কাম্যকে মহাসমাবেশ — কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনের কথোপকথন

কাম্যকে মহাসমাবেশ — কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনের কথোপকথন

সংবাদের অভিঘাত

পতন যখন ঘটে, তখন তার প্রতিধ্বনি চারপাশের বাতাসকে চাবুক মেরে সজাগ করে তোলে। রাজন্যবর্গের উত্থান-পতনের ইতিহাস বড় নির্মম। কুরুসভার সেই কলঙ্কিত দ্যুতক্রীড়া, সর্বস্ব হরণের পাশবিক উল্লাস, আর ভরা রাজসভায় দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ করে টেনে আনার সেই আদিম, নৃশংস দৃশ্য— কোনো কিছুই গোপন থাকেনি। বাতাসের পিঠে চড়ে সেই অপমানের কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল আর্যাবর্তের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি রাজকক্ষে। কিন্তু যখন শোনা গেল, পঞ্চপাণ্ডব এখন কাম্যক বনের অখ্যাত বৃক্ষচ্ছায়ায় মৃগচর্ম পরিধান করে, জটাবদ্ধ চুলে দিন কাটাচ্ছেন— তখন ভারতর্ষের মানুষের শোক নিমেষেই পরিণত হলো এক তীব্র, জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ ক্রোধে।

যাদবদের বিখ্যাত বংশগুলো— বৃষ্ণি, অন্ধক আর ভোজ— তাদের বীরেরা আর স্থির থাকতে পারলেন না। দলে দলে যুবরাজ আর প্রধানেরা নিজেদের চতুরঙ্গ সেনা ও অনুচরদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন কাম্যকের উদ্দেশ্যে। পাঞ্চাল থেকে এলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রৌপদীর সহোদর। যিনি যজ্ঞাগ্নি থেকে জন্ম নিয়েছিলেন কেবল এক মহৎ প্রতিশোধের ব্রত বুকে নিয়ে, আজ তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন এক অভাবনীয়, আরও তীব্রতর অপমানের মুখোমুখি। চেদিরাজ্য থেকে এলেন ধৃষ্টকেতু। উত্তর-পশ্চিমের সীমানা পেরিয়ে ছুটে এলেন কেকয় রাজপুত্রেরা, যাঁদের ধমনীতে বইছে পাণ্ডবদের রক্তের টান আর আনুগত্য। নানা দিক থেকে, বহু দূর-দূরান্তের পথ পেরিয়ে তাঁরা এসে পৌঁছালেন কাম্যক বনের এক নিভৃত প্রান্তরে। তাঁদের প্রত্যেকের চোখে-মুখে ছিল এক অদ্ভুত, কঠোর কাঠিন্য— যে চাউনি শুধু সেইসব পুরুষদের মুখেই দেখা যায়, যাঁরা মনে মনে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য অধীর হয়ে উঠেছেন।

আর তাঁদেরই অগ্রভাগে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।

সমবেত ক্ষত্রিয় রাজন্যবর্গ একে অপরের দিকে তাকালেন। তাঁরা মেপে নিলেন তাঁদের সম্মিলিত বাহুবল, মিত্রতার পরিধি আর কৌরবদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠা সেই বিস্ফোরক ক্রোধকে। কোনো দীর্ঘ আলোচনা কিংবা দ্বিধার অবকাশ রইল না; সবাই একবাক্যে কৃষ্ণকেই বেছে নিলেন তাঁদের মুখপাত্র হিসেবে। এ কোনো কঠিন নির্বাচন ছিল না, বলা ভালো, এর কোনো বিকল্পই কারোর জানা ছিল না।

