সাত্যকি ও ভূরিশ্রবার এক অগ্নিশিখার গল্প

 


সাত্যকি ও ভূরিশ্রবার এক অগ্নিশিখার গল্প

কুরুক্ষেত্রের মাঠে তখন ধুলো উড়ছে হাজার রথের চাকায়। বিকেলের আলো এসে পড়েছে রক্তমাখা শমিগাছের পাতায়, আর সেই আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য গল্প। মহাভারত এমনই এক মহাসমুদ্র, যেখানে বড় বড় নামও কোথাও হারিয়ে যায়। তবু কিছু মানুষ থাকে, যাদের গল্প সহজে মুছে যায় না। বৃষ্ণিবংশের যুযূধান—আমরা যাকে চিনি সাত্যকি নামে—তেমনই একজন। তার গল্পটা বলতে বসলে মনে হয়, এ যেন কোনো এক অস্থির, জেদি ছেলের গল্প, যে ভালোবাসতে জানত প্রবলভাবে, আর সেই ভালোবাসার টানেই একদিন হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে।

সাত্যকির বাবা সত্যক, ঠাকুরদা শিনি—তাই তার আরেক নাম শিনেয়। কিন্তু নাম দিয়ে তো আর মানুষ চেনা যায় না। মানুষ চেনা যায় তার ভালোবাসা দিয়ে, তার সাহস দিয়ে। ধনুর্বিদ্যা সে শিখেছিল অর্জুনের কাছে, আর গুরুর প্রতি তার যে টান, সেটা প্রশ্ন তোলার মতো নয়। কৃষ্ণের প্রতিও তার একটা অদ্ভুত মায়া ছিল—প্রায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মতো মায়া।

যুদ্ধ যখন অনিবার্য হয়ে উঠল, তখন যাদবদের বেশিরভাগই চলে গেল দুর্যোধনের দিকে। রাজনীতি, স্বার্থ, হিসেব-নিকেশ—এসব সাত্যকির মাথায় কখনো জায়গা পায়নি। কৃষ্ণ যেদিকে, সাত্যকিও সেদিকে। এত মানুষ যখন অন্য পথ ধরল, তখন সাত্যকি একা হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল পাণ্ডবদের পাশে। কারণ একটাই—কৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসা, আর ধর্মের প্রতি এক নিঃশর্ত বিশ্বাস।

তারপর এল যুদ্ধের চোদ্দতম দিন। আগের রাতে অভিমন্যুকে যেভাবে মারা হয়েছে, তাতে সারা পাণ্ডবশিবির যেন এক নিঃশব্দ কান্নায় ডুবে আছে। অর্জুন প্রতিজ্ঞা করেছেন—আজ সূর্য ডোবার আগে জয়দ্রথকে মারবেনই, নাহলে নিজেই আগুনে ঝাঁপ দেবেন। অর্জুন যখন শত্রুর ব্যূহের গভীরে ঢুকে গেলেন, যুধিষ্ঠির তখন অস্থির, উদ্বিগ্ন। শেষে ডাকলেন সাত্যকিকে—"সাত্যকি, তুমি যাও। অর্জুনকে রক্ষা করো।"

বি:দ্র: জয়দ্রথের কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন 

সেদিন কুরুক্ষেত্রের মাটিতে সাত্যকি যা করেছিল, তা কেবল যুদ্ধ নয়, তা যেন এক পাগলামি, এক অন্ধ ভালোবাসার প্রকাশ। একের পর এক সে মুখোমুখি হলো দ্রোণাচার্য, কর্ণ, কৃতবর্মা, অলম্বুষের। শরীর তখন ক্লান্ত, রক্তে ভেজা—তবু থামেনি। এক বীরকে ঠেলে সরিয়ে আরেক বীরের দিকে এগিয়ে যাওয়াই যেন তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গুরুর জন্য একজন মানুষ ঠিক কতটা উন্মাদ হতে পারে, কুরুক্ষেত্র বোধহয় সেদিনই প্রথম দেখল।

কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে অন্ধকার মোড়টা এল এরপরই। সেই একই দিনে, কৌরব শিবিরের প্রবীণ যোদ্ধা ভূরিশ্রবার সঙ্গে সাত্যকির লড়াই বেধে গেল। দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত সাত্যকিকে মাটিতে ফেলে ভূরিশ্রবা যখন তরবারি তুলেছে, ঠিক তখন কৃষ্ণের নির্দেশে দূর থেকে অর্জুনের একটা বাণ এসে কেটে ফেলল ভূরিশ্রবার হাত।

অস্ত্র হারিয়ে, অন্যায়ভাবে আহত হয়ে ভূরিশ্রবা তখন যুদ্ধ ছেড়ে দিল। মাটিতে বসে চোখ বুজে ধ্যানে ডুবে গেল, মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করল এক সন্ন্যাসীর মতো শান্তভাবে। আর ঠিক তখনই, অপমানের আগুনে অন্ধ হয়ে সাত্যকি তরবারি চালিয়ে দিল। এক কোপে নেমে গেল ভূরিশ্রবার মাথা।

চারদিকে হাহাকার উঠল। কৌরবশিবির ধিক্কার দিল, কৃষ্ণ আর পাণ্ডবরাও স্তব্ধ হয়ে গেলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু সাত্যকির চোখে তখন অন্য কিছু ছিল—অপমানের রক্তচক্ষু, আর প্রতিশোধের এক অন্ধ তৃপ্তি। এই মুহূর্তে সাত্যকি আর কোনো অজেয় বীর নয়, সে নিতান্তই এক মানুষ—যে ভালোবাসতে জানে গভীরভাবে, কিন্তু অপমান সহ্য করতে জানে না, আর ক্রোধের মুখে নিজের বিবেককেও এক নিমেষে পুড়িয়ে ফেলতে পারে।

যুদ্ধ শেষ হলো। সাত্যকি বেঁচে রইল। কিন্তু যে তরবারি একবার রক্তের স্বাদ পেয়ে যায়, সে বোধহয় আর কোনোদিন শান্ত হয় না। যুদ্ধের ছত্রিশ বছর পর, প্রভাস তীর্থে এক মদ্যপ সন্ধ্যায় সেই পুরনো ক্ষত আবার জেগে উঠল। কৃতবর্মার সঙ্গে কথা কাটাকাটির মধ্যে সেই রাতের পুরনো প্রসঙ্গ উঠতেই সাত্যকি আবার সেই একই আগুনে জ্বলে উঠল, আর নিজের হাতে হত্যা করল কৃতবর্মাকে। সেখান থেকেই শুরু হলো যাদবদের নিজেদের মধ্যে সেই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ, যাতে শেষ পর্যন্ত নিজের বংশের হাতেই প্রাণ হারাল কুরুক্ষেত্রের সেই অপরাজেয় যোদ্ধা।

মহাভারতের পাতায় সাত্যকি কোনো দেবতা নয়, কোনো নিখুঁত আদর্শও নয়। সে শুধু একজন মানুষ, যে ভালোবেসেছিল প্রাণ দিয়ে, লড়েছিল পাগলের মতো, ভুল করেছিল, আর সেই ভুলের দাম চুকিয়েছিল নিজের রক্ত দিয়ে। আর হয়তো এখানেই মহাভারতের আসল সৌন্দর্য—এই মহাকাব্য কাউকে দেবতা বানায় না, সবাইকে মানুষ করে রাখে, দোষে-গুণে, ভালোবাসায়-ভুলে।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)