বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার"


বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার"

দ্রৌপদীর সাথে যুধিষ্ঠিরের শান্ত, পরিমিত কথোপকথন যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, তখনই ভীম উঠে দাঁড়ালেন।

তিনি এতক্ষণ শুনছিলেন। যুধিষ্ঠিরের ক্ষমার মাহাত্ম্য, ধৈর্যের অকাট্য যুক্তি আর ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ—প্রতিটি শব্দ ভীম নিঃশব্দে গিলেছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের এক একটি বাক্য যত এগিয়েছে, ভীমের বুকের ভেতরের আগুনটা তত বিশাল, তত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একসময় তা আর চেপে রাখা গেল না। ভীম এমন মানুষ নন যিনি মনের ভাব লুকিয়ে রাখতে পারেন। তিনি একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস ফেললেন—যে শ্বাস কোনো বড় ঝড়ের আগে মানুষ নেয়—তারপর সোজা এগিয়ে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

যখন তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল এমন এক মানুষের জেদ, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

"আর্য," ভীম বললেন, "এবার সময় এসেছে একজন প্রকৃত ধার্মিকের মতো আচরণ করার। ধর্ম মানে কেবল প্রার্থনা আর অনন্ত ধৈর্য নয়, ধর্ম মানে একজন বীর এবং অকপট ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য পালন। ওটাও ধর্ম। এবং ওটাই আমাদের আসল ধর্ম।"

তিনি হাত দুটো ছড়িয়ে দিলেন। চারপাশের ঘন জঙ্গল, গাছের ডালের মধ্য দিয়ে নেমে আসা অন্ধকার, যে মাটিতে তাঁরা শুয়ে আছেন—সব কিছু দেখিয়ে তিনি যেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া অতীত আর বর্তমানের শূন্যতাকে ছুঁয়ে দিতে চাইলেন।

"আমরা যদি সমস্ত ঐশ্বর্য, রাজ্য আর সাধারণ নাগরিক জীবন বিসর্জন দিয়ে এই আশ্রমেই পড়ে থাকি, তবে আমাদের এই অস্তিত্বের মানে কী? কিসের জন্য বেঁচে আছি আমরা? যে মানুষগুলো আমাদের সাথে প্রতারণা করল, তাদের আমরা ক্ষমা করেছি। কিন্তু সেই ক্ষমার ফল কী হলো? আমাদের এই নীরবতাকে ওরা আমাদের দুর্বলতা ভাবছে। ওরা ভাবছে, এই মানুষগুলোকে যত খুশি লাঞ্ছিত করা যায়, কোনো পরিণতি ছাড়াই। আর তাই ওরা আমাদের আরও ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। বারবার, অবিরত, কোনো অপরাধবোধ ছাড়া। আমাদের এই সীমাহীন ধৈর্য ওদের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তুলছে না আর্য, ওদের অন্যায়কে আরও উসকে দিচ্ছে।"

ভীম সামান্য ঝুঁকলেন, তাঁর বিশাল বাহু দুটি বুকের ওপর ভাঁজ করা। যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে এমন এক তীব্রতায় তাকালেন যা সেই বনের অন্ধকারকে যেন চিরে ফেলল।

"আপনার এই জটিল দর্শন কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখুন। খুব সহজভাবে ভাবুন। চলুন, আমরা যুদ্ধের ঘোষণা করি। চলুন, ওদের পরাস্ত করি। আর যদি সেই চেষ্টায় আমাদের মৃত্যুও হয়—যদি সেই যুদ্ধক্ষেত্রেই আমরা ঢলে পড়ি—তবে ক্ষত্রিয়ের মতোই মরব। নিজেদের সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে স্বর্গে যাব। সেটা কোনো খারাপ মৃত্যু নয়। আমাদের ধর্ম তো চিরকাল এই বীরের মৃত্যুর কথাই বলে এসেছে। আর যদি আমরা জিতি—এবং আমরা জিতবই—তবে নিজেদের রাজ্য ফিরে পাব, মর্যাদার সাথে রাজত্ব করব। যেকোনো দিক থেকেই বিচার করুন, এই অরণ্যের অপমানের চেয়ে তা অনেক শ্রেয়।"