### যুধিষ্ঠিরের প্রতি কৃষ্ণের বজ্রনির্ঘোষ

কৃষ্ণ ধীর পায়ে যুধিষ্ঠিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর সেই চিরাচরিত স্মিতহাস্য বা লঘু প্রীতিসম্ভাষণের কোনো লক্ষণ ছিল না আজ। তাঁর আননে লেগেছিল এক গভীর বিষাদের ছায়া, যা তিনি কোনো লৌকিক শিষ্টাচার বা রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার আবরণে আড়াল করার চেষ্টামাত্র করলেন না। তিনি তাকালেন যুধিষ্ঠিরের দিকে— যে মানুষটি একদিন ইন্দ্রপ্রস্থের ময়ূরসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যাঁর রাজসূয় যজ্ঞে পৃথিবীর তাবৎ সম্রাট মাথা নত করেছিলেন, আজ তাঁর এই দীন দশা দেখে কৃষ্ণের বুকের ভেতর থেকে এক তীব্র, অবরুদ্ধ আর্তি ও ক্রোধ ঠিকরে বেরোলো।

কৃষ্ণ বললেন, "মহারাজ, আপনার ও আপনার পরিবারের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা এই বিশ্বচরাচরের অস্তিত্বের মূলে এক চরম কুঠারাঘাত। ধর্ম কেবল মন্দিরে বসে আবৃত্তি করার কোনো শুষ্ক শ্লোক নয়— তা হলো এই জগতের ভারসাম্য রক্ষার এক জীবন্ত নিয়ম। দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি আর দুঃশাসন সেই রাজসভায় দাঁড়িয়ে যা করেছে, তা আসলে সেই শাশ্বত নিয়মের টুঁটি চেপে ধরা। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে পুণ্যবান মানুষ যে ঐতিহ্য মেনে আসছেন, তা অত্যন্ত স্পষ্ট— যাঁরা ছলনা আর প্রবঞ্চনার মাধ্যমে এই পৃথিবীকে ভোগ করতে চায়, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার তাঁদের নেই। তাঁদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক চলে না। তাঁদের সংশোধন করা অসম্ভব। তাঁদের একমাত্র নিয়তি বিনাশ।"

তিনি একটু থামলেন। যখন পুনরায় বলতে শুরু করলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ল এক অমোঘ, অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্তের সুর। "আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমস্ত বীর, এই সমস্ত মিত্ররাজ— আমরা প্রত্যেকেই প্রস্তুত। আমরা আজই কৌরব ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে পারি। রণক্ষেত্রে তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই অন্যায়ের শেষ দেখে ছাড়ব। আর সেই ধ্বংসলীলা শেষ হলে, আমি নিজের হাতে আপনাকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসাব। কারণ সেটাই আপনার অধিকার, সেটাই আপনার ভবিতব্য।"

কৃষ্ণের কথা শেষ হলে কাম্যক বন এক থমথমে নীরবতায় ডুবে গেল। সমবেত রাজন্যবর্গ ও যোদ্ধারা স্তব্ধ হয়ে রইলেন। প্রস্তাবটা ছিল স্পষ্ট এবং তার পেছনের শক্তিটাও ছিল অমোঘ, বাস্তব।

অর্জুনের স্তুতি ও আত্মোপলব্ধি

ঠিক সেই মুহূর্তে নীরবতা ভেঙে কথা বলে উঠলেন অর্জুন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে কোনো রণক্লান্ত যোদ্ধার রণকৌশল বা লাভক্ষতির হিসাব ছিল না। তিনি কথা বললেন এমন এক মানুষের মতো, যিনি এই ক্রোধের উত্তাপের ওপারে দাঁড়িয়ে এক পরম সত্যকে চিনে নিয়েছেন— যিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁদের সামনে আসলে কে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং এই ক্ষণে তাঁর উপস্থিতির গূঢ় অর্থ কী।

তিনি কৃষ্ণের চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল একাধারে শান্ত এবং গভীর মমতায় পূর্ণ।

