নল- দময়ন্তীর উপাখ্যান — অরণ্যযামিনী ও মহাপ্রস্থান-৩য় ভাগ
নল- দময়ন্তীর উপাখ্যান ৩য় ভাগ— অরণ্যযামিনী ও মহাপ্রস্থান
যুধিষ্ঠির মহর্ষি বৃহদশ্বের কাছ থেকে এমন এক রাজার গল্প শুনতে চেয়েছিলেন, যিনি রাজা যুধিষ্ঠিরের মতোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যপীড়িত ছিলেন। তাই বৃহদশ্ব গল্পটি শুরু করেছিলেন।
এটি যুধিষ্ঠির মহর্ষি বৃহদশ্বের কাছ থেকে এমন এক রাজার গল্প শুনতে চেয়েছিলেন, যিনি রাজা যুধিষ্ঠিরের মতোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যপীড়িত ছিলেন। তাই বৃহদশ্ব গল্পটি শুরু করেছিলেন।
এটি নল ও দময়ন্তীর পর্বটির ৩য় ভাগ। ২য় পর্বটি আগেই প্রকাশিত হয়েছে।
২য় পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নল-দময়ন্তী কথা: (২য় ভাগ) দেব-আশীর্বাদ ও সর্বনাশের বীজ
নল- দময়ন্তীর উপাখ্যান — অরণ্যযামিনী ও মহাপ্রস্থান-
এক দগ্ধ চিত্তের আখ্যান
বৃহদশ্ব কহিলেন, "ধর্মরাজ, সেই আদিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেদ করে নল ও দময়ন্তী হেঁটে চলছিলেন। দিনের পর দিন অন্নহীন, জলহীন অবস্থায় ক্লান্তি ও অবসাদ তাদের শরীরকে জীর্ণ করে দিচ্ছিল। কিন্তু নলের ক্ষতটা ছিল আরও গভীর, তা তাঁর অন্তরে। কলি তখন তাঁর চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। সেই অন্ধকার প্রভাব নলের মস্তকে এক ভয়ংকর কুটিল চিন্তার জন্ম দিল। তিনি ভাবলেন, এই যে দময়ন্তী, যিনি রাজসুখ ত্যাগ করে কোনো অভিযোগহীন চিত্তে তাঁর সমস্ত বিপর্যয় ভাগ করে নিয়েছেন, তাঁর কি এই নিয়তি প্রাপ্য? একজন রাজ্যহারা, কপর্দকহীন মানুষের পাশে থেকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করার জন্য তো তাঁর জন্ম হয়নি! নলের মনে হলো, দময়ন্তী যদি তাঁর এই অভিশপ্ত ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারেন, তবে হয়তো কোনো উপায়ে বিদর্ভে তাঁর পিতার প্রাসাদে ফিরে যেতে পারবেন। সেখানে অন্তত তাঁর নিরাপত্তা থাকবে, রাজকীয় মর্যাদা থাকবে।
কিন্তু এই কথাটি মুখের ওপর দময়ন্তীকে বলার সাধ্য নলের ছিল না। কারণ কলির কুটিল মন্ত্রণার নিচেও দময়ন্তীর প্রতি তাঁর চিরন্তন প্রেম তখনো ফল্গুধারার মতো বহমান। অথচ সেই আত্মঘাতী চিন্তা তাঁকে তিলে তিলে শেষ করছিল।
এক সন্ধ্যায়, বনের গহীনে এক জরাজীর্ণ কুটিরের সন্ধান পেলেন তাঁরা। অবসাদে ভেঙে পড়া দময়ন্তী স্বামীর চরণে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমে তলিয়ে গেলেন। কিন্তু নলের চোখে ঘুম কোথায়? সারারাত জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো সেই একই চিন্তা তাঁর মস্তিষ্ককে দগ্ধ করতে লাগল। অবশেষে, এক চরম দুর্বল ও বিবেকহীন মুহূর্তে, নল তাঁদের দুজনের একমাত্র আবরণ বস্ত্রখানি তরবারি দিয়ে অর্ধেক কেটে নিলেন। সেই খণ্ডাংশ নিজের দেহে জড়িয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। প্রেম আর কলির রোপণ করা কুযুক্তি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে নল পা বাড়ালেন, আবার থমকে দাঁড়ালেন, ফিরে তাকালেন ঘুমন্ত স্ত্রীর নিষ্পাপ মুখের দিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। এক অন্তহীন গ্লানি বুকে নিয়ে, অন্ধকার অরণ্যের গভীরে মিলিয়ে গেলেন নিষধরাজ নল।"
