দুর্যোধনের কুটিল ষড়যন্ত্র, ব্যাসদেবের আগমন এবং মহর্ষি মৈত্রেয়ের অভিশাপ


দুর্যোধনের কুটিল ষড়যন্ত্র, ব্যাসদেবের আগমন এবং মহর্ষি মৈত্রেয়ের অভিশাপ

বিদুর কাম্যক বন থেকে হস্তিনাপুরে ফিরেছেন—এই সামান্য খবরটুকুই দুর্যোধনের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা, চেনা অস্বস্তি জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল। বিদুর মানুষটিকে সে কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারেনি। ওই অতিরিক্ত ধার্মিক, হিসেবি মানুষগুলো সবসময় পাণ্ডবদের দিকেই ঝুঁকে থাকে। দুর্যোধন আর দেরি করল না। নিজের খাসকামরায় ডেকে পাঠাল শকুনি, কর্ণ আর দুঃশাসনকে। চারজন যখন মুখোমুখি বসল, দুর্যোধনের গলার স্বর তখন নিচু, কিন্তু সেখানে এক তীব্র উত্তেজনা।

"আমাদের অতি-চালাক কাকা বিদুর কাম্যক বন থেকে ঘুরে এসেছেন," দুর্যোধন ঠোঁট কামড়ে বলল, "আমি নিশ্চিত, উনি এখন বাবার কানে মন্ত্র দেবেন। তেরো বছরের বনবাস শেষ হওয়ার আগেই যাতে পাণ্ডবদের সসম্মানে হস্তিনাপুরে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই ব্যবস্থা পাকা করতেই ওঁর এই আগমন। আমাদের এখনই কিছু করতে হবে। বিদুর চাল চালার আগেই আমাদের ঘুঁটি সাজাতে হবে।"

কর্ণের রক্তে সবসময় একটা চোরা আগুন থাকে। দুর্যোধনের মনের অন্ধকার ইচ্ছেগুলোকে সে সবার আগে লুফে নেয়। কর্ণ তক্ষুনি সোজা হয়ে বসে বলল, "তাহলে আর অপেক্ষা কেন? আঘাত যদি করতেই হয়, তবে এখনই সেরা সময়। পাণ্ডবরা এখন নিতান্তই নিঃস্ব। না আছে সৈন্যসামন্ত, না আছে অস্ত্রশস্ত্র। বনের কষ্ট আর অপমানে ওদের মনের জোর ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই অবস্থায় যদি আমরা সসৈন্যে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, তবে আপদ একবারে বিদায় হয়। কেউ জানতেও পারবে না, বনের অন্ধকারেই কুরু বংশের সব বিবাদের চিরতরে সমাধি ঘটবে।"

পরামর্শটা বাকি তিনজনের মনে ধরল। কোনো দ্বিধা রইল না। তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেল এক গোপন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি। রথ সাজানো হলো, ধারালো অস্ত্রে ভরে উঠল তূণীর। হস্তিনাপুরের রাজপথ ধরে চার মূর্তির সেই ঘাতক দল রওনা হলো কাম্যক বনের দিকে—উদ্দেশ্য অতি স্পষ্ট এবং নৃশংস: পাণ্ডবদের হত্যা করা।

কিন্তু এই পৃথিবীর সব অন্ধকার চক্রান্তের ওপর কারও না কারও নজর থাকে। মহর্ষি ব্যাসদেব, যাঁর দিব্যদৃষ্টির সামনে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়, তিনি হস্তিনাপুরের এই পাপ-যাত্রার কথা জানতে পারলেন। কৌরবদের রথ যখন ধুলো উড়িয়ে ছুটছে, ঠিক তখনই পথের মাঝে যেন এক জীবন্ত, শান্ত প্রাচীরের মতো এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস।

তাঁর কণ্ঠে কোনো চিৎকার ছিল না, কিন্তু এক অমোঘ কর্তৃত্ব ছিল। তিনি শান্ত স্বরে দুর্যোধনদের থামতে বললেন। ব্যাসদেব স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই মুহূর্তে পাণ্ডবদের দিকে এগোনো মানে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা। ব্যাসের মতো ব্যক্তিত্বকে অগ্রাহ্য করার সাহস অন্তত সেই মুহূর্তে দুর্যোধনের হলো না। অগত্যা রথ থামাতে বাধ্য হলো তারা।