ভীমের ভেতরের অস্থিরতা তাঁকে এক জায়গায় স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। তিনি পায়চারি করতে শুরু করলেন।

"ভাই, একজন মানুষ কেবল ধর্ম দিয়ে বাঁচতে পারে না। শুধু অর্থ কিংবা শুধু কাম দিয়েও জীবন চলে না। আমাদের শাস্ত্রই তো বলে—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য থাকা দরকার। যেকোনো একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়লে মানুষ অপূর্ণ থেকে যায়, তার জীবন পঙ্গু হয়ে পড়ে। প্রাচীন পুঁথিগুলো খুব পরিষ্কার করে বলেছে: সকালটা ধর্মের, দুপুরটা অর্থ উপার্জনের আর সন্ধ্যাটা জীবনের আনন্দ ও কাম উপভোগের জন্য। তিন ভাগ, একদম সঠিক মাপে। আপনি আপনার সর্বস্ব ধর্মকে দিয়ে দিলেন, বাকি দুটোর দিকে তাকালেনও না। ফলাফল? আজ আমরা এই বনের মধ্যে শূন্য হাতে বসে আছি।"

তিনি পায়চারি থামিয়ে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে কোনো অবজ্ঞা ছিল না, ছিল এক চরম হাহাকার—এক অনুজের আকুলতা, যে তার জ্যেষ্ঠকে গভীরভাবে ভালোবাসে।

"একবার ভেবে দেখুন—অর্থ ছাড়া কোন ধর্মটা পালন করা সম্ভব? পৃথিবী ধর্মের নিয়মে চলে সত্য, কিন্তু সেই ধর্মকে টিকিয়ে রাখতেও উপায়ের প্রয়োজন হয়। দান-ধ্যান, যজ্ঞ, ব্রাহ্মণদের সেবা—সব কিছুর জন্যই তো সম্পদের প্রয়োজন। একজন ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতে পারেন, তাতে তাঁর মর্যাদাহানি হয় না। ওটাই তাঁর ধর্ম, তাঁর জন্য ওটাই সম্মানজনক। কিন্তু একজন ক্ষত্রিয়ের ভিক্ষাবৃত্তি? শাস্ত্র কদাচ এর অনুমতি দেয় না। ওটা আমাদের পথ নয়। আমরা বাঁচি আমাদের বাহুবলে, আমাদের অস্ত্রের ধার দিয়ে, যুদ্ধের রণহুঙ্কারে। এভাবেই আমরা অন্ন সংস্থান করি, এভাবেই আমরা সমাজকে রক্ষা করি। শক্তির জোরে নিজের প্রাপ্য ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে কোনো অধর্ম নেই। আসলে, আমাদের কাছে এটাই প্রত্যাশিত।"

ভীমের কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।

"নিজের প্রজাদের, নিজের দেশের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সনাতন ধর্মে একজন রাজার সবচেয়ে বড় কর্তব্য। এখানে নিষ্ক্রিয় বসে থেকে আপনি আসলে তাদের প্রতি অন্যায় করছেন। আপনার এই দ্বিধা, এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব পৃথিবীর চোখে আপনাকে উপহাসের পাত্র করে তুলছে। যে মানুষ নিজের স্বধর্ম ত্যাগ করে, সে পৃথিবীর অবজ্ঞা কুড়োয়। আর সে তার যোগ্য।"

