১৫তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- তৃতীয় অধ্যায়মৌনের গভীরে যে পরমাত্মা: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ


১৫তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- তৃতীয় অধ্যায়-মৌনের গভীরে যে পরমাত্মা: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ

ধৃতরাষ্ট্র প্রশ্ন করলেন, "হে বিদ্বান, মৌন বলতে ঠিক কী বোঝায় বলুন তো? শুধু চুপ করে থাকা, নাকি পরমাত্মার নিজস্ব রূপই আসল মৌন? এই মৌনভাবের গভীরে কী লুকিয়ে আছে, খুলে বলুন আমাকে। মানুষ কি মৌন ব্রত পালন করে সেই পরম মৌনস্বরূপকে ছুঁতে পারে? জগতে মানুষ এর চর্চা করে কীভাবে?"

হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "মহারাজ, মন আর বেদবাক্য যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেই অতল স্তব্ধতাই পরমাত্মা। তিনিই আসল মৌন। বৈদিক আর লৌকিক—সব শব্দই যাঁর থেকে জন্ম নেয়, সেই পরমেশ্বরে তন্ময় হয়ে ধ্যান করলেই তিনি অন্তরে জেগে ওঠেন।"

মনে সংশয় জাগল ধৃতরাষ্ট্রের, "কিন্তু যে মানুষ ঋক, যজু বা সাম—সব বেদই জানে, তবু পাপে ডুবে থাকে, বেদ কি তাকে সেই পাপ থেকে মুক্ত করতে পারে না?"

সনৎসুজাত বললেন, "বানিয়ে কিছু বলছি না, রাজা। বেদ কোনো পাপাচারী অজ্ঞকে তার নিজের কুকর্ম থেকে বাঁচাতে পারে না। যে মানুষ ধর্মের পোশাক পরে ভেতরে ছদ্মবেশ পুষে রাখে, তাকে বেদ উদ্ধার করে না। ডানায় শক্তি এলে পাখি যেমন অনায়াসে পুরনো বাসা ছেড়ে আকাশে উড়ে যায়, ঠিক তেমনি জীবনের শেষবেলায় বেদও সেই মিথ্যাচারীকে একা ফেলে চলে যায়।"

"তাহলে বেদ জেনে পবিত্র হওয়ার এই যে পুরনো বিশ্বাস, তার সত্যতা কোথায়?" প্রশ্ন করলেন ধৃতরাষ্ট্র।

সনৎসুজাত বললেন, "মহারাজ, পরমাত্মার নাম আর রূপের নানা প্রতীক এই জগতে দেখা যায়, বেদও সেসব নির্দেশ করে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত সত্তা এই দৃশ্যমান জগতের চেয়ে অনেক আলাদা, অনেক গভীরে। তাঁকে পাওয়ার জন্যই বেদে তপস্যা আর যজ্ঞের বিধান দেওয়া আছে। পণ্ডিতেরা প্রথমে ওই তপস্যা দিয়ে পুণ্য অর্জন করেন। সেই পুণ্যের তাপে পাপ ধুয়েমুছে গেলে জ্ঞানের আলো ফোটে, আর তখনই নিজের সচ্চিদানন্দ রূপের মুখোমুখি হওয়া যায়। কিন্তু মোক্ষ না চেয়ে কেউ যদি শুধু ধর্ম, অর্থ আর কামের লোভেই আটকে থাকে, তবে তাকে ইহলোকের কর্মফল পরলোকে ভোগ করে সেই ভোগ শেষ হলে আবার এই সংসারে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু যে ব্রহ্মজ্ঞানী কোনো কামনার ফাঁদে না পড়ে তপস্যায় স্থির থাকেন, তিনি এই মর্ত্যে বেঁচে থাকতে থাকতেই পরম জ্ঞানের স্বাদ পান।"

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "মুনিবর, তপস্যা তো একই জিনিস, তবু কারও তপস্যা বাড়ে, কারওটা কমে যায় কেন?"

বুঝিয়ে বললেন সনৎসুজাত, "যে তপস্যায় কোনো কামনা বা পাপের ভেজাল নেই, সেটাই বিশুদ্ধ তপ। সেটাই ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হয়। আর কামনার ছোঁয়া লাগামাত্র তপস্যার ক্ষয় শুরু হয়। রাজা, বেদজ্ঞ মনীষীরা এই বিশুদ্ধ তপস্যা থেকেই মোক্ষ পান।"

"তাহলে তপস্যার সেই গোপন দোষগুলো বলুন আমাকে, যাতে নিজেকে সজাগ রাখতে পারি," বললেন ধৃতরাষ্ট্র।

সনৎসুজাত বলতে শুরু করলেন, "রাজা, তপস্যার পথে বারোটা প্রধান দোষ আর তেরো রকমের ক্রূর স্বভাব বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর বারোটা সদ্গুণই হলো মানুষের আসল ব্রত।

কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অসন্তোষ, নির্দয়তা, অন্যের দোষ খোঁজা, অহংকার, শোক, লালসা, হিংসা, ঈর্ষা আর পরনিন্দা—এই বারোটা দোষ শিকারির মতো সুযোগ বুঝে মানুষের স্বভাবের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে। এসব থেকে সবসময় দূরে থাকা চাই।

