দুঃশলা, জয়দ্রথ এবং কাম্যক বনের সেই অভিশপ্ত দুপুর
দুঃশলা ও জয়দ্রথ: এক বিবাহ, এক অতৃপ্ত বাসনা, আর দ্রৌপদী-হরণের কাহিনি
এক যে ছিল রাজকন্যে: দুঃশলা, জয়দ্রথ এবং কাম্যক বনের সেই অভিশপ্ত দুপুর-
মহাকাব্যের ধূসর, ধূলিমলিন পাতায় ধৃতরাষ্ট্রের একশত উদ্ধত পুত্রের পাশে একটিমাত্র মেয়ের নাম টিমটিম করে জ্বলে। দুঃশলা। কৌরবদের এই একমাত্র আদরের বোনটির ভাগ্যলিপি কিন্তু কোনো রূপকথার সুখের গল্প বলেনি। কুরুকুলের শত ভাইয়ের চোখের মণি হয়েও সে আসলে থেকে গেল ইতিহাসের এক মস্ত বড় ট্র্যাজেডি। এখানে দেখা যায় ক্ষমতার লোভ, লালসা আর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের এক অদ্ভুত কোলাজ।
বি:দ্র:দুঃশলার জন্ম বিবরণ জানতে এখানে ক্লিক করুন
আসুন, এই ট্র্যাজিক ইতিহাসের সুতো আলগা করা যাক।
দুঃশলা ও জয়দ্রথের বিবাহ: একটি রাজনৈতিক পাশাখেলা
গান্ধারীর সেই একশত পুত্রের জন্মের পর একটি অতিরিক্ত মাটির পাত্র থেকে জন্ম হয়েছিল দুঃশলার। কৌরব ভাইদের স্নেহের অন্ত ছিল না তাকে ঘিরে। কিন্তু রাজপরিবারের মেয়েদের জীবন তো আসলে এক একটা রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি। সিন্ধু ও সৌবীর দেশের প্রতাপশালী রাজা জয়দ্রথের সঙ্গে দুঃশলার বিয়েটা ভালোবাসার টানে হয়নি, হয়েছিল নিখাদ ক্ষমতার সমীকরণে।
দুর্যোধন তখন চারপাশ থেকে নিজের শক্তি বাড়াচ্ছেন। সিন্ধুদেশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। জয়দ্রথকে জামাতা হিসেবে পেলে কৌরবদের সামরিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। দুঃশলার সরল মন আর চোখের জলকে উপেক্ষা করে, কেবল সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভে দুর্যোধন তাঁর বোনকে তুলে দিলেন অহংকারী, নারীলোভী জয়দ্রথের হাতে। দুঃশলা চলে গেলেন সিন্ধুদেশে, কিন্তু তাঁর কপালে সুখের চেয়ে অপমানই জুটল বেশি।
কেন জয়দ্রথ আবার অন্য নারীর খোঁজে উন্মত্ত হলেন?
জয়দ্রথ চরিত্রগতভাবেই ছিলেন চঞ্চল এবং লালসাগ্রস্ত। দুঃশলার মতো সাধ্বী স্ত্রী ঘরে থাকা সত্ত্বেও তাঁর কামনার আগুন নেভেনি। তাঁর মনে হয়েছিল, সিন্ধুদেশের অধীশ্বর হয়ে তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন। মহাভারতের যুগে রাজাদের একাধিক বিয়ে করা কোনো নতুন বিষয় ছিল না, কিন্তু জয়দ্রথের ক্ষেত্রে সেটা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রীতি বা বংশরক্ষার তাগিদ ছিল না—ছিল এক আদিম ও উগ্র লম্পটতা। তিনি এমন এক নারীর সন্ধান করছিলেন, যিনি তাঁর অহংকারকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
এই অতৃপ্ত বাসনা বুকেই তিনি একদিন এক বিশাল সৈন্যসামন্ত নিয়ে যাচ্ছিলেন শাল্ব দেশের দিকে, আরেকটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আর তখনই নিয়তি তাঁকে নিয়ে এল কাম্যক বনের প্রান্তে।
কাম্যক বনে দ্রৌপদী হরণ: এক চরম স্পর্ধা
ঘটনাটি ঘটেছিল পাণ্ডবদের বারো বছরের বনবাসের দিনগুলিতে। কাম্যক বনের এক নির্জন প্রান্তে পাণ্ডবরা কুটির বেঁধে থাকতেন। সেদিন যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব—পাঁচ ভাই-ই দ্রৌপদীকে আশ্রমে একা রেখে মৃগয়ায় (শিকার) গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন কেবল বৃদ্ধ ধৌম্য পুরোহিত।
ঠিক সেই সময়েই জয়দ্রথের বিশাল রথযাত্রার বহর কাম্যক বনের সেই পথ দিয়ে পার হচ্ছিল। বনের গাছপালার আড়াল থেকে জয়দ্রথের চোখ গিয়ে পড়ল আশ্রমের আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা দ্রৌপদীর ওপর। কদলী বৃক্ষের মতো সুতন্বী, যাজ্ঞসেনীর সেই অলৌকিক রূপ দেখে জয়দ্রথ নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। তাঁর ভেতরের আদিম পশুটা জেগে উঠল।
তিনি তাঁর মিত্র কোটিকাষ্যকে পাঠালেন দ্রৌপদীর পরিচয় জানতে। যখন শুনলেন এই নারী আর কেউ নন, স্বয়ং পাণ্ডবদের মহিষী কৃষ্ণা—তখন তাঁর ভয় পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কৌরবদের জামাতা হওয়ার অহংকার আর পাণ্ডবদের এই দীন-হীন বনবাসী দশা দেখে তাঁর মনে কোনো সমীহ জাগল না। উল্টে তিনি ভাবলেন, এই তো সুযোগ পাণ্ডবদের অপমান করার!