তিনি নিজের সমস্ত বিশালতা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

"এই মানসিক দুর্বলতা ত্যাগ করুন, আর্য। একজন ক্ষত্রিয় যে বীরত্ব আর অটল জেদ নিয়ে জন্মায়, তাকে ফিরিয়ে আনুন। আপনার সাথে অর্জুন আছে—এই পৃথিবীতে তার সমকক্ষ কোনো ধনুর্ধর নেই, একজনও না। আর আমি তো আছিই। এই শরীরে হাজার হাতির শক্তি আমি বয়ে বেড়াই, আর তার প্রতিটি কণা আপনার আদেশের অপেক্ষায় ব্যাকুল। অর্জুনের ধনুক আর আমার গদা—এই দুইয়ের জোরে আমরা আমাদের সব কিছু ফিরিয়ে আনতে পারি। আমাদের মিত্র রাজারা আমাদের পক্ষে লড়বেন। আমাদের সাথে কৃষ্ণ আছেন। এই পৃথিবীর কোন শক্তি আমাদের এই জোটের সামনে দাঁড়ানোর সাহস পাবে?"

ভীমের চোখ দুটো তখন জ্বলছে।

"আজকের দিনটি অত্যন্ত শুভ। ব্রাহ্মণরা এখনই আবাহনের মন্ত্রপাঠ শুরু করুন। আমরা অস্ত্র তুলে নিই এবং হস্তিনাপুরের দিকে যাত্রা করি। শুধু একবার আদেশ দিন আর্য। একটিবার শুধু বলুন।"

যুধিষ্ঠির প্রতিটি শব্দ শুনলেন। তিনি একবারও ভীমকে থামিয়ে দেননি। ভীম থামার পরও যুধিষ্ঠির চট করে কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। এই নীরবতা উদাসীনতার নয়, বরং একজন মানুষের অত্যন্ত ভেবেচিন্তে শব্দ চয়নের নীরবতা। কারণ যুধিষ্ঠির জানতেন, তাঁর পরবর্তী প্রতিটি বাক্যের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।

"ভীম," যুধিষ্ঠির অবশেষে বললেন, তাঁর গলা শান্ত, "আমি তোমার সব কথা শুনেছি। তোমার একটি শব্দও আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না—তোমার এই ক্ষোভ অন্যায় নয়, আর অর্থ ও ধর্ম নিয়ে তোমার যুক্তিও একেবারে ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু আমার একটা কথা তোমাকে শুনতে হবে, আমি চাই তুমি সেটা মন দিয়ে বোঝো।"

তিনি অনুজের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন।

"আমাদের ভাগ্যে যা ঘটেছে, তা ওই পাশার ঘুটি ছুঁড়ে দেওয়ার আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। আমরা যখন সেই রাজসভায় খেলতে গিয়েছিলাম, দুর্যোধন নিজেই বাজি ধরার শর্তগুলো ঠিক করেছিল। সে সবার সামনে স্পষ্ট বলেছিল: আমরা যদি হেরে যাই, তবে আমাদের ভাইদের বারো বছর বনে বাস করতে হবে, আর ত্রয়োদশ বর্ষে থাকতে হবে অজ্ঞাতবাসে—এমনভাবে লুকিয়ে, যেন কেউ আমাদের চিনতে না পারে। আর সেই তেরো বছরের মাথায় যদি আমাদের খোঁজ মিলে যায়, তবে আবার নতুন করে নির্বাসন শুরু হবে। তুমি আর অর্জুন দুজনেই সেই শর্ত নিজের কানে শুনেছ। উপস্থিত প্রতিটি সৎ রাজা তা শুনেছেন।"

যুধিষ্ঠির একটু থামলেন।

"এবং আমি সেই শর্তে রাজি হয়েছিলাম। সমস্ত নিয়ম জেনেও আমি খেলায় বসেছিলাম এবং সম্মতি দিয়েছিলাম। তারপর আমি হেরে যাই। এখন সেই প্রতিজ্ঞা—যা ভরা রাজসভায় মান্যবর সাক্ষীদের সামনে করা হয়েছিল—তা আমি কেবল এই কারণে ভেঙে দিতে পারি না যে আমরা ক্লান্ত, আমরা ক্রুদ্ধ, আর ভীমের বাহুতে অনেক শক্তি আছে। প্রতিজ্ঞা তো প্রতিজ্ঞাই হয়, ভীম। ধর্মের সবচেয়ে বড় ভিত্তিই হলো বচন রক্ষা করা। একজন কৃষক মাটিতে বীজ বোনানোর পর অপেক্ষা করে—সে জোর করে সময়ের আগে ফসল টেনে তুলতে পারে না। তাকে সঠিক ঋতুর জন্য অপেক্ষা করতেই হয়। আমাদেরও আমাদের সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।"