সেখান থেকে সোজা ধৃতরাষ্ট্রের সভায় এলেন ব্যাসদেব। অন্ধ রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো ভূমিকা করলেন না। বললেন, "ধৃতরাষ্ট্র, যা বলছি তা তোমার কুরু বংশের মঙ্গলের জন্যই বলছি। তোমার ছেলেরা পাশা খেলায় চরম জালিয়াতি করে পাণ্ডবদের হারিয়েছে। ওদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে বনে পাঠিয়েছে—আমি সেদিনও একে সমর্থন করিনি, আজও করি না। মনে রেখো, তেরো বছর পর যখন ওরা ফিরবে, তখন ওদের বুকে ক্ষমা থাকবে না, থাকবে আগুন। সেই আগুনে তোমার ছেলেরা খড়কুটোর মতো পুড়ে খাক হয়ে যাবে।"

একটু থেমে মহর্ষি আবার বললেন, "আর এখন তোমার ছেলেরা সেই পাপের ওপর আরও বড় পাপের বোঝা চাপাচ্ছে। বনে গিয়ে নিরস্ত্র পাণ্ডবদের মারার ষড়যন্ত্র করছে ওরা। ওদের আটকাও, ধৃতরাষ্ট্র! এ তোমার পুত্ৰস্নেহ নয়, এ তোমার অন্যায় অন্ধতা। দুর্যোধন যদি শত্রুতা ভুলে কাম্যক বনে পাণ্ডবদের সাথে অতিথি হয়ে কিছুদিন থাকত, হয়তো ওর ভেতরের বিষ কিছুটা কমত। যদিও আমি জানি, জন্মগত স্বভাব সহজে বদলায় না। তবুও যদি নিজের বংশকে বাঁচাতে চাও, তবে পাণ্ডবদের সাথে সন্ধি করাই একমাত্র পথ।"

ধৃতরাষ্ট্রের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি হাত জোড় করে বললেন, "মহর্ষি, আপনার একটি কথাও মিথ্যা নয়। বিদুর, ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য—সবাই আমাকে এই কথাই বলেন। কিন্তু আমি তো নিরুপায়! আপনি দয়া করে নিজে একবার দুর্যোধনকে বুঝিয়ে বলুন না?"

ব্যাসদেব বিদায় নেওয়ার আগে শুধু এটুকুই বললেন, "আমার কথা ও শুনবে না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে মহর্ষি মৈত্রেয় আসবেন। তিনি তীর্থ সেরে আসার পথে কাম্যক বনে পাণ্ডবদের নিজের চোখে দেখে এসেছেন। তিনিও তোমার ছেলেদের সুবুদ্ধি দেবেন। মনে রেখো ধৃতরাষ্ট্র, মৈত্রেয় যা বলবেন, তা যেন দুর্যোধন মাথা পেতে নেয়। তাঁকে যদি চটানো হয়, তবে তিনি শুধু উপদেশ দেবেন না, কুরু বংশকে অভিশাপ দিয়ে যাবেন।"

ব্যাসদেবের কথাই সত্যি হলো। কিছু পরেই রাজসভায় পদার্পণ করলেন মহর্ষি মৈত্রেয়। ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত বিনীতভাবে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে আসনে বসালেন এবং ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে ঋষিশ্রেষ্ঠ, আপনি কুরুজাঙ্গল অঞ্চল থেকে আসছেন। পাণ্ডবরা কেমন আছে? ওরা কি ওদের প্রতিজ্ঞা মেনে চলছে? আমাদের মধ্যে কি কোনোদিন শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে?"

মৈত্রেয় ঋষির চোখে ছিল এক গভীর অভিজ্ঞতার চাউনি। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মহারাজ, তীর্থযাত্রার সময় কাম্যক বনে পাণ্ডবদের আশ্রমে আমি গিয়েছিলাম। দেখলাম, রাজপুত্ররা আজ জটাজুটধারী, মৃগচর্ম পরিহিত। অথচ তাঁদের তেজ কমেনি। প্রতিদিন বহু ঋষি-ব্রাহ্মণ তাঁদের দর্শন করতে আসেন। সেখানেই শুনলাম জুতাক্রীড়ার সেই লজ্জাজনক অধ্যায়। কৌরবরা যা করেছে, তা কোনো সভ্য সমাজে ভাবা যায় না। এই অন্যায় তোমার বংশের ওপর অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে। আমি এখানে এসেছি কারণ কুরু বংশের ভালোমন্দ নিয়ে আমিও চিন্তিত।"

এরপর তিনি সরাসরি ধৃতরাষ্ট্রকে বিঁধে বললেন, "তুমি এই বংশের প্রধান। তোমার চোখের সামনে দুই ভাইয়ের মধ্যে এই বিষাক্ত শত্রুতা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে, আর তুমি তা প্রশ্রয় দিচ্ছ? তোমার এই নীরবতা রাজ্যের সমস্ত জ্ঞানীবৃদ্ধদের সামনে তোমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এখনও সময় আছে, এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করো।"

