তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ
তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ।
অরণ্য এখন ওদের চেনা হয়ে গেছে। চেনা হয়ে গেছে বনের নিজস্ব ভাষা, তার নৈঃশব্দ্য, আর দিনের নানা প্রহরের ওঠানামা। রাজপ্রাসাদের জটিল কূটনীতি বোঝার জন্য যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োজন হতো, পাণ্ডবেরা এখন তা দিয়েই অরণ্যের গতিপ্রকৃতি পাঠ করতে শিখেছে। কোন পথটি নিরাপদ, কোন ঝরনার জল কাচের মতো স্বচ্ছ, আর আচমকা বৃষ্টি নামলে কোন গাছের আড়াল সবচেয়ে বিশ্বস্ত— সব এখন ওদের নখদর্পণে। বারো বছর কম সময় নয়। দীর্ঘ এই প্রবাস জীবন পাণ্ডবদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নিতে নিতে তাদের ভেতরের অহংকারটুকু শুষে নিয়ে সেখানে এক গভীর, ধূসর স্থৈর্য এনে দিয়েছে।
ঠিক এই রকমই এক যাযাবর দিনে, বনের প্রাচীন গাছপালার ছায়া ফুঁড়ে আবির্ভূত হলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। তিনি আসার আগেই চারপাশের বাতাসে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এলো। এক অমোঘ আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য যেন চাদরের মতো ঢেকে দিল গোটা বনভূমিকে।
তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস।
পাণ্ডবেরা কোনো দ্বিধা বা আনুষ্ঠানিকতার সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গেলেন। এক পরম শ্রদ্ধাবোধে তাদের শরীর ও মন আপনিই নুয়ে পড়ল। ব্যাসদেব তো কেবল একজন জটাজুটধারী তপোবনবাসী সন্ন্যাসী নন, তিনি বেদের সংকলক, স্বয়ং মহাভারতের রচয়িতা এবং কুরু-পাণ্ডবদের পিতামহ। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি মানব ও দেবতার সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি সময়কে কোনো একমুখী নদী হিসেবে দেখেন না, বরং দেখেন এক সুবিস্তৃত ভূখণ্ড হিসেবে, যা বহু ওপর থেকে এক নজরে প্রত্যক্ষ করা যায়।
পূর্ণ সমাদরে তাঁর পূজা করা হলো। বনের ফুল আর অর্ঘ্য দিয়ে অত্যন্ত যত্নে সাজানো হলো তাঁর আসন। ব্যাসদেব যখন বসলেন, তখন বোঝা গেল তাঁর এই রাজকীয় গরিমা বাইরের কোনো সিংহাসনের মুখাপেক্ষী নয়, তা সম্পূর্ণ তাঁর নিজের ভেতরেই নিহিত।
তিনি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। তাঁর সেই গভীরে চেয়ে থাকা চোখের দৃষ্টিতে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বোঝাপড়া।
"প্রিয় যুধিষ্ঠির," শান্ত গলায় বললেন ব্যাসদেব, "তোমার মনে কী চলছে আমি জানি। আমি এখানে দৈবাৎ আসিনি। আমি জানি কোন অন্ধকার তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, আর শাস্ত্র ও প্রজ্ঞার আলো দিয়ে সেই অন্ধকার দূর করতেই আমার এই আগমন।"
যুধিষ্ঠির কোনো উত্তর দিলেন না। দেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। ব্যাসদেব ঠিকই ধরেছেন।
"তুমি ভয় পাচ্ছ," কোনো রকম ভণিতা না করে, কোনো বিচার না শুনিয়ে ব্যাসদেব বললেন। "তোমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ, অশ্বত্থামা আর দুর্যোধনের মুখ। তুমি ভাবছ, এরা সবাই যখন একজোট হয়ে দাঁড়াবে, তখন পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষে কি এদের হারানো সম্ভব? যুধিষ্ঠির, এই ভয়টা কোনো বোকামি নয়। এক প্রবল পরাক্রান্ত বাস্তবকে বাস্তবসম্মতভাবে খতিয়ে দেখাই হলো এই ভয়। কিন্তু মনে রেখো, সংকটের গুরুত্ব অনুধাবন করা আর পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া— দুটো এক জিনিস নয়।"