একাকী জাগরণ ও দময়ন্তীর আর্তনাদ
"যখন দময়ন্তীর ঘুম ভাঙল, তখন অরণ্যের শিয়রে সূর্যদেব উদিত হয়েছেন। পাখির কলকাকলিতে মুখর চারিপাশ। কিন্তু পাশে হাত বাড়িয়েই দময়ন্তী অনুভব করলেন এক শূন্যতা। প্রথমে মৃদু স্বরে, তারপর এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি ডাকলেন, 'নাথ!' অরণ্যের গাছে গাছে আছড়ে পড়ল সেই আকুল আহ্বান। তিনি ভাবলেন, নল হয়তো কাছাকাছি কোথাও ফলমূল সংগ্রহ করতে গেছেন বা জলাশয় থেকে জল আনতে গেছেন। কিন্তু না, কোনো উত্তর এলো না। কেবল বনের উদাসীন হাওয়া তাঁর কান্নাকে উপহাস করতে লাগল।
ধীরে ধীরে সত্যের সেই নিষ্ঠুর রূপটি দময়ন্তীর সামনে উন্মোচিত হলো। যে মানুষটি দেবতাদের আহ্বান উপেক্ষা করে, ইন্দ্র-অগ্নি-বরুণ-যমকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে বরমাল্য ভূষিত করেছিলেন, সেই নল তাঁকে এই হিংস্র শ্বাপদসংকুল অরণ্যে একাকী ফেলে চলে গেছেন!
দময়ন্তী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ভাগ্যের এই নির্মম পরিহাসের বিরুদ্ধে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল, অথচ সেই চরম সর্বনাশের মুহূর্তেও তিনি স্বামীকে একটিবারের জন্যও অভিশাপ দিলেন না। অশ্রুসজল চোখে নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'তাঁর নিজের ইচ্ছায় তিনি আমাকে ফেলে যেতে পারেন না। নিশ্চয়ই কোনো মহাশক্তি বা মহাবিপদ তাঁর চেতনাকে গ্রাস করেছে।' তাঁর এই অনুমান মিথ্যা ছিল না, কিন্তু সেই মুহূর্তে তা দময়ন্তীকে কোনো শান্তি দিতে পারল না।
একাকী, নিরাশ্রয় অবস্থায় দময়ন্তী বনের পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। হে ধর্মরাজ, এক মরণপণ পরীক্ষা শুরু হলো তাঁর। এক বিশাল অজগর তাঁকে নিজের কুণ্ডলীতে আবদ্ধ করে পিষে মারার উপক্রম করতেই, এক ব্যাধ তাঁর আর্তনাদ শুনে ছুটে এলো এবং তলোয়ারের আঘাতে সর্পটিকে খণ্ডবিখণ্ড করে দময়ন্তীকে মুক্ত করল। কিন্তু দময়ন্তীর সেই মলিন, ধূলিধূসরিত রূপের মধ্যেও যে স্বর্গীয় লাবণ্য ছিল, তা দেখে সেই ব্যাধের মনে কামনার আগুন জ্বলে উঠল। সে যখন বলপূর্বক দময়ন্তীর সতীত্ব হরণের চেষ্টা করল, তখন দময়ন্তী তাঁর অন্তরের পবিত্রতা আর পতিভক্তির মহাশক্তিকে আবাহন করে ব্যাধকে শাপ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই পাপিষ্ঠ ব্যাধ বজ্রাহতের মতো ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণত্যাগ করল।
এত বড় বিপর্যয়ের পরেও দময়ন্তী আশা হারালেন না। বন্য ফলমূল আর গাছের মূল খেয়ে, যেখানে রাত কাটে সেখানে আশ্রয় নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। অবশেষে এক পর্বতের চূড়ায় উঠে দূর দিগন্তে তিনি লোকালয়ের ধোঁয়া দেখতে পেলেন। অবশিষ্টাংশ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে তিনি সেই দিকেই পা বাড়ালেন।"
বণিকদল, উন্মত্ত হস্তী ও চেদি রাজপ্রাসাদ