এবার মৈত্রেয় ঘুরলেন দুর্যোধনের দিকে। রাজপুত্রের প্রতি কোনো বাড়তি তোষামোদ না দেখিয়ে তিনি সরাসরি বললেন, "দুর্যোধন, মন দিয়ে শোনো। পাণ্ডবদের হালকাভাবে নেওয়ার ভুল কোরো না। ওরা কত বড় পরাক্রমী যোদ্ধা, তা তুমি ভালো করেই জানো। হিড়িম্ব, বকাসুর আর কির্মীরের মতো রাক্ষসদের যারা হেলায় বধ করতে পারে, তাদের সাথে শত্রুতা কোরো না। যেদিন তোমরা ওদের বনবাসে পাঠালে, সেই রাতেই ভীম একার হাতে কির্মীরকে শেষ করে দিয়েছে। মনে রেখো, ভীমের শরীরে দশ হাজার হাতির বল। আর তাদের পাশে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের অহংকার ত্যাগ করো, পাণ্ডবদের সাথে বন্ধুত্ব করো। ক্রোধের বশে এমন কোনো পথে পা বাড়িও না, যেখান থেকে ফেরার কোনো রাস্তা থাকে না।"

কিন্তু দুর্যোধন তখন অন্য জগতে। মৈত্রেয়র এত বড় উপদেশ তার কানেই ঢুকছিল না। সে সভার মধ্যে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বসে রইল। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, অবজ্ঞার হাসি। নিজের ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে সে মেঝের মাটি খুঁড়ছিল আর হাত দিয়ে হাঁটুতে একটা ধীর, বিরক্তিকর ছন্দ তুলে যাচ্ছিল। যেন বোঝাতে চাইছিল—এইসব মুনি-ঋষিদের ফালতু কথা শোনার মতো সময় তার নেই।

একজন মহর্ষির সামনে দাঁড়িয়ে এই চরম ঔদ্ধত্য! মৈত্রেয়র ভেতরের তপোবল আর সংযমের বাঁধ এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। তাঁর চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। ঋষির ক্রোধ যখন মাথাচাড়া দেয়, তখন তা চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তোলে।

"মূর্খ দুর্যোধন!" মেঘের মতো গর্জে উঠলেন মৈত্রেয়, "তোর এত বড় স্পর্ধা! আমি তোর মঙ্গলের জন্য কথা বলছি, আর তুই আমার সামনে বসে এইরকম অহংকার দেখাচ্ছিস? বধির আর উদ্ধত কোথাকার! ঠিক আছে, তোর এই দেমাকের ফল তোকে ভুগতেই হবে। পাণ্ডবদের সাথে তোদের এক মহাসংগ্রাম হবে—আর সেই যুদ্ধে মহাসমরে ভীম তার গদার আঘাতে তোর ওই অহংকারী উরু দুটি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবে!"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো রাজসভা এক থমথমে, নিথর স্তব্ধতায় ডুবে গেল। ধৃতরাষ্ট্র ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আসন থেকে নেমে মহর্ষির পায়ে লুটিয়ে পড়লেন, "প্রভু, ক্ষমা করুন! আমার অবোধ পুত্রের ওপর এই ভয়ানক অভিশাপ ফিরিয়ে নিন!"

মৈত্রেয় অন্ধ রাজার দিকে তাকালেন। তাঁর রাগ পুরোপুরি জল না হলেও গলার স্বর কিছুটা নরম হলো। তিনি বললেন, "এই অভিশাপ খণ্ডন হতে পারে ধৃতরাষ্ট্র, যদি তোমার পুত্র পাণ্ডবদের সাথে আন্তরিকভাবে সন্ধি করে নেয়।" আর একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে মহর্ষি মৈত্রেয় সভা ত্যাগ করলেন।

কিছুক্ষণ পর দুর্যোধনও সভা থেকে বেরিয়ে গেল। তবে তার মাথায় তখন অভিশাপের ভয় কাজ করছিল না। রাজপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার মাথায় ঘুরছিল অন্য একটা কথা—ভীম কীভাবে অত সহজে মহাশক্তিশালী কির্মীর রাক্ষসটাকে মেরে ফেলল? দুর্যোধনের ঠোঁটের কোণের সেই চেনা, চওড়া হাসিটা ততক্ষণে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ৫ম ভাগের  সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

Go to all publications for full reading

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা