Posts

৪৩তম বনপর্ব-ঋষি মার্কণ্ডেয় ও মনুর আশ্চর্য উপাখ্যান বৈবস্বত মনু ও মহামৎস্যের কাহিনি

Image
৪৩তম বনপর্ব-ঋষি মার্কণ্ডেয় ও মনুর আশ্চর্য উপাখ্যান বৈবস্বত মনু ও মহামৎস্যের কাহিনি পাণ্ডুনন্দন যুধিষ্ঠির  মার্কণ্ডেয় মুনির দিকে চেয়ে অত্যন্ত বিনম্র গলায় অনুরোধ করলেন, "মুনিবর, আপনি দয়া করে আমাদের বৈবস্বত মনুর সেই পবিত্র চরিত্রটি বর্ণনা করুন।" মার্কণ্ডেয় মুনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি যেন চিরে চলে গেল মহাকালের গভীরে। বহু কোটি বছর আগের এক নিভৃত, কুয়াশামোড়া সকাল যেন আবার তাঁর চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন। "রাজন, সে এক আশ্চর্য সময়। বিবস্বান অর্থাৎ সূর্যের এক প্রতাপশালী পুত্র ছিলেন, যাঁর দীপ্তি ছিল স্বয়ং প্রজাপতির মতো। তিনি ছিলেন এক মহান রাজর্ষি। একদিন তিনি সব ছেড়ে বদরিকাশ্রমে গিয়ে দাঁড়ালেন— একপায়ে ভর দিয়ে, দুই হাত স্বর্গের দিকে তুলে। একটানা দশ হাজার বছর ধরে চলল সেই কঠোর তপস্যা। ঝড় এল, বৃষ্টি এল, কিন্তু মনুর শরীর নড়ল না, এক চুল টলল না। এমনই ইস্পাতকঠিন ছিল তাঁর সংকল্প। একদিন তিনি গিরিণী নদীর তীরে আহ্নিক সারছেন, এমন সময় জলের বুক চিরে ছোট্ট একটি সোনা-রঙা মাছ ভেসে উঠল। অতি করুণ সুরে সে ডেকে বলল, 'মহাত্মন, আমি বড় অসহায়, নিতান্তই এক ক্ষুদ্র মৎ...

৪২তম বনপর্ব- মৃত্যুর ওপারে মহাজীবন: দেবী সরস্বতীর মুখে ব্রহ্মজ্ঞানের গূঢ় ইশারা

Image
৪২তম বনপর্ব- মৃত্যুর ওপারে মহাজীবন: দেবী সরস্বতীর মুখে ব্রহ্মজ্ঞানের গূঢ় ইশারা পাণ্ডবদের চোখের সামনে তখন আদিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যের নিস্তব্ধতা। যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন মনের গভীরে কোনো এক অলৌকিক সুরের সন্ধান করছেন। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মহাত্মা মার্কণ্ডেয়ের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। অর্জুন আর ভীমও এসে বসলেন পাশে। যুধিষ্ঠির বললেন, "মুনিবর, মানুষের জীবন তো কেবল যুদ্ধ আর জয়-পরাজয়ের বৃত্তে বাঁধা নয়। আমরা শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের সেই অলৌকিক মহিমা শুনতে চাই, যা মানুষকে মাটির পৃথিবী থেকে এক লহমায় ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। কৃপা করে সেই কথা আমাদের বলুন।" ঋষি মার্কণ্ডেয়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন। এক রাজপুত্রের ভুল এবং এক আশ্চর্য বেঁচে থাকা হৈহয় বংশের এক রাজকুমার ছিলেন— পুরপুরঞ্জয়। রূপের তো আদি-অন্ত নেই, যেন দেবরাজ ইন্দ্রের কোনো তরুণ সংস্করণ। একদিন তিনি গভীর বনে শিকারে গেলেন। ঘন ঘাস আর লতাগুল্মে ঢাকা সেই অরণ্যে আলো-ছায়ার খেলা চলছিল। হঠাৎ এক ঝোপের আড়ালে রাজকুমার দেখলেন একটি কৃষ্ণসার মৃগ। ধনুকে তীর জুড়ে লক্ষ্যভেদ করলেন তিনি। কিন্তু কাছে গিয়...