"পথের মাঝে প্রথমে এক সার্থবাহ বা বণিকদলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। জলাশয়ের পাশে বিশ্রামরত সেই বণিকেরা দময়ন্তীর ছিন্নবাস ও ধূলিমলিন রূপের আড়ালে তাঁর অভিজাত বংশীয় চ্যুতি লক্ষ্য করে দয়াশীল হলেন এবং তাঁকে নিজেদের সঙ্গে ভ্রমণের অনুমতি দিলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা তখনও শেষ হয়নি। সেই রাতেই একদল বুনো হাতি আচমকা উন্মত্তের মতো সেই শিবিরের ওপর আক্রমণ চালাল। ঘুমন্ত মানুষের ওপর দিয়ে চলে গেল হাতির দল। বহু মানুষ পিষ্ট হলো, চারদিকে হাহাকার আর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল।
দময়ন্তী অলৌকিকভাবে এই যাত্রায় বেঁচে গেলেন বটে, কিন্তু বেঁচে থাকাটাই তাঁর জন্য নতুন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল। অবশিষ্ট ক্ষুব্ধ ও শোকগ্রস্ত বণিকেরা ফিসফিস করতে লাগল যে, এই রহস্যময়ী নারীর আগমনের পর থেকেই তাদের এই সর্বনাশ হয়েছে। কেউ কেউ তাঁকে ডাইনি বা রাক্ষসী বলে দাগিয়ে দিল, কারণ এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও তিনি অক্ষত ছিলেন।
এই নির্মম অপবাদে দময়ন্তীর হৃদয় ভেঙে গেল। তিনি আবার একাকী পথ চলতে চলতে অবশেষে চেদি রাজ্যে এসে পৌঁছালেন। যখন তিনি চেদি রাজমাতার প্রাসাদের সিংহদ্বারে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর উস্কোখুস্কো চুল এবং মলিন বস্ত্র দেখে প্রহরীরা তাঁকে উন্মাদিনী ভেবে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অলিন্দ থেকে রাজমাতা স্বয়ং তাঁর রাজকীয় চলন ও অবয়ব লক্ষ্য করলেন। বাহ্যিক দৈন্যের আড়ালে এক সুউচ্চ বংশমর্যাদার আভাস পেয়ে রাজমাতা তাঁকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন।
রাজমাতা পরম স্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে তুমি কল্যাণী? কোন নিষ্ঠুর ভাগ্যের পরিহাসে তোমার মতো রূপবতী ও গুণবতী নারী আজ এই ভিখারিনীর বেশে?'
দময়ন্তী তখনও নিজের পরিচয় বা স্বামীর নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। তিনি কেবল বললেন, তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়ে ফেলেছেন এবং পথভ্রষ্ট হয়েছেন। তিনি রাজপ্রাসাদে দাসী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন, যতদিন না তাঁর স্বামীর সন্ধান মেলে। দময়ন্তীর এই সংযত ও অভিজাত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে রাজমাতা তাঁকে নিজের কন্যার পরিচারিকা ও সখী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তবে দময়ন্তী একটি শর্ত চাইলেন—কোনো পুরুষ যেন কখনো তাঁর সম্মুখীন না হয় বা তাঁর দিকে কুদৃষ্টিতে না তাকায়। রাজমাতা সানন্দে সেই শর্ত মেনে নিলেন। দময়ন্তীও অন্তরালে থেকে পরম শান্তিতে তাঁর হারিয়ে যাওয়া নলের সন্ধান করতে লাগলেন।"
বৃহদশ্ব গল্প থামিয়ে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। ধর্মরাজের মুখমণ্ডল তখন গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন।
মহর্ষি বৃহদশ্ব স্মিতহাস্যে কহিলেন, "দেখলে তো ধর্মরাজ? এই সংসারে এমন শোকও আছে যার সামনে তোমার এই বনবাসের দুঃখ অত্যন্ত লঘু বলে মনে হবে। তবে শোনো, গল্প এখানেই শেষ নয়। নল সেই অরণ্যে একা কোন পথে গেলেন, আর কীভাবে এই বিচ্ছিন্ন দুই হৃদয় আবার এক হলো—তা কি তুমি শুনতে চাও?"
