শিশুপাল বধ,রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্ঘ্য ও চেদিরাজের অহংকারের করুণ পরিণতি

 


শিশুপাল বধ,রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্ঘ্য ও চেদিরাজের অহংকারের করুণ পরিণতি

রাজা যুধিষ্ঠিরের মহান রাজসূয় যজ্ঞ তখন তার গৌরবময় সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেক দিন ধরে অবিরাম চলেছে পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান। ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্ত থেকে এসেছেন মহর্ষিরা, পরাক্রমশালী রাজারা, বিদ্বান ব্রাহ্মণেরা, বীর যোদ্ধারা এবং অভিজাত অতিথিরা। ইন্দ্রপ্রস্থের বিশাল সভাগৃহে যেন এক অপূর্ব সমাবেশ বসেছে।

যজ্ঞের আগুন জ্বলছে উজ্জ্বল হয়ে। বেদমন্ত্রের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। চন্দন, ধূপ ও পবিত্র হব্যের সুবাসে ভরে উঠেছে বাতাস। সর্বত্র আনন্দ, সম্মান আর ঐশ্বর্যের ছোঁয়া।

যারা একদিন পাণ্ডবদের বিরোধিতা করেছিলেন, সেই রাজারাও আজ শান্তভাবে পাশাপাশি বসেছেন। ব্রাহ্মণেরা উপযুক্ত দক্ষিণা ও আতিথ্যে তুষ্ট। ইন্দ্রপ্রস্থের প্রজারা এই অভূতপূর্ব অনুষ্ঠান দেখে আনন্দে উৎফুল্ল। সকলেই স্বীকার করছেন, পৃথিবীতে এমন গৌরবময় রাজসূয় যজ্ঞ আর কখনো হয়নি।

অবশেষে যখন শেষ আচার সম্পন্ন হল, তখন বৃদ্ধেরা ও পুরোহিতেরা রাজসভায় সমবেত হলেন। সেই সময় কুরুকুলের প্রবীণতম পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করে বললেন,

“বৎস, তোমার রাজসূয় যজ্ঞ সুসম্পন্ন হয়েছে। অনেক মহান রাজা, ঋষি, ব্রাহ্মণ ও বীর এই যজ্ঞকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রাচীন রীতি অনুসারে, এখন সমবেত সকলের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, তাঁকেই প্রথমে অর্ঘ্য ও সম্মান প্রদান করা উচিত।”

যুধিষ্ঠির করজোড়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন,  

“পিতামহ, এমন সিদ্ধান্ত আমি কী করে করব? এখানে রয়েছেন অসংখ্য রাজা, পরাক্রান্ত যোদ্ধা, শ্রদ্ধেয় ব্রাহ্মণ ও মহর্ষি। প্রত্যেকেই সম্মানের যোগ্য। বলুন, কাকে প্রথমে পূজা করব?”

ভীষ্ম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তাঁর দৃষ্টি ধীরে ধীরে সমগ্র সভার উপর ঘুরে বেড়াল। অবশেষে তা স্থির হল যাদবশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের উপর, যিনি যাদবদের মাঝে বসে ছিলেন—যেন তারাগণের মাঝে চন্দ্র।

ভীষ্ম মৃদু হেসে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন,  

“আমার বিচারে এই সভায় কৃষ্ণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। জ্ঞানে, বলে, ধর্মে, বীরত্বে, করুণায় ও দৈবী মহিমায় তিনি সকলের উর্ধ্বে। যেমন সূর্য সমস্ত আলোকের উপরে জ্বলে, তেমনি কৃষ্ণ সমস্ত রাজা ও বীরের উপরে জ্বলছেন। অতএব হে যুধিষ্ঠির, তুমি প্রথমে কৃষ্ণকেই পূজা করো।”

ভীষ্মের কথা শোনামাত্র অনেক রাজাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। পাণ্ডবদের মনে আনন্দের স্রোত বয়ে গেল। ঋষিরা ভীষ্মের প্রজ্ঞার প্রশংসা করলেন।

যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। করজোড়ে তিনি কৃষ্ণের কাছে এগিয়ে গেলেন—সঙ্গে সোনার পাত্রে পবিত্র জল, চন্দন, পুষ্প, রেশমবস্ত্র, অলংকার ও মূল্যবান রত্ন। দ্রৌপদী নিজে হাতে এনেছেন মাল্য ও উপাচার।

সমগ্র সভার সামনে যুধিষ্ঠির শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে কৃষ্ণের পা ধুলেন, তাঁকে অর্ঘ্য দিলেন, সম্মান প্রদর্শন করলেন।

সভাগৃহে ধ্বনিত হল—  

“কৃষ্ণের জয়!” “মাধবের জয়!” “মনুষ্যশ্রেষ্ঠের জয়!”