জয়দ্রথ আশ্রমে প্রবেশ করে প্রথমে অতিথি সৎকার নিলেন, তারপর কুৎসিতভাবে দ্রৌপদীকে কুপ্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, "পাণ্ডবরা এখন শ্রীহীন, ভিখারি। ওদের ছেড়ে তুমি আমার রথে এসো, সিন্ধুদেশের রানি হয়ে থাকবে।"
দ্রৌপদী প্রথমে শান্তভাবে তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন যে তিনি সম্পর্কে তাঁর ভাসুর (যেহেতু দুঃশলা পাণ্ডবদেরও বোন)। কিন্তু জয়দ্রথ যখন দ্রৌপদীর শাড়ির আঁচল ধরে টান দিলেন, যাজ্ঞসেনীর ভেতরের অগ্নিকন্যা জেগে উঠল। তিনি জয়দ্রথকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলেন। অপমানে এবং কামনায় অন্ধ জয়দ্রথ তখন জোর করে দ্রৌপদীকে টেনে নিজের রথে তুললেন এবং রথ ছুটিয়ে দিলেন সিন্ধুদেশের দিকে। ধৌম্য পুরোহিত চিৎকার করতে করতে রথের পিছু পিছু ছুটলেন, কিন্তু বিশাল সিন্ধু সেনার সামনে তিনি ছিলেন অসহায়।
শেষ পরিণতি: দ্রৌপদীর উদ্ধার ও জয়দ্রথের লাঞ্ছনা
বেশি দূর যেতে পারেননি জয়দ্রথ। পাণ্ডবরা আশ্রমে ফিরে ধাত্রী আর ধৌম্য পুরোহিতের কাছে সব শুনে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। ভীম আর অর্জুন বাতাসের গতিতে রথ ছুটিয়ে তাড়া করলেন জয়দ্রথকে।
অর্জুনের বাণ জয়দ্রথের সমস্ত সৈন্যদলকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল। ভীম গদার আঘাতে জয়দ্রথের রথ ভেঙে চুরমার করে দিলেন। পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর অপমানের তীব্র বদলা নিয়ে জয়দ্রথকে যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত ও চরম অপদস্থ করলেন।
বি:দ্র:পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর অপমানের তীব্র বদলা নিয়ে কি ভাবে জয়দ্রথকে যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত ও চরম অপদস্থ করলেন,তা জানতে এখানে ক্লিক করুন।
ক্রোধোন্মত্ত ভীম জয়দ্রথকে মেরেই ফেলতেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে অর্জুন তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন বোন দুঃশলার কথা। জয়দ্রথ মারা গেলে কৌরবদের একমাত্র বোন দুঃশলা বিধবা হবেন—এই আশঙ্কায় যুধিষ্ঠিরের আদেশে ভীম জয়দ্রথকে প্রাণে মারলেন না। শাস্তি হিসেবে ভীম একটি অর্ধচন্দ্র বাণ দিয়ে জয়দ্রথের মাথার চুল এমনভাবে কেটে দিলেন, যাতে মাথার পাঁচ জায়গায় পাঁচটি ঝুঁটি রয়ে গেল—যা ছিল এক দাসের লক্ষণ।
অপমানে, লজ্জায় ধুলোয় মিশে যাওয়া জয়দ্রথকে শেষ পর্যন্ত মুক্ত করে দেওয়া হলো। কিন্তু এই লাঞ্ছনা তিনি ভুলতে পারেননি। এই ঘটনার পর থেকেই জয়দ্রথের মনে পাণ্ডবদের প্রতি যে তীব্র প্রতিহিংসার আগুন জ্বেলে উঠেছিল, তারই চরম পরিণতি আমরা দেখতে পাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে—যেখানে চক্রব্যূহে একা পেয়ে অভিমন্যু বধের মূল কারিগর হয়ে দাঁড়ান তিনি। এবং শেষ পর্যন্ত অর্জুনের প্রতিজ্ঞার আগুনে হাত ধুয়ে তাঁর মস্তক ছিন্ন হয়। আর পর্দার আড়ালে দুঃশলার পুরো জীবনটা চিরদিনের জন্য ঢেকে যায় এক ঘন কালো অন্ধকারে।

Comments
Post a Comment