তিনি একটু থামলেন। তারপর বললেন, "আমার কথা শোনো। আমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করো। আমি আজ তোমাকে যা দিতে এসেছি, তার পর এই ভয়ের কোনো অস্তিত্ব তোমার মনে থাকবে না।"
গোপন দীক্ষা এবং দ্বৈতবনের অবসান
ব্যাসদেব উঠে দাঁড়ালেন এবং ইশারায় যুধিষ্ঠিরকে বাকিদের থেকে একটু দূরে ডেকে নিলেন— ভীমের অস্থির পদচারণা, অর্জুনের তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি আর সমবেত ব্রাহ্মণদের কোলাহল থেকে দূরে বনের এক নিভৃত কোণে, যেখানে গাছের ডালপালা আকাশকে প্রায় আড়াল করে রেখেছে।
"যুধিষ্ঠির," ব্যাসদেব বললেন, "তুমি আমার শিষ্য। আমি আজ তোমাকে যা দিতে যাচ্ছি, তা একজন শিক্ষক তার পরম বিশ্বস্ত ছাত্রকে দেয়— কেবল জপ করে আনন্দ পাওয়ার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার জন্য।"
তিনি যুধিষ্ঠিরকে দিলেন এক পরম শক্তিশালী গুপ্তবিদ্যা— 'প্রতিস্মৃতি মহামন্ত্র'। এটি কোনো মারণাস্ত্র নয়, এর শক্তি রণকৌশলে নয়, এর শক্তি লুকিয়ে আছে আরও গভীরে। এ হলো মহাজাগতিক শক্তিকে এক আধার থেকে অন্য আধারে সঞ্চারিত করার এক অলৌকিক বিদ্যা।
"এই বিদ্যার শক্তি নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখার জন্য নয়," ব্যাসদেব স্পষ্ট করে দিলেন। "এ হলো অর্জুনের পাথেয়। তুমি এখন এটা আমার থেকে গ্রহণ করো এবং অর্জুনের মধ্যে সঞ্চারিত করে দাও। এই প্রতিস্মৃতি মন্ত্র ধারণ করলে অর্জুনের তেজ আজ যা আছে, তার থেকে বহুগুণ বেড়ে যাবে— যদিও মানুষের মধ্যে সে ইতিমধ্যেই অতুলনীয়।"
অর্জুনের প্রতি ব্যাসদেবের এই বিশ্বাসের মধ্যে কোনো অতিশয়োক্তি ছিল না।
"অর্জুন আসলে ‘নর’— যে কি না যুগ যুগ ধরে ‘নারায়ণ’-এর চিরন্তন সঙ্গী। সৃষ্টির আদিম নকশায় এই দুজনে অভিন্ন সুতোয় বাঁধা। কেউ তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। কিন্তু এমন মানুষকেও যদি আরও উচ্চে উঠতে হয়, তবে তাকে সঠিক উৎস থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে এবং কঠোর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।"
তিনি যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে চাইলেন, "তোমাকে এখন অর্জুনকে পাঠাতে হবে এক মহাযাত্রায়। যুদ্ধের জন্য নয়— এখনই নয়— জ্ঞানের অন্বেষণে। তাকে প্রথমে যেতে বলো দেবাদিদেব শংকরের কাছে। তারপর স্বর্গের রাজা ইন্দ্র, বরুণ, কুবের এবং স্বয়ং ধর্মরাজের কাছে। অত্যন্ত কঠোর তপস্যা আর একাগ্রতা নিয়ে সে যেন তাদের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধবিদ্যা মানে কেবল তরবারি চালানো বা তির ছোঁড়া নয়, অস্ত্রের পেছনে যে মহাজাগতিক নিয়ম কাজ করে, সেই ঐশ্বরিক বিজ্ঞান তাকে শিখতে হবে।"
কথাগুলো যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে থিতু হওয়ার জন্য ব্যাসদেব খানিকটা সময় নিলেন। তারপর বললেন, "অর্জুন যখন এই জ্ঞান অর্জন করে ফিরে আসবে, সে তখন কেবল একজন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর থাকবে না, সে এমন কিছুতে রূপান্তরিত হবে যা এই পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। আর সে যা নিয়ে ফিরবে, তা দিয়েই কৌরবদের ছিনিয়ে নেওয়া সাম্রাজ্য তোমরা উদ্ধার করতে পারবে।"