আর তেরো রকমের ক্রূর মানসিকতা হলো: নিজেকে নিয়ে অহংকারী হওয়া, লোলুপতা, সবসময় রেগে থাকা, চঞ্চলতা, দাম্ভিকতা, আশ্রিতকে রক্ষা না করা, সদাকামী হওয়া, বিসদৃশ আচরণ করা, অতিরিক্ত আত্মমর্যাদাবোধ, দান করে অনুতপ্ত হওয়া, কৃপণতা, শুধু অর্থ আর কামের প্রশংসা করা, আর স্ত্রী-দোষে আক্রান্ত থাকা।

অন্যদিকে ধর্ম, সত্য, ইন্দ্রিয়সংযম, তপস্যা, ঈর্ষাহীনতা, লজ্জা, সহনশীলতা, অসূয়াহীনতা, যজ্ঞ, দান, ধৈর্য আর শাস্ত্রজ্ঞান—এই বারোটা গুণ যার মধ্যে আছে, সে গোটা বিশ্বকেই নিজের অনুগামী করে নিতে পারে। এমনকি এর দু-একটাও যার মধ্যে থাকে, বুঝতে হবে সে পরম সম্পদের মালিক।

দম—অর্থাৎ ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, ত্যাগ, আর অপ্রমাদ—এই তিনটার মধ্যেই অমৃতের বাস। এরাই মানুষকে পরমাত্মার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

দমের গুণগুলো: মিথ্যাচার, ভুল ধারণা, কামনা, শুধু ধনের নেশা, ক্রোধ, শোক, হিংসা, আত্মশ্লাঘার মতো আঠারোটা দোষ থেকে মুক্ত থাকাই জিতেন্দ্রিয় হওয়া।

ত্যাগ ছয় রকমের—

এক, সম্পদ পেয়েও ভেসে না যাওয়া।

দুই, জনকল্যাণে বা যজ্ঞে অর্থ ব্যয় করা।

তিন, নিরাসক্ত হয়ে আসক্তি আর কাম ছেড়ে দেওয়া—এটাই সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে বড়।

চার, দুঃখের ঘটনায় ভেঙে না পড়া।

পাঁচ, প্রিয় কিছু বা স্বজনকে আঁকড়ে ধরার লোভ না রাখা।

ছয়, যোগ্য পাত্রে উপযুক্ত দান করা।

অপ্রমাদের আটটা দিক: সত্য, ধ্যান, সমাধি, যুক্তি, বৈরাগ্য, চুরি না করা, ব্রহ্মচর্য আর অপরিগ্রহ।

মন আর পাঁচটা ইন্দ্রিয় যখন বাইরের ভোগে মেতে ওঠে, মানুষ যখন অতীত নিয়ে আফসোস করে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আকাশকুসুম কল্পনা করে—তখনই প্রমাদ, মানে অসাবধানতা জন্ম নেয়। এসব ছেড়ে যিনি সত্যে স্থির থাকেন, তিনিই আসল আনন্দ পান।"

ধৃতরাষ্ট্র এবার আরেকটা কৌতূহল প্রকাশ করলেন, "মুনিবর, সমাজে তো চতুর্বেদী, ত্রিবেদী, বহুপাঠী—কত রকম মানুষ। এদের মধ্যে আসল 'ব্রাহ্মণ' বলব কাকে?"

মৃদু হেসে সনৎসুজাত বললেন, "রাজা, আসল সত্য এক, অদ্বিতীয়। সেটাকে পুরোপুরি বুঝতে না পারার ফলেই মানুষের সুবিধার জন্য একাধিক বেদের জন্ম হয়েছে। যে মানুষ সেই মূল সত্যস্বরূপ পরমাত্মায় স্থির হতে পেরেছেন, তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। শুধু পাণ্ডিত্য বা কথার চাতুরী দিয়ে ব্রাহ্মণ হওয়া যায় না।

যে শত বেদ পড়েও অন্তরের পরমাত্মাকে চেনে না, সে আসলে বেদবিদ নয়। মনের সব অনর্থ ছেড়ে শুধু তপস্যা আর জ্ঞানের আলোয় যিনি হৃদয়ের পরমাত্মাকে অনুভব করেন, তিনিই আসল মুনি।

কিছু খুঁজতে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই—কোনো বাইরের আচার-অনুষ্ঠানেরও দরকার নেই। নিজের ভেতরের স্তব্ধতায়, নিজের হৃদয়ে যিনি ব্রহ্মকে অনুভব করতে পারেন, আর অন্যের সংশয় মেটাতে পারেন, তিনিই সর্বজ্ঞ, তিনিই আসল বেদবেত্তা।"

বি: দ্র: পরবর্তী ভাগে থাকবে সনৎসুজাতীয়-চতুর্থ  অধ্যায়"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৫তমভাগের (সনৎসুজাতীয়-তৃতীয় অধ্যায়)আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে।

উদ্যোগপর্বের ১৪তম  ভাগের (সনৎসুজাতীয়-দ্বিতীয় অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)