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৫ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।এই পর্বটি নল ও দময়ন্তী ৫মটি ভাগে চলবে। এখন চলছে নল ও দময়ন্তীর ৩য় ভাগ।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
৩য় ভাগ। ২য় পর্বটি আগেই প্রকাশিত হয়েছে।
২য় পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নল-দময়ন্তী কথা: (২য় ভাগ) দেব-আশীর্বাদ ও সর্বনাশের বীজ
নল- দময়ন্তীর উপাখ্যান — অরণ্যযামিনী ও মহাপ্রস্থান-
এক দগ্ধ চিত্তের আখ্যান
বৃহদশ্ব কহিলেন, "ধর্মরাজ, সেই আদিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেদ করে নল ও দময়ন্তী হেঁটে চলছিলেন। দিনের পর দিন অন্নহীন, জলহীন অবস্থায় ক্লান্তি ও অবসাদ তাদের শরীরকে জীর্ণ করে দিচ্ছিল। কিন্তু নলের ক্ষতটা ছিল আরও গভীর, তা তাঁর অন্তরে। কলি তখন তাঁর চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। সেই অন্ধকার প্রভাব নলের মস্তকে এক ভয়ংকর কুটিল চিন্তার জন্ম দিল। তিনি ভাবলেন, এই যে দময়ন্তী, যিনি রাজসুখ ত্যাগ করে কোনো অভিযোগহীন চিত্তে তাঁর সমস্ত বিপর্যয় ভাগ করে নিয়েছেন, তাঁর কি এই নিয়তি প্রাপ্য? একজন রাজ্যহারা, কপর্দকহীন মানুষের পাশে থেকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করার জন্য তো তাঁর জন্ম হয়নি! নলের মনে হলো, দময়ন্তী যদি তাঁর এই অভিশপ্ত ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারেন, তবে হয়তো কোনো উপায়ে বিদর্ভে তাঁর পিতার প্রাসাদে ফিরে যেতে পারবেন। সেখানে অন্তত তাঁর নিরাপত্তা থাকবে, রাজকীয় মর্যাদা থাকবে।
কিন্তু এই কথাটি মুখের ওপর দময়ন্তীকে বলার সাধ্য নলের ছিল না। কারণ কলির কুটিল মন্ত্রণার নিচেও দময়ন্তীর প্রতি তাঁর চিরন্তন প্রেম তখনো ফল্গুধারার মতো বহমান। অথচ সেই আত্মঘাতী চিন্তা তাঁকে তিলে তিলে শেষ করছিল।
এক সন্ধ্যায়, বনের গহীনে এক জরাজীর্ণ কুটিরের সন্ধান পেলেন তাঁরা। অবসাদে ভেঙে পড়া দময়ন্তী স্বামীর চরণে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমে তলিয়ে গেলেন। কিন্তু নলের চোখে ঘুম কোথায়? সারারাত জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো সেই একই চিন্তা তাঁর মস্তিষ্ককে দগ্ধ করতে লাগল। অবশেষে, এক চরম দুর্বল ও বিবেকহীন মুহূর্তে, নল তাঁদের দুজনের একমাত্র আবরণ বস্ত্রখানি তরবারি দিয়ে অর্ধেক কেটে নিলেন। সেই খণ্ডাংশ নিজের দেহে জড়িয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। প্রেম আর কলির রোপণ করা কুযুক্তি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে নল পা বাড়ালেন, আবার থমকে দাঁড়ালেন, ফিরে তাকালেন ঘুমন্ত স্ত্রীর নিষ্পাপ মুখের দিকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। এক অন্তহীন গ্লানি বুকে নিয়ে, অন্ধকার অরণ্যের গভীরে মিলিয়ে গেলেন নিষধরাজ নল।"
একাকী জাগরণ ও দময়ন্তীর আর্তনাদ