এরপর অত্যন্ত বাস্তববাদী মানুষের মতো ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে অন্য একটি পরামর্শ দিলেন, "তোমাদের এবার এই জায়গাটা বদলাতে হবে। নির্বাসনের এই দীর্ঘ দিনগুলোতে এক জায়গায় বেশিদিন স্থবির হয়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তা ক্রমশ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। অরণ্যের আরও গভীরে যাও। প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করো। বনবাসীর জীবন কোনো এক জায়গায় থমকে থাকার জীবন নয়।"
বলার সমস্ত কথা শেষ করে ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে সম্পূর্ণ বিধি মেনে 'প্রতিস্মৃতি' মন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। শব্দের উচ্চারণ, মনের একাগ্রতা এবং তা হস্তান্তরের নিয়ম বুঝিয়ে দিয়ে, নিজের কাজ শেষ হওয়া মাত্রই তিনি অরণ্যের কুয়াশায় মিলিয়ে গেলেন।
যুধিষ্ঠির একা বসে রইলেন। তাঁর মনের ভেতরের শূন্যতা এতক্ষণে এক গভীর গরিমায় ভরে উঠেছে। একটা বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে তাঁর মধ্যে। এতদিনের দুশ্চিন্তার যে ভারী পাথরটা বুকে চেপে ছিল, তার ওজনটা যেন বদলে গেছে। এ এক নতুন দায়িত্বের ভার, যার একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে।
তিনি মনে মনে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন। ব্যাসদেবের শেখানো পথ ধরে মনটাকে একাগ্র করার চেষ্টা করতেই তাঁর বুকের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা জটটা আলগা হতে শুরু করল। বহু বছর পর তাঁর বিষণ্ণ মুখে এক চিলতে প্রশান্তি, এক মৃদু আনন্দের আভা দেখা দিল। এ কোনো লঘু চপল আনন্দ নয়, এ হলো এক ঘোর অন্ধকারের গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে পাওয়া এক যাত্রীর শান্ত স্বস্তি।
পাণ্ডবেরা দ্বৈতবন ত্যাগ করলেন।
তারা পথ চলতে চলতে এসে পৌঁছালেন কাম্যক বনে, সরস্বতী নদীর তীরে। সেই প্রাচীন নদীর জলধারা এক ধীর, অবিচল নিশ্চিত্ততায় বয়ে চলেছে। জায়গাটা চমৎকার— কেমন যেন এক মায়াবী আশ্রয়, যা মানুষকে শুধু সহ্য করে না, বরং সাদরে বরণ করে নেয়। গাছের পাতা চিরে আসা আলো আর বাতাসের আর্দ্রতাই বলে দিচ্ছিল, এই মাটি চিরকালই কোনো এক পবিত্রতার সাক্ষী।
তপোবনবাসী যে সমস্ত জ্ঞানী ব্রাহ্মণেরা নির্বাসনের প্রথম দিন থেকে পাণ্ডবদের সঙ্গী হয়েছিলেন, তাঁরা এই যাত্রাতেও তাঁদের অনুগমন করলেন। এই পণ্ডিত মানুষেরা চাইলে অনায়াসে শহরের বিলাসবহুল জীবন বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু তাঁরা স্বেচ্ছায় বনের কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতি পাণ্ডবদের পক্ষে এক বিরাট মানসিক বল ছিল। সন্ধ্যার পর যজ্ঞের মন্ত্রোচ্চারণ, ধর্ম আর শাস্ত্রের সূক্ষ্ম আলোচনা যুধিষ্ঠিরদের প্রতিদিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিত।
নদী আপন মনে বয়ে চলল মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে, যেভাবে নদী চিরকাল বয়। আর যুধিষ্ঠির তাঁর বুকের গভীরে আগলে রাখলেন সেই ‘প্রতিস্মৃতি’ মন্ত্র, ঠিক যেমন কেউ দুই হাতের তালু দিয়ে আড়াল করে বাঁচিয়ে রাখে প্রদীপের সলতেটিকে— শুধু অপেক্ষা, কখন তিনি এটি তাঁর অনুজের হাতে তুলে দেবেন।
