চেদিরাজ ধৃষ্টকেতুর গল্প :রক্তে লেখা এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা-


চেদিরাজ ধৃষ্টকেতুর গল্প :রক্তে লেখা এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা- 


মহাভারতের বিশাল আসরে কিছু মানুষ থাকে, যারা প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠে, সবার নজর কাড়ে। আর কিছু মানুষ থাকে ধূপের মতো—নিঃশব্দে নিজেকে পুড়িয়ে দিয়ে চারপাশটা সুরভিত করে যায়, অথচ কেউ তেমন খেয়ালই করে না। চেদিদেশের রাজকুমার, শিশুপালের ছেলে ধৃষ্টকেতু ছিলেন ঠিক তেমনই একজন।

শিশুপালকে যেদিন রাজসূয় যজ্ঞের মাঝখানে কৃষ্ণ নিজের চক্র দিয়ে মাথা কেটে ফেলেছিলেন, সেদিন চেদিরাজ্যের আকাশ মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। 

বি:দ্র: শিশুপাল বধ,রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্ঘ্য ও চেদিরাজের অহংকারের করুণ পরিণতি জানতে এখানে ক্লিক করুন 

বাবার মৃত্যু, সেও আবার এমনভাবে—কিন্তু অদ্ভুত এই জগতের নিয়ম। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তরুণ ধৃষ্টকেতুর মনে কিন্তু প্রতিশোধের কোনো আগুন জ্বলেনি। তিনি ভাবেননি, কৃষ্ণকে হারাব, বা পাণ্ডবদের সঙ্গে থেকে বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। তিনি শুধু একটা কথাই বুঝেছিলেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধর্মের পক্ষে দাঁড়ানো। তাই কৌরবদের বিশাল সেনাবাহিনী, তাদের হাজারো প্রলোভন সব দূরে সরিয়ে রেখে তিনি নিজের এক  অক্ষৌহিণী সেনা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন পাণ্ডবদের পাশে। পাণ্ডবদের সাতজন প্রধান সেনাপতির একজন হিসেবে সম্মান পেলেন এই চেদিরাজ।

কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিন—প্রতিটা সূর্যাস্ত যেন রক্তের নদীতে ডুবে যেত। প্রথম দিন থেকেই ধৃষ্টকেতু দেখিয়েছিলেন তাঁর অসামান্য যুদ্ধকৌশল। দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, শল্য—এমন সব মহারথীর সামনে দাঁড়িয়েও তিনি একবারও পিছু হটেননি। দ্রোণের বাণে যখন পাণ্ডবসেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত, তখন ধৃষ্টকেতু রথ ছুটিয়ে এসে দাঁড়াতেন সামনে, যেন কোনো এক অটল প্রাচীর। তাঁর ধনুকের শব্দে বারবার কেঁপে উঠত কৌরবদের সাজানো ব্যূহ।

কিন্তু কুরুক্ষেত্র তো শুধু বীরত্বের গল্প বলে না, এ এক নির্মম নিয়তির খেলাও বটে। যুদ্ধের চোদ্দ নম্বর দিনে, জয়দ্রথ বধের সেই ভয়ংকর দিনে, ধুলো আর রক্তের মধ্যে দিয়ে ধৃষ্টকেতু এগিয়ে গেলেন সোজা দ্রোণাচার্যের দিকে। একদিকে তরুণ এক রথী, অন্যদিকে অভিজ্ঞ, প্রায় পিতামহের মতো দ্রোণ। ধৃষ্টকেতু জানতেন, এই লড়াইয়ের পরিণতি কী হতে পারে। তবু তাঁর চোখে কোনো ভয় ছিল না—ছিল শুধু নিজের সম্মান আর বন্ধুত্বের প্রতি অবিচল আনুগত্য।

ধনুকের ছিলা টানার শব্দ, চারদিকে বাণের অন্ধকার—কিছুক্ষণের মধ্যেই চেদিরাজের রথ ভেসে গেল রক্তে। যুদ্ধকৌশলে দ্রোণকে হারানো অসম্ভব ছিল না, কিন্তু সেদিন নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। দ্রোণাচার্যের একটা তীক্ষ্ণ বাণে বিদ্ধ হয়ে রথ থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ধৃষ্টকেতু।

একজন বীরের জীবন নিভে গেল, কোনো শব্দ না করেই। কুরুক্ষেত্রের মাটিতে তিনি রেখে গেলেন এক আশ্চর্য দৃষ্টান্ত—যেখানে বাবার মৃত্যুর ইতিহাস, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, কোনোকিছুই বড় হয়ে ওঠেনি। বড় হয়ে উঠেছিল শুধু একটাই কথা—সত্যের পক্ষে, ধর্মের পক্ষে নিজের জীবনটা বিলিয়ে দেওয়া। ইতিহাসের পাতায় চেদিরাজ ধৃষ্টকেতুর নাম হয়তো খুব বেশি জায়গা পায়নি, কিন্তু তাঁর রক্তে লেখা থেকে গেছে এক সত্যিকারের বীরের গল্প—যে গল্প কোনোদিন জোরে বলা হয় না, কিন্তু চিরকাল মনে থেকে যায়।

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)