সঞ্জয় সংবাদ: অন্ধকারের বুক চিরে একজোড়া চোখ:
সঞ্জয় সংবাদ: অন্ধকারের বুক চিরে একজোড়া চোখ:
মহাভারতের সেই বিপুল আসরে কত শতেক প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, আবার মুহূর্তেই নিভে গিয়ে মিশে গেল অন্ধকারে। কিন্তু আঠারোটা দিন ধরে একটি মানুষ বেঁচে রইলেন কেবল অন্য একজনের চোখ হয়ে। তাঁর নাম সঞ্জয়।
সূতের ঘরে জন্ম—যাঁদের নিয়তি নির্ধারিত ছিল রথের চাবুক ধরায় আর রাজসভার ইতিবৃত্ত রচনায়। মাথার ওপর কোনো রত্নখচিত রাজমুকুট ছিল না, শরীরে ছিল না কোনো অমরাবতীর দৈব তেজ। তিনি ছিলেন নিতান্তই এক রক্তমাংসের অতি-সাধারণ মানুষ। কিন্তু হস্তিনাপুরের অলিন্দে বিদুরের মতো প্রাজ্ঞ পুরুষের সাহচর্যে কাটাতে কাটাতে সেই সাধারণ মানুষটির ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক আশ্চর্য স্থিরতা। শান্ত, গভীর এবং নীতিতে যিনি একদম অটল। তাঁর বাক্যে কোনো পক্ষপাত ছিল না, কোনো চাটুকারিতা ছিল না।
বি:দ্র: বিদুরের জন্ম কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন
আর ঠিক এই অমোঘ নিরপেক্ষতার জন্যই অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র সব হারিয়েও সবচেয়ে বেশি ভরসা করতেন এই সূতপুত্রটিকে।
কুরুক্ষেত্রের সেই ভয়াল দামামা বাজার ঠিক আগের মুহূর্তটার কথা ভাবা যাক। ধৃতরাষ্ট্র তখন এক সংশয়ী পিতা, ভেতরে ভেতরে কাঁপছেন। তিনি সঞ্জয়কে পাঠালেন পাণ্ডবদের শিবিরে—এক টুকরো শান্তির বার্তা হাতে নিয়ে। পাণ্ডবদের সামনে, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সঞ্জয় অনুচ্চ কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বললেন, "রাজা চান যুদ্ধ এড়াতে, চান আলোচনার পথ।" কিন্তু পাণ্ডবরা ততদিনে জেনে গেছেন অন্যায়ের শিকড় কত গভীরে। তাঁরা জানিয়ে দিলেন, ন্যায়ের দাবি ছেড়ে এই আপস সম্ভব নয়। সঞ্জয় রাজনীতির প্রখর বাস্তবতায় বুঝে গিয়েছিলেন—যুদ্ধ এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবু তিনি এক অবিচল দূতের মতো ফিরে এলেন হস্তিনাপুরে, রাজাকে শোনালেন হুবহু যা তিনি দেখেছেন ও শুনেছেন; এতটুকু রং না চড়িয়ে, কোনো পক্ষপাত না করে।
তারপর এলো সেই চরম মুহূর্ত। যুদ্ধ শুরু হবে, অমনি মহর্ষি ব্যাসদেব এসে দাঁড়ালেন ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। বললেন, "তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দিই রাজন, নিজের চোখে দেখো কুরুক্ষেত্রের রক্তগঙ্গা।" অন্ধ রাজা শিউরে উঠে পিছিয়ে গেলেন। যে চোখ সারাজীবন কেবল নিরেট অন্ধকারের সঙ্গে ঘর করেছে, সে চোখের পক্ষে নিজের কুলক্ষয় দেখার স্পর্ধা ছিল না। ব্যাসদেব তখন সেই মহাজাগতিক অলৌকিক দৃষ্টি উপহার দিলেন সঞ্জয়কে। হস্তিনাপুরের এক নিভৃত, আলো-আঁধারি কামরায় বসে সঞ্জয় দেখতে লাগলেন বহু দূরের সেই রক্তঝরা প্রান্তর—অস্ত্রের কর্কশ শব্দ, কাঁচা রক্তের গন্ধ, আর একের পর এক মহাবীরের পতন।
সঞ্জয়ের আসল যন্ত্রণাটা কিন্তু ওই দিব্যদৃষ্টির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল। একদিকে একজন সংবেদনশীল মানুষের কাঁচের মতো হৃদয়, আর অন্যদিকে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক সর্বদর্শী অলৌকিক দৃষ্টিশক্তি। সঞ্জয় দেখছেন পার্থের ধনুকের ছিলা কাঁপছে, দেখছেন বাসুদেবের সেই রূপ যা দেখে চরাচর থরথর করে কাঁপে—আর দেখতে দেখতে সঞ্জয়ের নিজের বুকটাও করুণায় খাঁ খাঁ করে উঠছে। অথচ পরমুহূর্তেই সেই নির্মম, রূঢ় সত্যিটা তাঁকে পৌঁছে দিতে হচ্ছে অন্ধ রাজার কানে। কোনো সহানুভূতি না মিশিয়ে, কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা না দিয়ে। ধৃতরাষ্ট্রকে তিনি মুখের ওপর কটু সত্য শুনিয়েছেন বারবার—"রাজন, নিজের অন্ধ লোভে আপনি নিজেই নিজের বংশ ধ্বংস করলেন।" কিন্তু যে রাজা চোখে দেখেন না, তিনি কি আর জ্ঞানের কথা কানে তোলেন?
আঠারো দিন পর যুদ্ধ শেষ হলো। সমস্ত আসর জুড়ে তখন কেবল শ্মশানের এক নিচ্ছিদ্র নীরবতা। তবু সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে ফেলে রেখে কোথাও চলে যাননি। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ছেড়ে বৃদ্ধ, নিঃস্ব ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারী যখন বনবাসে পা বাড়ালেন, সঞ্জয় ছায়ার মতো তাঁদের পিছু পিছু হাঁটলেন। শেষ পর্যন্ত বনে আগুন লাগলো, দাবানলে ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারীর শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেল; কিন্তু সঞ্জয় তখনও বেঁচে রইলেন। পরমায়ুর এ এক অদ্ভুত অভিশাপ! তারপর এক নিঃসঙ্গ, একাকী পথিকের মতো তিনি নিঃশব্দে হেঁটে চললেন হিমালয়ের মহাপ্রস্থানের দিকে।
মহাভারতের মহাকাব্যিক পরিসরে সঞ্জয় কোনো অধীশ্বর নন, কোনো রথী-মহারথীও নন। তিনি এক নিস্পৃহ, নিষ্পাপ আয়না। যাঁর নিজের কোনো যুদ্ধ ছিল না, অথচ আঠারো দিনের এক মহাবিনাশের পুরো অন্ধকারটাই আছড়ে পড়েছিল তাঁর একার কাঁধে।

Comments
Post a Comment