জ্যেষ্ঠের আদেশ এবং এক নারীর নীরব প্রার্থনা
একদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। যুধিষ্ঠির অর্জুনকে নির্জনে ডেকে পাঠালেন। অর্জুনের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "অর্জুন, ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ আর অশ্বত্থামার মতো মহারথীরা অস্ত্রবিদ্যায় পারঙ্গম। দুর্যোধন আজ ক্ষমতার জোরে তাদের সবাইকে নিজের বশ করেছে। এই ঘোর সংকটে আমাদের একমাত্র ভরসা এখন তুমি। মহর্ষি ব্যাসদেব আমাকে যে পরম গুপ্তবিদ্যা শিখিয়েছিলেন, আজ আমি তোমাকে সেই ‘প্রতিস্মৃতি’ মন্ত্রে দীক্ষিত করব। অত্যন্ত একাগ্র মনে এই মন্ত্র গ্রহণ করো এবং ঈশ্বরের কৃপায় তা নিজের মধ্যে ধারণ করো।"
যুধিষ্ঠির অর্জুনের কাঁধে হাত রাখলেন, "তবে মনে রেখো অর্জুন, এই বিদ্যার পূর্ণ বিকাশের জন্য তোমাকে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে। আজই তুমি তোমার গাণ্ডীব, অক্ষয় তূণীর আর খড়্গ নিয়ে উত্তর দিকে যাত্রা করো। একজন কঠোর সাধকের মতো তোমাকে তপশ্চর্যা করতে হবে। অতীতে যখন বৃত্তাসুরের ভয়ে দেবতারা ভীত হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁরা তাঁদের সমস্ত দিব্য অস্ত্র দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। সেই সব অস্ত্র আজও ইন্দ্রেরই জিম্মায় আছে। তুমি উত্তর অভিমুখে গিয়ে তপস্যায় দেবরাজকে সন্তুষ্ট করো। তিনি প্রসন্ন হলে সমস্ত অস্ত্র এবং তা ব্যবহারের নিগূঢ় রহস্য তোমাকে দান করবেন।"
শাস্ত্রীয় সমস্ত নিয়ম মেনে যুধিষ্ঠির তাঁর প্রিয় অনুজকে দীক্ষিত করলেন এবং ইন্দ্রলোকে যাওয়ার আদেশ দিলেন। অর্জুন মাথা নিচু করে সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন এবং নিজের অস্ত্রসমূহ গুছিয়ে নিয়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে এসে দাঁড়ালেন দ্রৌপদী। যাজ্ঞসেনীর চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত আগুন, যা একই সঙ্গে বেদনার এবং প্রতিশোধের।
অর্জুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দ্রৌপদী বললেন, "হে আমার বীর স্বামী! সেই ভরা রাজসভায় পাপিষ্ঠ দুর্যোধন আমাকে যে জঘন্য ভাষায় অপমান করেছিল, দুঃশাসন যেভাবে আমার চুল ধরে টেনেছিল, সেই অপমান আমি ভুলিনি। সাময়িকভাবে আমি ভেঙে পড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি জানি, আমার চেয়েও তোমার পুরুষাভিমান অনেক বেশি রক্তাক্ত হয়েছিল। আমাদের রাজ্য, আমাদের সম্মান, আমাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব— সবই আজ তোমার এই গাণ্ডীবের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। আমি তোমাকে নিরুৎসাহিত করব না, অর্জুন। আমি সমস্ত দেবতার কাছে তোমার মঙ্গল প্রার্থনা করছি। তুমি বিজয়ী হয়ে ফিরে এসো।"
দ্রৌপদীর সেই চোখের জল আর ভেতরের গনগনে আগুনকে বুকে পাথেয় করে অর্জুন পা বাড়ালেন উত্তরের দিকে।
গন্ধমাদনের ছায়ায় দেবরাজের পরীক্ষা
সমগ্র রজনী হেঁটে, চড়াই-উতরাই পার হয়ে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গন্ধমাদন পর্বত অতিক্রম করলেন অর্জুন। চারপাশ অলৌকিক নিস্তব্ধ। ঠিক তখনই সেই নির্জন উপত্যকায় এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো— "তিষ্ঠ!" (থামো!)
