়বেলায় যুধিষ্ঠির হাত দুটো চেপে ধরে বললেন, "গোবিন্দ, আমাদের দুঃখিনী মা কুন্তীকে আমার প্রণাম জানিও। আর হস্তিনাপুরের গুরুজনদের যথাযোগ্য অভিবাদন দিও।"
অর্জুন হেসে বললেন, "সখা, যদি অর্ধরাজ্যে ওরা রাজি হয় তো ভালো, নইলে কুরুক্ষেত্রে তাদের বিনাশ সুনিশ্চিত।" অর্জুনের সেই দৃপ্ত ঘোষণায় ভীমসেন এমন সিংহনাদ করে উঠলেন যে চারপাশের প্রান্তর কেঁপে উঠল।
রথ ছুটল হস্তিনাপুরের দিকে। পথে একের পর এক অলৌকিক ও অমঙ্গলচিহ্ন দেখা দিতে লাগল—মেঘহীন আকাশে বজ্রপাত, নদীর গতি উল্টোদিকে ঘুরে যাওয়া! যেন বিশ্বপ্রকৃতি টের পাচ্ছিল এক মহা-প্রলয়ের আগমন বার্তা। কিন্তু যে পথে কৃষ্ণ চলছিলেন, সেদিকের বাতাস ছিল স্নিগ্ধ ও মাঙ্গলিক।
যাত্রাপথে পরশুরাম সহ বহু দেবর্ষি ও রাজর্ষি কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করলেন। পরশুরাম বললেন, "হে যদুপতি, হস্তিনাপুরের রাজসভায় তোমার ধর্ম ও অর্থযুক্ত ভাষণ শোনার জন্য আমরা সবাই সেখানে উপস্থিত থাকব।"
গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে, সন্ধ্যার সোনালী আলোয় কৃষ্ণ এসে পৌঁছালেন 'বৃকস্থল' নামে একটি ছোট জনপদে। রথ থামল। দারুক ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিল। কৃষ্ণ হাসিমুখে গ্রামবাসীদের বললেন, "আজকের রাতটা আমরা রাজকার্য স্থগিত রেখে তোমাদের এখানেই কাটাব।"
মহাতেজস্বী ঈশ্বর রূপের আড়ালে থাকা সেই মানুষটি সাধারণ অতিথির মতো গ্রামবাসীদের দেওয়া নৈশাহার গ্রহণ করলেন। আর সেই তারা-ঘেরা গ্রামের নিরিবিলি রাতে, আসন্ন মহাভারতের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে, পরম শান্তিতে একরাত ঘুমিয়ে নিলেন নারায়ণ।
বি: দ্র: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে।
এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ২৭তম ভাগের আলোচনা। উদ্যোগপর্ব চলবে।
উদ্যোগপর্বের ২৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :
"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।

Comments
Post a Comment