তিনি চারপাশের ভাইদের দিকে তাকালেন, তাঁর কণ্ঠে এক শান্ত কিন্তু অলঙ্ঘনীয় দৃঢ়তা।

"আমি তোমাকে পরিষ্কার বলছি: আমার নিজেরও একটা শক্তি আছে—তা কেবল বাহুর শক্তি নয়, এক গভীর আত্মিক শক্তি। এই পৃথিবীতে আমার নিজের জীবনের চেয়েও আমি ধর্মকে বেশি ভালোবাসি। আর আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি—ধর্ম, কীর্তি, রাজ্য, সন্তান কিংবা ঐশ্বর্য—কোনো কিছুই একজন মানুষের দেওয়া কথার চেয়ে বড় হতে পারে না। একটাও না।"

ভীম শান্ত হলেন না। তাঁর ভেতরের আগুন নেভেনি—উল্টো যুধিষ্ঠিরের এই পরিমিত যুক্তি সেই আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিল। তাঁর মনে হলো, এই অতি-যৌক্তিকতাই আসলে এক ধরণের ফাঁদ।

"আর্য," ভীম বললেন, এবার তাঁর গলায় রাগ নয়, এক অদ্ভুত আকুলতা ঝরে পড়ল, "একটা কথা ভাবুন। জীবন তো প্রতিদিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। যে সকালটা চলে যায়, তা আর কোনোদিন ফিরে আসে না। প্রতিদিনের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মানুষের আয়ুর প্রদীপটা একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়—ঠিক যেমন প্রতিদিন ব্যবহারের ফলে পাত্রের ভেতরের কাজল ফুরিয়ে আসে। যে মানুষ জানে তার জীবন অনন্ত, যে অতীত আর ভবিষ্যৎকে স্পষ্ট দেখতে পায়—হয়তো তার পক্ষে অপেক্ষা করা সাজে। কিন্তু আমরা তো সাধারণ মরণশীল মানুষ। মৃত্যু কোনোদিন আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে আসে না।"

তিনি যুধিষ্ঠিরের আরও কাছে এগিয়ে গেলেন।

"আপনি তেরো বছরের প্রতিজ্ঞার কথা বলছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন—আমরা ইতিমধ্যেই এই বনে তেরো মাস কাটিয়ে ফেলেছি। আর বৈদিক কালগণনা অনুযায়ী, সময়ের হিসেব সবসময় ওপর ওপর যা দেখায় তা নয়। শাস্ত্রের নিয়মে এক একটি মাস এক একটি বছরের প্রতীক হতে পারে। সেই হিসেবে তেরো মাস মানে তেরো বছর পার হয়ে গেছে। আমরা আমাদের কথা রেখেছি আর্য। আমাদের ঋণ শোধ হয়েছে। আর কিসের অপেক্ষা?"

তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

"ক্ষত্রিয়ের জন্য যুদ্ধের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। রণক্ষেত্রই আমাদের আসল জায়গা, সেখানেই আমরা আমাদের নিয়তি পূরণ করি। আমাদের আদেশ দিন, চলুন গিয়ে এই অন্যায়ের শেষ দেখে আসি।"

যুধিষ্ঠির এবার গভীর নীরবতায় ভাইয়ের কথাগুলো বিবেচনা করলেন। ভীমের যুক্তিতে কোনো খামতি ছিল না—তা এসেছে ভাইদের প্রতি এক তীব্র ভালোবাসা আর তাঁদের ওপর হওয়া অন্যায়ের গভীর ক্ষোভ থেকে। কিন্তু যুধিষ্ঠির যখন আবার কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মাপা এবং অত্যন্ত গম্ভীর।