অর্জুন চমকে তাকিয়ে দেখলেন, একটি বিশাল গাছের নিচে এক জরাজীর্ণ, কৃশতনু জটাজুটধারী সন্ন্যাসী বসে আছেন। তাঁর শরীরটি উপবাসে শীর্ণ হলেও চোখ দুটো থেকে যেন এক প্রখর, অতিপ্রাকৃতিক তেজ বেরোচ্ছে।
সেই সন্ন্যাসী অর্জুনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "কে তুমি যুবক? এই শান্ত, নিভৃত তপোবনে এত মারণাস্ত্র নিয়ে কেন এসেছ? এখানে শান্ত সমাহিত ঋষিরা বাস করেন। এখানে কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো শত্রু নেই, কোনো রক্তপাত নেই। তোমার এই ধনু-বাণ এখানে অর্থহীন। বিসর্জন দাও তোমার অস্ত্র।"
সন্ন্যাসী কথাগুলো বললেন অত্যন্ত কোমল হাসিতে, কিন্তু অর্জুন এক পা-ও নড়লেন না। তাঁর হাতের মুঠো গাণ্ডীবের ওপর আরও শক্ত হলো, চোখের দৃষ্টি স্থির রইল সন্ন্যাসীর চোখের ওপর। অর্জুনের এই অবিচল নিষ্ঠা আর দৃঢ়তা দেখে সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। এক অলৌকিক আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত করে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ঝেড়ে ফেলে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র।
ইন্দ্র হেসে বললেন, "অর্জুন, আমি তোমার একাগ্রতায় অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। আমিই ইন্দ্র। বলো, কী বর চাও তুমি আমার কাছে?"
অর্জুন হাত জোড় করে বিনীত কিন্তু মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন, "দেবরাজ, আমি আপনার কাছে সমস্ত দিব্য অস্ত্রের জ্ঞান প্রার্থনা করছি। আপনি আমাকে সেই শিক্ষা দান করুন।"
ইন্দ্র অর্জুনের দিকে চেয়ে বললেন, "এই ভয়ানক মারণাস্ত্রের শিক্ষা নিয়ে তুমি কী করবে, মহাবীর? তার চেয়ে তুমি আমার কাছে স্বর্গের বিপুল ঐশ্বর্য, অক্ষয় সুখ আর পরম শান্তি চেয়ে নাও না কেন?"
অর্জুন মাথা নাড়লেন। তাঁর গলায় এক গভীর প্রত্যয়, "দেবরাজ, আমার ভাই ও দ্রৌপদী আজ অরণ্যে ধুলোয় বসে কষ্ট পাচ্ছে। তাদের এই নরকযন্ত্রণা ও অপমানের মধ্যে ফেলে রেখে আমি একা স্বর্গের সুখ, ঐশ্বর্য বা ভোগবিলাস গ্রহণ করতে পারি না। আমি কেবল অস্ত্রের সেই পরম জ্ঞান নিয়ে আমার ভাইদের কাছে ফিরে যেতে চাই।"
ইন্দ্র অর্জুনের পিঠে হাত রেখে স্নেহের সুরে বললেন, "ধন্য তুমি অর্জুন। তোমার লক্ষ্য স্থির। তবে এই অস্ত্র পাওয়ার আগে তোমাকে আরও এক কঠিন পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হবে। তুমি আগে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা করো। হিমালয়ের শিখরে গিয়ে তাঁর জন্য সাধনায় বসো। যেদিন পরমেশ্বর শিব তোমাকে দর্শন দেবেন, সেদিনই তুমি স্বর্গে আসার যোগ্যতা অর্জন করবে, আর আমিও তোমাকে আমার সমস্ত দিব্য অস্ত্র হস্তান্তর করব।"
কথাটি শেষ হওয়া মাত্রই দেবরাজ ইন্দ্র অলৌকিক উপায়ে শূন্যে মিলিয়ে গেলেন। আর অর্জুন, হিমালয়ের সেই কনকনে ঠান্ডায়, গাণ্ডীব পাশে রেখে, মহাদেবের ধ্যানে মগ্ন হলেন। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের পটভূমি যেন এই অরণ্যের নীরবতাতেই একটু একটু করে রচিত হতে লাগল।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের একাদশ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
Go to all publications for full reading as per index

Comments
Post a Comment