বীর কৃতবর্মার এক অসমাপ্ত কাহিনি
বীর কৃতবর্মার এক অসমাপ্ত কাহিনি-
মহাভারতের মাঠে অনেক নাম আছে, যারা যুদ্ধ জিতেও ইতিহাসে হেরে যায়। কৃতবর্মা তেমনই একজন। তার নাম শুনলে প্রথমে মনে পড়ে না কোনো বীরত্বের কথা, মনে পড়ে একটা অন্ধকার রাতের কথা। অথচ এই মানুষটার জীবনটা শুরু হয়েছিল অন্যভাবে—একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে, একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে। তারপর কীভাবে সময় আর পরিস্থিতি একজন মানুষকে টেনে নিয়ে যায় এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না—কৃতবর্মার গল্পটা আসলে সেই কথাই বলে।
কৃতবর্মা ছিলেন হৃদিকের ছেলে, যাদববংশের ভোজ শাখার মানুষ। যাদবকুলে তখন কৃষ্ণের প্রভাব সীমাহীন, আর সেই কুলেরই একজন সেনাপতি ছিলেন কৃতবর্মা। যুদ্ধ যখন আসন্ন হয়ে উঠল কুরু আর পাণ্ডবদের মধ্যে, তখন এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিতে হলো কৃষ্ণকে—নিজে অস্ত্র ধরবেন না বলে তিনি পাণ্ডবদের পাশে দাঁড়ালেন সারথি হয়ে, আর তাঁর বিশাল নারায়ণী সেনা পাঠিয়ে দিলেন দুর্যোধনের কাছে। সেই সেনার নেতৃত্বে ছিলেন কৃতবর্মা। এভাবেই এক আশ্চর্য পরিহাসে, কৃষ্ণের নিজের বাহিনী যুদ্ধ করল কৃষ্ণেরই বিপক্ষে।
যুদ্ধের মাঠে কৃতবর্মা কোনো সাধারণ যোদ্ধা ছিলেন না। কৌরবপক্ষের হয়ে তিনি লড়েছিলেন প্রবল বিক্রমে, বহু পাণ্ডব যোদ্ধার সাথে তাঁর সংঘাত হয়েছিল, আর যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন—যা নিজেই একটা বিরল ব্যাপার, কারণ কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিনের এই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞে বেশিরভাগ বড় নামই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়টা এল যুদ্ধের একেবারে শেষে। দুর্যোধন যখন প্রায় মৃত্যুশয্যায়, তখন অশ্বত্থামা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছেন। সেই রাতে অশ্বত্থামার সঙ্গী হলেন মাত্র দুজন—কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা। তিনজন মিলে রাতের অন্ধকারে ঢুকে পড়লেন পাণ্ডব শিবিরে, যেখানে ঘুমিয়ে ছিল দ্রৌপদীর পাঁচ ছেলে আর অসংখ্য নিরস্ত্র সৈনিক। সেই রাতে যা ঘটেছিল, তাকে যুদ্ধ বলা যায় না—তা ছিল নিছক হত্যাকাণ্ড। ঘুমন্ত মানুষদের গলা কাটা হয়েছিল অন্ধকারে, কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়ে।
এই কাজে কৃতবর্মা ঠিক কতটা জড়িত ছিলেন, তা নিয়ে মহাভারতেও একটা অস্পষ্টতা আছে—কেউ বলে তিনি শিবিরের বাইরে পাহারায় ছিলেন, কেউ বলে তিনিও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, তিনি সেই রাতে অশ্বত্থামার পাশে ছিলেন, আর সেই পাপের ছায়া থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেননি। মানুষ যখন একবার এমন কোনো রাতের সাক্ষী হয়ে যায়, সেই রাতের গন্ধ তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়।
যুদ্ধ শেষ হলো। কৃতবর্মা বেঁচে রইলেন, ফিরে গেলেন নিজের রাজ্যে। কিন্তু যে পাপ একবার শরীরে লেগে যায়, সময় তাকে শুধু চাপা দিতে পারে, মুছে দিতে পারে না। বছরের পর বছর কেটে গেল—কুরুক্ষেত্রের ধুলো উড়ে গেল বাতাসে, কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি রয়ে গেল মানুষের মনে।
তারপর এল সেই দিন, যেদিন কৃতবর্মার পুরনো পাপ তাঁকে খুঁজে বের করল। যুদ্ধের ছত্রিশ বছর পর, প্রভাস তীর্থে যাদবরা জড়ো হয়েছিল এক উৎসবে। মদ্যপান চলছিল, আর মদ মানুষের মুখ থেকে সেইসব কথা বের করে আনে, যা শান্ত সময়ে সে কখনো বলত না। সেখানেই সাত্যকি তুলে আনলেন সেই পুরনো রাতের প্রসঙ্গ—ঘুমন্ত মানুষ হত্যার সেই লজ্জাজনক কাহিনি। কৃতবর্মাকে তিনি সরাসরি কাপুরুষ বলে অভিহিত করলেন, বললেন এমন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া কোনো ক্ষত্রিয়ের কাজ হতে পারে না।
বি:দ্র: সাত্যকির কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন
কৃতবর্মা চুপ করে থাকেননি। তিনিও পাল্টা তুলে আনলেন সাত্যকির নিজের পুরনো পাপ—নিরস্ত্র, ধ্যানমগ্ন ভূরিশ্রবাকে হত্যার কাহিনি। দুজনের মধ্যে সেই পুরনো ক্ষত আবার খুলে গেল, আর মদের নেশায়, অপমানের আগুনে দুজনেই ভুলে গেলেন যে তাঁরা একই বংশের মানুষ, একই সভায় বসে আছেন। ক্রোধের মাথায় সাত্যকি তরবারি তুলে কৃতবর্মাকে হত্যা করলেন সেখানেই।
এই একটা হত্যাই যথেষ্ট হলো গোটা যাদববংশকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য। কৃতবর্মার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর সমর্থকরা সাত্যকির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর তারপর যা ঘটল তা ইতিহাসের অন্যতম করুণ দৃশ্য—নিজেদের মধ্যেই অস্ত্র তুলে নিল যাদবরা, ভাই মারল ভাইকে, বন্ধু মারল বন্ধুকে। এক সন্ধ্যায় শেষ হয়ে গেল সেই বংশ, যাকে রক্ষা করতে কৃষ্ণ নিজে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
কৃতবর্মার গল্পটা তাই শুধু একজন যোদ্ধার গল্প নয়। এটা এমন এক মানুষের গল্প, যে একবার অন্ধকারের পথে পা বাড়িয়েছিল, আর সেই পথ তাকে বছরের পর বছর পরেও ছাড়েনি। মহাভারত আমাদের বারবার এই সত্যটাই মনে করিয়ে দেয়—তলোয়ার দিয়ে করা কোনো পাপ কখনো সময়ের সাথে মুছে যায় না। সে অপেক্ষা করে, নীরবে, আর ঠিক সময়মতো ফিরে আসে তার মূল্য চাইতে।

Comments
Post a Comment