১৪তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- দ্বিতীয় অধ্যায়-


১৪তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- দ্বিতীয় অধ্যায়-প্রমাদই মৃত্যু: অন্ধ নৃপতির সংশয় ও সনৎসুজাতের প্রজ্ঞা

অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মনটা তখন যেন একটা অস্থির নদী — কোথাও শান্তি নেই, কোথাও তল খুঁজে পাচ্ছেন না। বিদুর অনেক কথা বলে গেছেন, প্রজ্ঞার কথা, নীতির কথা, কিন্তু তারপরও রাজার বুকের ভেতর একটা তীব্র আকুলতা জেগে রইল — সেই চরম সত্যকে, সেই পরমাত্মাকে একবার নিজের চোখে দেখার আকুলতা। মনটাকে যতটা সম্ভব একমুখী করে, নিভৃতে বসে তিনি ডেকে পাঠালেন ঋষি সনৎসুজাতকে। বিনীত গলায় প্রশ্ন করলেন তাঁকে।

"প্রভু সনৎসুজাত," ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "একটা কথা শুনেছি আপনার মুখ থেকে — মৃত্যু বলে নাকি সত্যিই কিছু নেই। আবার এমনও শুনি যে দেবতা আর অসুরেরা মৃত্যুকে এড়াবার জন্যেই কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন। এই দুটো কথা তো একসঙ্গে মেলে না। কোনটা আসল সত্যি, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন তো।"

সনৎসুজাত শান্ত স্বরে বললেন, "রাজা, তোমার প্রশ্নের দুটো দিকই আসলে সত্যি। যারা অজ্ঞ, তারা মোহে পড়ে ভাবে মৃত্যুর একটা বাস্তব চেহারা আছে, আর সেই মৃত্যুকে কর্ম দিয়ে ঠেকানো যায়। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ বলে, মৃত্যু বলে আদৌ কিছু নেই। আসল ব্যাপারটা কী, একটু মন দিয়ে শোনো।

মৃত্যু কোনো বাঘের মতো হিংস্র জন্তু নয় যে থাবা বাড়িয়ে মানুষকে খুবলে খাবে। মৃত্যুর তো কোনো রূপ নেই, চোখে দেখা যায় না তাকে। আমার তো মনে হয় — প্রমাদ, মানে অসাবধানতা, বিবেকহীনতা — এটাই আসল মৃত্যু। আর যে সজাগ থাকে, সচেতন থাকে, তার কাছেই অমৃত। যে মানুষ অসাবধান হয়ে আসুরিক প্রবৃত্তির টানে চলে, সে ধ্বংসের দিকে হেলে পড়ে। আর যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে, দৈবী গুণে সমৃদ্ধ হয়ে সে ব্রহ্মের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

অনেকে ভুল করে যমকেই মৃত্যু বলে ভাবে, আর কঠোর ব্রহ্মচর্যকেই অমৃত মনে করে। কিন্তু যম তো পিতৃলোকের রাজা মাত্র — পুণ্যবানের কাছে তিনি পরম আনন্দের, পাপীর কাছে তিনিই ভয়ঙ্কর। আসলে মানুষের নিজের ভেতরে যে ক্রোধ, যে অসাবধানতা, যে লোভ লুকিয়ে থাকে — যমের নির্দেশেই সেগুলো ধ্বংসের রূপ নেয়। অহংকারে অন্ধ হয়ে যে মানুষ ভুল পথে চলে, সে কখনো নিজের আত্মাকে দেখতে পায় না। আসক্তি আর মায়ার টানে সে বারবার জন্ম-মৃত্যুর চাকায় ঘুরতে থাকে।

যেসব প্রাণী দেহের মোহে অন্ধ, মরার পর স্বর্গে গেলেও তারা সংসারের চক্র থেকে বেরোতে পারে না। ইন্দ্রিয়সুখের লোভে তাদের বারবার নানা যোনিতে জন্ম নিতে হয়। মানুষের প্রথম পতন শুরু হয় বিষয়ের চিন্তা থেকে — সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় কাম, তারপর ক্রোধ, আর শেষ পর্যন্ত সেটাই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু যার বুদ্ধি স্থির, সে কামনা জাগবার সঙ্গে সঙ্গেই সেটাকে নষ্ট করে দেয়, আর জন্ম-মৃত্যুর বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসে। বিষয়ভোগে অন্ধ মানুষ ঠিক সেই মাতাল পথিকের মতো, যে সামনে গর্ত দেখতে পায় না আর হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। তাই রাজা, মৃত্যুকে যদি সত্যিই জয় করতে চাও, তাহলে অন্তরের কাম আর আসক্তিকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলো।"

ধৃতরাষ্ট্র তখন একটা মূল প্রশ্ন তুললেন, "হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, বেদ তো যজ্ঞ আর সৎকর্মের কথাই বলে, পুণ্যলোক পাবার পথ দেখায়। সেটাই যদি পরম লক্ষ্য হয়, তাহলে জ্ঞানীরা শুধু কর্মকেই আশ্রয় করে থাকেন না কেন?"