৪১তম বনপর্ব-কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য

Image
৪১তম বনপর্ব- কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য সরস্বতী নদীর তীরে তখন হেমন্তের মৃদু হাওয়া। কার্তিকী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে আকাশ জুড়ে এক মায়াবী আলোর উৎসব চলিতেছিল। নদীর পবিত্র স্রোতে স্নান সারিয়া, বহু সাধু-তপস্বীর সান্নিধ্যে পাণ্ডব ভ্রাতারা তাঁহাদের নিত্যকর্ম সমাপন করিলেন। কিন্তু নিয়তির চাকা তো এক স্থানে স্থির থাকে না। কৃষ্ণপক্ষ আরম্ভ হইতেই ধৌম্য মুনিকে অগ্রবর্তী করিয়া, অনুচর ও সারথি সহ তাঁহারা পাণ্ডবদের চিরপরিচিত আশ্রয়ের মায়া ত্যাগ করিলেন। গন্তব্য— নিবিড় ও রহস্যময় কাম্যক বন। বনভূমির প্রবেশদ্বারে মুনি-ঋষিরা তাঁহাদিগকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইলেন। দ্রৌপদীকে সঙ্গে লইয়া পঞ্চপাণ্ডব আবার এক নতুন প্রবাস জীবনের পটভূমি রচনা করিলেন। অরণ্যের দিনগুলি কাটিতেছিল এক বুক চাপা প্রতীক্ষায়। একদিন অর্জুনের পরম সুহৃদ এক ব্রাহ্মণ আশ্রমে আসিয়া এক আনন্দের সংবাদ বহন করিয়া আনিলেন। তিনি কহিলেন, "হে ধর্মরাজ, আপনার প্রিয় সখা, মহাবাহু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অতি শীঘ্রই এই বনভূমিতে পদার্পণ করিবেন। পাণ্ডবেরা কাম্যক বনে আসিয়াছেন শুনিয়া তাঁহার চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। তিনি সর্বদা আপনাদের কুশল চিন্তায় মগ্ন থাকেন। আ...

৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র প্রদর্শণ

Image
৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র  প্রদর্শণ ফিরে আসার পথটা ছিল অদ্ভুত রকমের নির্জন। মেঘেদের ওপর দিয়ে যখন রথ ছুটে যাচ্ছিল, হঠাতই চোখে পড়ল সেই মায়াপুরী। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! যেন মহাকাশের বুকে ভাসমান এক টুকরো তপ্ত কাঞ্চন, যার নিজস্ব এক অলৌকিক জ্যোতি রয়েছে। অগ্নি আর সূর্যের মিলিত আভায় ঝলমল করছে চারদিক। সবচেয়ে বড় কথা, সেই নগরী স্থির নয়; সে যেন এক জীবন্ত যান, যেখানে ইচ্ছা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি কৌতূহলী হয়ে সারথি মাতলিকে জিজ্ঞেস করলাম, "মাতলি, কার এই বিচিত্র পুরী? কার এত ক্ষমতা যে আকাশের বুকে এমন বৈভব বিস্তার করে বাস করে?" মাতলি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসির গভীরে ছিল এক প্রাচীন বিষাদ ও বিস্ময়। তিনি বললেন, "অর্জুন, এ বড় দুর্ভেদ্য ইতিহাস। সৃষ্টির আদিকালে পুলোমা আর কালিকা নামে দুই দানবী ছিল। তারা কঠোর, অতি কঠোর তপস্যায় মগ্ন হয়েছিল দীর্ঘ সহস্র বছর। তাদের সেই তিতিক্ষায় স্বয়ং পিতামহ ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে যখন বর দিতে চাইলেন, দানবীরা কোনো ঐশ্বর্য চায়নি, চেয়েছিল মাতৃত্বের চরম নিরাপত্তা। তারা বলেছিল, তাদের সন্তানদের যেন কোনো ব্যাধি বা শোক স্প...