"যখন দময়ন্তীর ঘুম ভাঙল, তখন অরণ্যের শিয়রে সূর্যদেব উদিত হয়েছেন। পাখির কলকাকলিতে মুখর চারিপাশ। কিন্তু পাশে হাত বাড়িয়েই দময়ন্তী অনুভব করলেন এক শূন্যতা। প্রথমে মৃদু স্বরে, তারপর এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি ডাকলেন, 'নাথ!' অরণ্যের গাছে গাছে আছড়ে পড়ল সেই আকুল আহ্বান। তিনি ভাবলেন, নল হয়তো কাছাকাছি কোথাও ফলমূল সংগ্রহ করতে গেছেন বা জলাশয় থেকে জল আনতে গেছেন। কিন্তু না, কোনো উত্তর এলো না। কেবল বনের উদাসীন হাওয়া তাঁর কান্নাকে উপহাস করতে লাগল।
ধীরে ধীরে সত্যের সেই নিষ্ঠুর রূপটি দময়ন্তীর সামনে উন্মোচিত হলো। যে মানুষটি দেবতাদের আহ্বান উপেক্ষা করে, ইন্দ্র-অগ্নি-বরুণ-যমকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে বরমাল্য ভূষিত করেছিলেন, সেই নল তাঁকে এই হিংস্র শ্বাপদসংকুল অরণ্যে একাকী ফেলে চলে গেছেন!
দময়ন্তী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ভাগ্যের এই নির্মম পরিহাসের বিরুদ্ধে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল, অথচ সেই চরম সর্বনাশের মুহূর্তেও তিনি স্বামীকে একটিবারের জন্যও অভিশাপ দিলেন না। অশ্রুসজল চোখে নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'তাঁর নিজের ইচ্ছায় তিনি আমাকে ফেলে যেতে পারেন না। নিশ্চয়ই কোনো মহাশক্তি বা মহাবিপদ তাঁর চেতনাকে গ্রাস করেছে।' তাঁর এই অনুমান মিথ্যা ছিল না, কিন্তু সেই মুহূর্তে তা দময়ন্তীকে কোনো শান্তি দিতে পারল না।
একাকী, নিরাশ্রয় অবস্থায় দময়ন্তী বনের পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। হে ধর্মরাজ, এক মরণপণ পরীক্ষা শুরু হলো তাঁর। এক বিশাল অজগর তাঁকে নিজের কুণ্ডলীতে আবদ্ধ করে পিষে মারার উপক্রম করতেই, এক ব্যাধ তাঁর আর্তনাদ শুনে ছুটে এলো এবং তলোয়ারের আঘাতে সর্পটিকে খণ্ডবিখণ্ড করে দময়ন্তীকে মুক্ত করল। কিন্তু দময়ন্তীর সেই মলিন, ধূলিধূসরিত রূপের মধ্যেও যে স্বর্গীয় লাবণ্য ছিল, তা দেখে সেই ব্যাধের মনে কামনার আগুন জ্বলে উঠল। সে যখন বলপূর্বক দময়ন্তীর সতীত্ব হরণের চেষ্টা করল, তখন দময়ন্তী তাঁর অন্তরের পবিত্রতা আর পতিভক্তির মহাশক্তিকে আবাহন করে ব্যাধকে শাপ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই পাপিষ্ঠ ব্যাধ বজ্রাহতের মতো ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণত্যাগ করল।
এত বড় বিপর্যয়ের পরেও দময়ন্তী আশা হারালেন না। বন্য ফলমূল আর গাছের মূল খেয়ে, যেখানে রাত কাটে সেখানে আশ্রয় নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। অবশেষে এক পর্বতের চূড়ায় উঠে দূর দিগন্তে তিনি লোকালয়ের ধোঁয়া দেখতে পেলেন। অবশিষ্টাংশ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে তিনি সেই দিকেই পা বাড়ালেন।"
বণিকদল, উন্মত্ত হস্তী ও চেদি রাজপ্রাসাদ
"পথের মাঝে প্রথমে এক সার্থবাহ বা বণিকদলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। জলাশয়ের পাশে বিশ্রামরত সেই বণিকেরা দময়ন্তীর ছিন্নবাস ও ধূলিমলিন রূপের আড়ালে তাঁর অভিজাত বংশীয় চ্যুতি লক্ষ্য করে দয়াশীল হলেন এবং তাঁকে নিজেদের সঙ্গে ভ্রমণের অনুমতি দিলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা তখনও শেষ হয়নি। সেই রাতেই একদল বুনো হাতি আচমকা উন্মত্তের মতো সেই শিবিরের ওপর আক্রমণ চালাল। ঘুমন্ত মানুষের ওপর দিয়ে চলে গেল হাতির দল। বহু মানুষ পিষ্ট হলো, চারদিকে হাহাকার আর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল।