সনৎসুজাত বললেন, "রাজা, যারা অজ্ঞ, তারাই কামনার তাড়নায় যজ্ঞ করে, স্বর্গের আশায় ছটফট করে। কিন্তু যাদের কোনো কামনা নেই, তারা জ্ঞানের পথ ধরে মায়ার সব বাঁধন কেটে সরাসরি পরমাত্মার সঙ্গে মিশে যায়।"

ধৃতরাষ্ট্র আবার জিজ্ঞেস করলেন, "যদি সেই এক অদ্বিতীয় পরমাত্মাই এই বিশাল জগতের রূপ ধরে নিজেকে প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁকে শাসন করবার আর কে আছে? আর কেনই বা তিনি এমন নানা রূপ ধারণ করেন?"

সনৎসুজাত মৃদু হেসে বললেন, "মায়ার স্পর্শেই এই সৃষ্টিকে বহুরূপী মনে হয়। এটা আসলে সেই অনাদি মায়ারই খেলা। জগৎ বদলায়, কিন্তু পরমাত্মা চিরকাল একই থাকেন, অপরিবর্তনীয়। এই বিশ্বজোড়া মায়াশক্তি আসলে তাঁরই পরম সমর্থনের প্রকাশ — বেদও সেই কথাই বলে।"

ধৃতরাষ্ট্র জানতে চাইলেন, "পাপ আর ধর্মের সম্পর্কটা তাহলে কেমন? ধর্ম কি পাপকে ধুয়ে দেয়, নাকি পাপের কাছে হার মানে ধর্ম?"

সনৎসুজাত স্পষ্ট করে বললেন, "ধর্ম আর পাপ — দুটোরই ফল আলাদা, আর দুটোই আলাদা করে ভোগ করতে হয়। তবে হ্যাঁ, যদি কেউ জ্ঞানের পথে পরমাত্মায় স্থিত হতে পারে, তাহলে তার অতীতের পাপ-পুণ্য দুটোই চিরকালের মতো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু যদি সেই অবস্থা না পাওয়া যায়, তাহলে মানুষকে তার ভালো-মন্দ কাজের ফল একে একে স্বর্গে আর নরকে ভোগ করেই আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়। মনে রেখো রাজা, কামনাহীন ধর্ম বড় শক্তিশালী — সে ধীরে ধীরে পুরনো পাপের প্রভাব মুছে দিয়ে সাধককে সিদ্ধির পথে নিয়ে যায়।"

শেষে ধৃতরাষ্ট্র মোক্ষলাভের আসল পথ জানতে চাইলেন। সনৎসুজাত তখন সহজ, নিরাভরণ জীবনের গভীর রহস্য খুলে বললেন —

"মহাত্মা সন্ন্যাসী বা প্রকৃত জ্ঞানীরা কখনো নিজের বিদ্যা, শক্তি বা সাধনার কথা জাহির করেন না। যারা পাণ্ডিত্য বা ক্ষমতার গর্ব করে জীবিকা চালায়, তারা আসলে নিজের বমি নিজেই খায় — তাদের পতন অনিবার্য। যে নিজের প্রশংসায় উদাসীন, অন্যের সম্পদে যার লোভ নেই, মান-সম্মানের মোহ যাকে অন্ধ করে না — সেই তো আসল বেদজ্ঞ।

এই জগতে লোকদেখানো নাম-যশ আর প্রকৃত নীরবতা কখনো একসঙ্গে থাকতে পারে না। জাগতিক মান-সম্মানই আসলে পরলোকের কল্যাণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। রাজা, ব্রহ্মসুখ পাবার পথ বড় সূক্ষ্ম, বড় কঠিন। তার আসল সম্বল হলো — সত্য, সরলতা, লজ্জা, আত্মসংযম, পবিত্রতা আর জ্ঞান। এই কয়েকটা গুণের সাধনাই মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর ওপারে নিয়ে গিয়ে চিরশান্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে।"

বি: দ্র: পরবর্তী ভাগে থাকবে সনৎসুজাতীয়- তৃতীয়  অধ্যায়: "বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার " সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছে। 

এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৪তমভাগের (সনৎসুজাতীয়-দ্বিতীয় অধ্যায়) আলোচনা।  উদ্যোগপর্ব চলবে। 

উদ্যোগপর্বের ১৩তম ভাগের (সনৎসুজাতীয়-প্রথম  অধ্যায়) সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

"বাঙালি প্রজ্ঞা গ্রন্থাগার' কর্তৃক প্রকাশিত।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)