"শ্রীকৃষ্ণ," অর্জুন বলতে লাগলেন, "তুমিই তো এই জগতের সমস্ত জীবন্ত আত্মার অন্তর্যামী। এই পৃথিবীতে যা কিছু শ্বাস নেয়, যা কিছু চলমান, তার সবকিছুর জন্ম তোমারই ভেতরে। আবার দিনশেষে, প্রতিটি সৃষ্টি তোমার বুকেই লীন হয়ে যায়। যুগের পর যুগ ধরে ঋষি-মুনিরা যে কঠোর তপস্যা, ত্যাগ আর কৃচ্ছ্রসাধন করেছেন— তার সমস্ত অর্ঘ্য নদীর মতো এসে মিশেছে তোমারই চরণে। তুমিই নিত্যদিনের যজ্ঞ, তুমিই পরম অন্বেষণ।"

অর্জুন বলতে লাগলেন, তাঁর কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, যেন বহুদিনের লালিত কোনো সত্যকে তিনি আজ শব্দে রূপ দিচ্ছেন।

"তুমিই সেই উদ্ধত ভৌমাস্থরকে বধ করে ইন্দ্রের মণি-কুণ্ডল ফিরিয়ে দিয়েছিলে। এই চরাচরকে বিপন্নতা থেকে উদ্ধার করার জন্য তুমি মানুষের রূপ পরিগ্রহ করেছ— কারণ এই পৃথিবীর তোমাকে প্রয়োজন ছিল। তুমি আমাদের মাঝে হেঁটে বেড়িয়েছ নারায়ণ হিসেবে, হরি হিসেবে, যিনি সৃষ্টিকে ধারণ করে রাখেন। ব্রাহ্মণরা যাকে 'ব্রহ্ম' বলে ডাকেন, তা আসলে তুমিই। সোম, সূর্য, ধর্ম, ধাতা, যম, অগ্নি— সবকিছুর মাঝেই তুমি বিরাজমান। তুমিই বায়ু, তুমিই কুবের, তুমিই রুদ্র এবং তুমিই স্বয়ং মহাকাল। মাথার ওপরের এই অনন্ত আকাশ আর পায়ের নিচের এই ধরিত্রী— যা কিছু স্থাবর-জঙ্গম, তার একমাত্র পথপ্রদর্শক তুমি।"

অর্জুনের কণ্ঠ বিন্দুমাত্র কাঁপল না। "তুমিই সেই পরম পুরুষ— এই ব্রহ্মাণ্ডের অজন্ম স্রষ্টা— অথচ তুমি আমাদের মাঝে এসেছ। অদিতির গর্ভে বিষ্ণু রূপে জন্ম নিয়ে তুমি তিন ভুবন জয় করেছিলে। সূর্যকে তার আলো ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছ তুমিই। যুগে যুগে, কত না রূপে তুমি অবতীর্ণ হয়েছ এই ধরণীতে, আর প্রতিবার ধ্বংস করেছ সেইসব আসুরিক শক্তিকে, যা এই জগতকে ছিন্নভিন্ন করতে চেয়েছিল। আর আজ দ্বারকায়— তোমার সেই পরম প্রিয়, সমৃদ্ধ মানুষদের মাঝে তুমি তোমার লীলা বিস্তার করেছ, অথচ তুমি ভালো করেই জানো, একদিন এই দ্বারকাও সমুদ্রের গহ্বরে তলিয়ে যাবে, যেমনভাবে সমস্ত সৃষ্টি একদিন তোমার মাঝেই ফিরে আসে।"

ক্ষণিকের জন্য থামলেন অর্জুন। তারপর যখন বলতে শুরু করলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে আধ্যাত্মিকতার চেয়েও বেশি প্রকট হয়ে উঠল এক নিবিড় সখ্য— এক পরম বন্ধুর প্রতি আরেক বন্ধুর অন্তরের অকপট স্বীকারোক্তি।