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

Image
  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata)  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)  সংক্ষিপ্ত   মহাভারতের বিষয়সূচি-প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata)  ৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয় ৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি ৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প ৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ ৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব ৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার ৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন ৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন: পাশুপত অস্ত্রলাভের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান ৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ ৪০তম বন পর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র  ৪১তম বনপর্ব- কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য ৪২তম বনপর্ব- মৃত্যুর ওপারে মহাজীবন: দেবী সরস্বতীর মুখে ব্রহ্মজ্ঞানের গূঢ় ইশারা ৪...

৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ

Image
৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ কীরকম ছিল সেই অভিজ্ঞতা? অর্জুন যখন যুধিষ্ঠিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে তখনো স্বর্গের সেই আশ্চর্য আলোর রেশ লেগে আছে। কিন্তু গলার স্বর অতি শান্ত। ঠিক যেভাবে একজন পরিব্রাজক তাঁর দীর্ঘ ভ্রমণের গল্প শোনান, অর্জুনও সেভাবেই শুরু করলেন। "মহারাজ, শুনুন তবে। আমাদের এই মাটির পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যখন দেবরাজের রথ এসে দাঁড়াল, আমার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। মাতলি এলেন ইন্দ্রের সেই দিব্য রথ নিয়ে। অশ্বদের গা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক মায়াবী আলো। আমি আরোহণ করার আগে হিমালয় পর্বতকে মনে মনে প্রণাম জানালাম, চেয়ে নিলাম বিদায়ের অনুমতি। তারপর রথ ছুটল। বাতাস আর মন— এই দুইয়ের গতিকে হার মানিয়ে যখন রথ ছুটে চলেছে মহাশূন্যের বুক চিরে, মাতলি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে খেলা করে গেল মৃদু বিস্ময়। বললেন, 'ভারী অদ্ভুত তো! দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং যখন এই রথে বসেন, তাঁর আসনও মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। আর তুমি এমন স্থির, যেন কোনো এক অচেনা পাথরের মূর্তি! হে অর্জুন, তোমার এই মানসিক স্থৈর্য দেবরাজকেও টেক্কা দিতে পারে।' আমি হাসলাম। মাতলি আমাকে একে ...

৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন

Image
  ৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন: পাশুপত অস্ত্রলাভের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান দেবরাজ ইন্দ্রের সেই দীপ্তিময় সুবর্ণ রথ যখন গন্ধমাদন পর্বতের সেই নির্জন, তুষারশুভ্র শিখরে এসে থামল, তখন চারপাশ যেন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় ভরে গেল। মহাবীর অর্জুন রথ থেকে অবতীর্ণ হলেন— সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য, যেন নীল মেঘের কোল চিরে এক ঝলক তীব্র বিদ্যুৎ নেমে এল ধরিত্রীর বুকে। তাঁর অবয়বে দেবলোকের অমিত তেজ, চোখে জয়ের প্রশান্তি। ভূমিতে পা রেখেই তিনি প্রথম প্রণতি জানালেন কুলপুরোহিত ধৌম্যকে। তারপর পরম ভক্তিতে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহারাজ যুধিষ্ঠির এবং মহাবলী ভীমসেনের চরণ স্পর্শ করলেন। নকুল ও সহদেব পরম সমাদরে এগিয়ে এসে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে অভিবাদন জানালেন। প্রিয়তমা কৃষ্ণার সঙ্গে সেই বহুপ্রতীক্ষিত ক্ষণিক নীরব সাক্ষাতের পর, অর্জুন অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে জ্যেষ্ঠতাত যুধিষ্ঠিরের পাশে এসে দাঁড়ালেন, যেন সেই মহাশক্তিশালী বীর এক পরম বাধ্য অনুজ মাত্র। অতুলনীয় প্রভাবশালী ও দেবতাপ্রতিম অর্জুনকে সুদীর্ঘকাল পর অক্ষত শরীরে ফিরে পেয়ে পাণ্ডবদের হৃদয় আনন্দের উদ্বেল তরঙ্গে উপচে পড়ল। অর্জুনও তাঁর প্রিয় ভ্রাতাদের ও কৃষ্ণাকে দেখে...