"ভীম, তুমি একজন বীর—আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা। কিন্তু কেবল শারীরিক শক্তিই কোনো কাজের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। নিজের ক্ষমতার ওপর অহংকার থাকাটা স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু ওটা প্রজ্ঞা নয়। যে মানুষ কেবল সাহসের ওপর ভরসা করে কাজ করে—কোনো দূরদর্শিতা ছাড়া, বিচারবুদ্ধি ছাড়া, নিজের লাভের পথটা আগে না চিনে—সে শেষ পর্যন্ত কষ্ট পায়, সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন। ওটা শিশুর মতো আচরণ, রাজার মতো নয়।"

তিনি খুব শান্তভাবে এক একজন যোদ্ধার নাম নিতে লাগলেন, আর প্রতিটি নাম যেন বাতাসে ভারী হয়ে নেমে এল।

"ভেবে দ্যাখ আমাদের বিপক্ষে কারা দাঁড়িয়ে আছে। ভূরিশ্রবা, শল্য, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন, দুঃশাসন। এদের প্রত্যেকেই উচ্চমানের বীর—অস্ত্রে সজ্জ্বিত, প্রস্তুত এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেইসব রাজারা, যাদের আমরা রাজসূয় যজ্ঞের সময় পরাস্ত করেছিলাম। যে শাসকেরা একদিন আমাদের সামনে নতজানু হয়েছিল, তারা আজ দুর্যোধনের পতাকাতলে দাঁড়িয়ে নিজেদের আহত অহংকারকে জিইয়ে রাখছে। এই মানুষগুলো দুর্যোধনকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন দিতেও দ্বিধা করবে না। শুধু উদ্দীপনা দিয়ে এদের উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভীম।"

যুধিষ্ঠির ভীমের দিকে তাকালেন। সেই চোখে কোনো দুর্বলতা ছিল না—ছিল এক দূরদর্শী মানুষের নির্মম স্পষ্টতা, যে এই কুয়াশাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে বাকিদের চেয়ে অনেক বেশি ভেবেছে।

"আজ এই মুহূর্তে, আমরা যেভাবে আছি, এই অবস্থায় যদি ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি—তবে স্বয়ং ইন্দ্রও যদি স্বর্গের সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ান, তিনিও জয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না। এটা ভীরুতা নয় ভীম, এটা বাস্তবতা। আর যে মানুষ বীরত্বের নামে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, সে সাহসী নয়—সে হঠকারী। আর হঠকারিতা শেষ পর্যন্ত পরাজয়েরই আর এক নাম।"

চারপাশের অরণ্য যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। পাঁচ ভাই এক ভারী নীরবতার মধ্যে ডুবে রইলেন। এ এমন এক নীরবতা, যেখানে গভীর মতবিরোধ আছে, কিন্তু একে অপরের প্রতি ভালোবাসাও এতটাই অগাধ যে সেই বিরোধ কোনো ফাটল ধরাতে পারে না।

বারো বছরের সমস্ত দুঃখ, আগুন আর ধৈর্যের পরীক্ষা বুকে নিয়ে সেই জমে থাকা নীরবতার মধ্যেই—হঠাৎ এক নতুন স্পন্দন অনুভূত হলো।

গাছের আড়াল থেকে এক মায়াবী অবয়ব এসে দাঁড়াল সেই আলো-আঁধারির মাঝে। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পুরো পরিবেশটা বদলে গেল। ঠিক যেমন একঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে একটা বন্ধ ঘরের তাপমাত্রা বদলে দেয়, তেমনই।


ভাইয়েরা ঘুরে তাকালেন। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন এসেছেন।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের দশম পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।


Go to all publications for full reading as per index




আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)