"মানুষকে বেঁধে রাখা কোনো বন্ধন বা সীমাবদ্ধতা তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। ক্রোধ তোমাকে শাসন করতে পারে না, ঈর্ষা তোমার কাছে এসে পথ হারায়। দ্বেষ, ছলনা, নিষ্ঠুরতা— কোনো কালো ছায়াই তোমার ওপর দাগ কাটতে পারে না। সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ সাধকেরা তোমার এই জ্যোতিকে তাঁদের হৃদয়ের মণিকোঠায় পরম রত্ন হিসেবে আগলে রেখেছেন এবং তাঁদের মুক্তির শেষ আশ্রয় হিসেবে তোমার চরণে সমর্পণ করেছেন নিজেকে। শৈশবে ও কৈশোরে বলরামের সঙ্গে মিলে তুমি যে সব অলৌকিক কীর্তি স্থাপন করেছ, তা আজ মুখে মুখে শুনলেও বিশ্বাস করা কঠিন হয়, আর আগামী যুগের মানুষ তা কল্পনাও করতে পারবে না।"

অর্জুন থামলেন। যা বলার ছিল, তা বলা হয়ে গেছে।

### কৃষ্ণের অমোঘ প্রতিজ্ঞা

কৃষ্ণ কিছুক্ষণ নিস্পৃহ নয়নে তাকিয়ে রইলেন অর্জুনের দিকে। তারপর যখন কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠ ছিল অনুচ্চ, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়। সেই স্বরে কোনো শাস্ত্রের জটিলতা ছিল না, ছিল কেবল দুটি হৃদয়ের এমন এক আদিম উষ্ণতা, যা প্রকাশের জন্য কোনো ভাষা আজও আবিষ্কৃত হয়নি।

"অর্জুন," কৃষ্ণ বললেন, "তুমি আমার, আর আমি তোমার। এর চেয়ে বড় আর কোনো সত্য হতে পারে না। আমার যা কিছু, তার সবটাই তোমার, আর তোমার যা কিছু, তা একান্তই আমার। আমাদের মাঝে কোনো বিভাজন নেই। যে হাত তোমার দিকে উঠবে, তা আসলে আমার দিকেই উঠবে— আমি আমাদের মধ্যে কোনো তফাত করি না। যে তোমাকে ভালোবাসে, সে যেন আমাকেই ভালোবাসল।"

তিনি অর্জুনের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে রইলেন। "তুমি নর, আর আমি নারায়ণ। আমরা এই মানবকুলে একসঙ্গে আবির্ণ হয়েছি এক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, যেমনটা আমরা আগেও বহুবার করেছি। তুমি আমার থেকে ভিন্ন নও, আমিও তোমার থেকে আলাদা নই। এ কোনো আবেগ বা অলংকারিক কথা নয় অর্জুন, এটাই একমাত্র বাস্তব।"

কাম্যক বনের সেই নিভৃত ছায়ায় সমবেত রাজন্যবর্গ আর বীর যোদ্ধারা এই কথোপকথন শুনলেন। তাঁরা শুনলেন যুদ্ধের আহ্বান, ঈশ্বরের মহিমা আর দুই পরম আত্মার অবিনশ্বর বন্ধনের সেই শান্ত ঘোষণা। তাঁরা বুঝতে পারলেন, তাঁরা এমন এক মহাজাগতিক ক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে চেনা ইতিহাস স্তব্ধ হয়ে এক নতুন যুগের দিকে বাঁক নিতে চলেছে।

পাণ্ডবদের নির্বাসন তখনও শেষ হয়নি। দীর্ঘ তেরোটি বছর পার হওয়া বাকি। প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে হবে, কারণ ধর্মের দাবি সেটাই। কিন্তু সেই অরণ্যের আলো-ছায়ার মাঝে একটা কিছু চিরতরে বদলে গেল, ঠিক যেমন মেঘের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে এলে মুহূর্তেই চরাচরের রূপ বদলে যায়। যে মহাবিনাশী প্রতিশোধের দিনটি আসছিল, তা যেন আজ পূর্ণ অবয়ব ধারণ করল।

এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের সপ্তম পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।


Go to all publications for full reading as per index

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া