দময়ন্তী অলৌকিকভাবে এই যাত্রায় বেঁচে গেলেন বটে, কিন্তু বেঁচে থাকাটাই তাঁর জন্য নতুন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়াল। অবশিষ্ট ক্ষুব্ধ ও শোকগ্রস্ত বণিকেরা ফিসফিস করতে লাগল যে, এই রহস্যময়ী নারীর আগমনের পর থেকেই তাদের এই সর্বনাশ হয়েছে। কেউ কেউ তাঁকে ডাইনি বা রাক্ষসী বলে দাগিয়ে দিল, কারণ এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও তিনি অক্ষত ছিলেন।
এই নির্মম অপবাদে দময়ন্তীর হৃদয় ভেঙে গেল। তিনি আবার একাকী পথ চলতে চলতে অবশেষে চেদি রাজ্যে এসে পৌঁছালেন। যখন তিনি চেদি রাজমাতার প্রাসাদের সিংহদ্বারে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর উস্কোখুস্কো চুল এবং মলিন বস্ত্র দেখে প্রহরীরা তাঁকে উন্মাদিনী ভেবে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অলিন্দ থেকে রাজমাতা স্বয়ং তাঁর রাজকীয় চলন ও অবয়ব লক্ষ্য করলেন। বাহ্যিক দৈন্যের আড়ালে এক সুউচ্চ বংশমর্যাদার আভাস পেয়ে রাজমাতা তাঁকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন।
রাজমাতা পরম স্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে তুমি কল্যাণী? কোন নিষ্ঠুর ভাগ্যের পরিহাসে তোমার মতো রূপবতী ও গুণবতী নারী আজ এই ভিখারিনীর বেশে?'
দময়ন্তী তখনও নিজের পরিচয় বা স্বামীর নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। তিনি কেবল বললেন, তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়ে ফেলেছেন এবং পথভ্রষ্ট হয়েছেন। তিনি রাজপ্রাসাদে দাসী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন, যতদিন না তাঁর স্বামীর সন্ধান মেলে। দময়ন্তীর এই সংযত ও অভিজাত ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে রাজমাতা তাঁকে নিজের কন্যার পরিচারিকা ও সখী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তবে দময়ন্তী একটি শর্ত চাইলেন—কোনো পুরুষ যেন কখনো তাঁর সম্মুখীন না হয় বা তাঁর দিকে কুদৃষ্টিতে না তাকায়। রাজমাতা সানন্দে সেই শর্ত মেনে নিলেন। দময়ন্তীও অন্তরালে থেকে পরম শান্তিতে তাঁর হারিয়ে যাওয়া নলের সন্ধান করতে লাগলেন।"
বৃহদশ্ব গল্প থামিয়ে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। ধর্মরাজের মুখমণ্ডল তখন গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন।
মহর্ষি বৃহদশ্ব স্মিতহাস্যে কহিলেন, "দেখলে তো ধর্মরাজ? এই সংসারে এমন শোকও আছে যার সামনে তোমার এই বনবাসের দুঃখ অত্যন্ত লঘু বলে মনে হবে। তবে শোনো, গল্প এখানেই শেষ নয়। নল সেই অরণ্যে একা কোন পথে গেলেন, আর কীভাবে এই বিচ্ছিন্ন দুই হৃদয় আবার এক হলো—তা কি তুমি শুনতে চাও?"
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৫ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।এই পর্বটি নল ও দময়ন্তী ৫মটি ভাগে চলবে। এখন চলছে নল ও দময়ন্তীর ৩য় ভাগ।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

Comments
Post a Comment