কিন্তু সকলে খুশি ছিলেন না।

সভায় বসে ছিলেন চেদিরাজ শিশুপাল। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর কৃষ্ণের প্রতি গভীর বিদ্বেষ। কৃষ্ণ রুক্মিণীকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাঁকে শিশুপাল বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। সেই ঈর্ষা ও ক্রোধ বছরের পর বছর আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।

কৃষ্ণকে রাজসূয় সভায় সর্বোচ্চ সম্মান পেতে দেখে তাঁর রাগ আর সামলানো গেল না।

হঠাৎ শিশুপাল উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে আগুন জ্বলছে, কণ্ঠস্বর বজ্রের মতো গর্জে উঠল।

“এ তো সমস্ত রাজাদের অপমান!” তিনি চিৎকার করে বললেন, “কৃষ্ণ কী করে প্রথম পূজার যোগ্য হতে পারেন? তিনি তো বৃদ্ধও নন। তাঁর পিতা বাসুদেব এখনও জীবিত। যদি তাঁকে আচার্য মনে করা হয়, তবে দ্রোণাচার্যের সামনে কৃষ্ণকে পূজা করা যায় না। এতে দ্রোণাচার্যের অপমান হয়। বিদ্বান ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাসদেব রয়েছেন। তবু তুমি যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে পূজা করলে? এই কৃষ্ণ তো রাজাও নয়, আচার্যও নয়। এখানে রয়েছেন অসংখ্য মহান শাসক, বৃদ্ধ ও ব্রাহ্মণ। ভীষ্ম নিজে সম্মানের যোগ্য। দ্রোণ আছেন, কৃপাচার্য আছেন। তবু তুমি যাদবদের এই গোপালকে বেছে নিলে?”

সভা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

শিশুপাল আরও ক্রুদ্ধ হয়ে বলতে লাগলেন,  

“কৃষ্ণ কোনও সম্রাট নন। তাঁর বিশাল রাজ্য নেই। জরাসন্ধের ভয়ে মথুরা ছেড়ে সমুদ্রের মধ্যে দ্বারকায় পালিয়ে গিয়েছেন। এমন লোক কী করে রাজাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান পাবেন?”

অনেক রাজাই অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে রইলেন। শিশুপালের কথা ছিল তীব্র ও অপমানজনক।

ভীমের শরীর ক্রোধে কাঁপতে লাগল। তিনি গর্জন করে উঠলেন, “এই মূর্খকে এখনই মেরে ফেলতে দাও!”

কিন্তু ভীষ্ম হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন।

শিশুপাল তবু থামলেন না। বারবার কৃষ্ণকে অপমান করে চললেন। তিনি ভীষ্মকেও বৃদ্ধ হয়ে বুদ্ধি হারিয়েছেন বলে বিদ্রূপ করলেন। পাণ্ডবদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললেন। তারপর সরাসরি কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন,  

“তুমি চালাকি আর ছলনার আড়ালে লুকিয়ে থাকো। তুমি পূজার যোগ্য নও। এই সম্মান তোমার প্রাপ্য ছিল না!”

সভার পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। অনেক রাজাই ভয় পেলেন, কারণ কৃষ্ণের শক্তির কথা তাঁরা জানতেন।

কিন্তু কৃষ্ণ নিজে ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত। মৃদু হাসি মুখে নিয়ে বসে রইলেন, যেন এসব অপমান তাঁর কাছে কিছুই নয়।

তখন ভীষ্ম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর সিংহনাদের মতো।  

“হে রাজারা, মন দিয়ে শোনো। আমাদের মধ্যে কৃষ্ণের সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি দুর্দান্ত অত্যাচারীদের পরাজিত করেছেন, ধর্মরক্ষা করেছেন, অসংখ্য নিরপরাধকে উদ্ধার করেছেন। জরাসন্ধও কৃষ্ণের বুদ্ধিতেই পতন হয়েছে। তাঁর শক্তিতে পৃথিবী অনেক দুষ্ট শাসকের বোঝা থেকে মুক্ত হয়েছে। যে কৃষ্ণের মাহাত্ম্য চিনতে পারে না, সে অজ্ঞানতা ও বিদ্বেষে অন্ধ।”

ভীষ্ম শিশুপালের দিকে ফিরে বললেন,  

“তুমি অহংকারে কথা বলছ কারণ ভাগ্য তোমার বুদ্ধি আচ্ছন্ন করেছে। তুমি জানো না কাকে অপমান করছ।”

কিন্তু শিশুপাল থামলেন না। বারবার কৃষ্ণকে গালাগালি করে চললেন। ঋষিরা দুঃখে কান চাপা দিলেন। রাজারা ভয়ে নীরব রইলেন।

অবশেষে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। সভা একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।

কৃষ্ণ শান্ত কণ্ঠে বললেন,  

“শিশুপাল, তোমার জন্মের পর থেকে তোমার অপমান আমি সহ্য করেছি—তোমার মায়ের কাছে দেওয়া প্রতিজ্ঞার জন্য। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমার একশো অপরাধ ক্ষমা করব। বারবার তোমাকে ক্ষমা করেছি। কিন্তু এবার সীমা অতিক্রম হয়েছে।”

অনেক আগে, শিশুপাল যখন অদ্ভুত অতিরিক্ত হাত ও চোখ নিয়ে জন্মেছিলেন, তখন আকাশবাণী হয়েছিল—যাঁর কোলে শিশুটি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তিনিই একদিন তাকে বধ করবেন। কৃষ্ণের কোলে শিশুটিকে রাখতেই তার বিকৃতি দূর হয়ে যায়। ভীত মা কৃষ্ণের কাছে পুত্রের প্রাণ ভিক্ষা চান। করুণায় কৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেন, “একশো অপরাধ ক্ষমা করব।”

সেই সীমা এখন পূর্ণ হয়েছে।

তবু ক্রোধান্ধ শিশুপাল হাসতে হাসতে অপমান করে চললেন।

কৃষ্ণের চোখ গম্ভীর হয়ে উঠল। এক ঝলকেই তিনি তাঁর দৈব সুদর্শন চক্র তুলে ধরলেন। সেই জ্বলন্ত চক্র ধ্বংসের আগুনের মতো ঝলসে উঠল।

কেউ কিছু বোঝার আগেই সুদর্শন চক্র উড়ে গিয়ে শিশুপালকে আঘাত করল। চেদিরাজ তৎক্ষণাৎ প্রাণহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। চক্র ফিরে এল কৃষ্ণের হাতে।

সভা এক মুহূর্ত শোকে স্তব্ধ।

তারপর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। শিশুপালের দেহ থেকে এক উজ্জ্বল জ্যোতি বেরিয়ে এসে সকলের সামনে কৃষ্ণের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

ঋষিরা রহস্য বুঝলেন। যদিও শিশুপাল সারাজীবন কৃষ্ণকে ঘৃণা করেছেন, তবু তাঁর মন সর্বদা কৃষ্ণের উপর নিবদ্ধ ছিল। তাই মৃত্যুকালে তাঁর আত্মা কৃষ্ণের মধ্যে লীন হয়ে মুক্তি পেল।

সভায় আস্তে আস্তে শান্তি ফিরে এল। যাঁরা কৃষ্ণকে সন্দেহ করেছিলেন, তাঁরাও এবার শ্রদ্ধা ও ভয় মিশিয়ে মাথা নত করলেন।

যুধিষ্ঠির বাকি আচার-অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করলেন। ব্রাহ্মণ, ঋষি ও রাজাদের প্রচুর দান-দক্ষিণা দেওয়া হল। অতিথিরা পাণ্ডবদের গৌরব ও কৃষ্ণের মাহাত্ম্য গেয়ে বিদায় নিলেন।

কিন্তু এই ঔজ্জ্বল্যের মাঝেও এক অন্ধকার ছায়া নিঃশব্দে পড়েছিল।


দুর্যোধন ইন্দ্রপ্রস্থের অপরিমেয় সম্পদ, ক্ষমতা ও গৌরব দেখে মনে মনে গভীর ঈর্ষায় জ্বলতে শুরু করেছিলেন। সেই ঈর্ষাই পরবর্তীকালে কুরুবংশের ভাগ্যকে ভয়ংকর পথে নিয়ে যাবে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)