মহর্ষি কণ্ব: এক নির্মম ঋষি ও বাৎসল্যের গল্প
মহর্ষি কণ্ব: এক নির্মম ঋষি ও বাৎসল্যের গল্প
ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনীতে মহর্ষি কণ্ব এক অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং গম্ভীর ব্যক্তিত্ব। ঋগ্বেদের বহু মন্ত্রের দ্রষ্টা এই মহান ঋষিকে মানুষ চেনে তাঁর কঠোর তপস্যা, জ্ঞান এবং এক অদ্ভুত মমতাময় হৃদয়ের জন্য।
গল্পের শুরু বৈদিক যুগের এক শান্ত, নিবিড় অরণ্যে। মালিনী নদীর তীরে ছিল মহর্ষি কণ্বের আশ্রম। হরিণের দল সেখানে ঘুরে বেড়াত নির্ভয়ে, আর ঋষিকুমারদের বেদপাঠের শব্দে মুখরিত থাকত চারপাশ। এক পরম শান্তিময় পরিবেশ।
একদিন মহর্ষি কণ্ব নদীর তীরে তপস্যার কাজে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই তাঁর কানে এল এক নবজাতকের কান্নার শব্দ। নদীর চরে গিয়ে তিনি দেখলেন, এক অতি রূপসী শিশুকন্যা একাকী পড়ে আছে। বনের শকুন বা 'শকুন্ত' পাখিরা ডানা মেলে তাকে রোদ-বৃষ্টি থেকে আগলে রেখেছে।
কন্যাটির মায়াবী মুখ দেখে বৈরাগী ঋষির কঠোর হৃদয় কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশে পিতা বিশ্বামিত্র আর মাতা মেনকা এই নিষ্পাপ শিশুকে বনে ফেলে চলে গেছেন। পাখির দল যাকে রক্ষা করছিল, তাই কণ্ব ঋষি ভালোবেসে শিশুটির নাম রাখলেন শকুন্তলা।
ঋষি কণ্ব নিজের হাতে শকুন্তলাকে বড় করে তুললেন। তপস্বী হয়েও তিনি পিতা হয়ে উঠলেন। শকুন্তলাও আশ্রমের গাছপালা আর পশুপাখিদের ভালোবেসে কণ্ব ঋষির স্নেহে বড় হতে লাগল।
কয়েক বছর পর, একদিন রাজা দুষ্যন্ত মৃগয়ায় এসে আশ্রমে প্রবেশ করেন। মহর্ষি কণ্ব তখন আশ্রমে ছিলেন না। দুষ্যন্ত আর শকুন্তলা পরস্পরের প্রেমে পড়েন এবং গান্ধর্ব মতে বিবাহ করেন। রাজা দুষ্যন্ত ফিরে যাওয়ার সময় শকুন্তলাকে একটি রাজকীয় আংটি দিয়ে যান এবং দ্রুত রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য নেমে আসে ঋষি দুর্বাসা আশ্রমে এলে। শকুন্তলা দুষ্যন্তের চিন্তায় মগ্ন থাকায় দুর্ব্যাসাকে লক্ষ্য করেনি। ক্রুদ্ধ দুর্ব্যাসা অভিশাপ দেন—যার চিন্তায় শকুন্তলা মগ্ন, সে তাকে ভুলে যাবে। পরবর্তীতে অভিশাপের কথা জানতে পেরে দুর্ব্যাসা নমনীয় হয়ে বলেন, কোনো স্মৃতিচিহ্ন দেখালেই রাজার আবার সব মনে পড়বে।
মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে ফিরে দিব্যদৃষ্টিতে সব জানতে পারেন। তিনি শকুন্তলাকে কোনো দোষ না দিয়ে স্নেহে বুকে টেনে নেন। একজন তপস্বী হয়েও শকুন্তলাকে দুষ্যন্তের প্রাসাদে পাঠাবার দিন কণ্ব ঋষি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। মহাকবি কালিদাসের রচনায় কণ্ব ঋষির সেই বিদায়বেলার কান্না আজও পৃথিবীর সেরা পিতৃহৃদয়ের প্রতীক হিসেবে মানা হয়।
মহর্ষি কণ্ব শকুন্তলাকে রাজধর্মে চলার উপদেশ দিয়ে বলেন, "পতিগৃহে গিয়ে গুরুজনদের সেবা কোরো, সতীনদের বোনের মতো দেখো আর স্বামীর অনুগত থেকো।"
পরবর্তীতে দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার মিলন ঘটে এবং তাঁদেরই সন্তান 'ভরত'-এর নামানুসারে এই দেশের নাম হয় ভারতবর্ষ।
মহর্ষি কণ্ব প্রমাণ করেছিলেন, শুধু জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না; আসল পিতা তিনিই, যিনি মমতায়, স্নেহে এবং সংস্কারে সন্তানকে গড়ে তোলেন।

Comments
Post a Comment