অষ্টাদশ বনপর্ব-দেবরাজের বার্তা ও এক পুণ্যযাত্রার সূচনা

 


অষ্টাদশ বনপর্ব-দেবরাজের বার্তা ও এক পুণ্যযাত্রার সূচনা

কাম্যক বনের সেই নিভৃত কুটিরের সামনে তখন অপরাহ্ণের ম্লান আলো। পুরোহিত ধৌম্য পাণ্ডবদের সামনে বসে অতি প্রাচীন এক একটি পুণ্যতীর্থের মহিমা বর্ণনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বনের পত্রপল্লব ভেদ করে সেখানে আবির্ভূত হলেন মহর্ষি লোমশ। তাঁর জটাজাল আর শান্ত চোখের দৃষ্টিতে এক অলৌকিক সমাহিত ভাব। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুনহীন অর্জুনের যমজ অনুজদ্বয় আর কৃষ্ণবর্ণা দ্রৌপদী—সকলেই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন। শাস্ত্রীয় বিধি মেনে, পরম শ্রদ্ধায় তাঁরা বরণ করে নিলেন এই দেবোপম অতিথিকে।

যুধিষ্ঠির বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহর্ষি, আপনার এই আকস্মিক আগমন আমাদের ধন্য করেছে। বলুন, কী অভিপ্রায়ে আজ এই গভীর বনে আপনার পদার্পণ?"

লোমশ মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে যেন স্বর্গীয় সুধার স্পর্শ। তিনি বললেন, "হে ধর্মরাজ, আমি তো মুক্ত পরিব্রাজক, কোনো বন্ধন আমাকে বেঁধে রাখে না। কিন্তু আজ আমি এসেছি এক বিশেষ সংবাদ নিয়ে। কিছুদিন আগেই আমি গিয়েছিলাম ইন্দ্রালয়ে। সেখানে যা দেখলাম, তা একাধারে বিস্ময়কর এবং আনন্দের। দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে পরম গৌরবে বসে আছেন তোমার অনুজ অর্জুন! স্বয়ং সুরপতি আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'দেবর্ষি, আপনি মর্ত্যের কাম্যক বনে যান। সেখানে পাণ্ডবরা ব্যাকুল হয়ে অর্জুনের প্রতীক্ষা করছে। আমার রাজ্যে অর্জুন কেমন আছে, সে সংবাদ তাদের দিন।' আমি সেই বার্তা বহন করেই আজ তোমাদের কাছে এসেছি।"

পাণ্ডবদের চোখে তখন উৎকণ্ঠা আর আনন্দের মিশ্র আভা। লোমশ বলতে লাগলেন, "তোমাদের ইচ্ছানুসারেই অর্জুন স্বর্গে গিয়ে দেবরাজকে সন্তুষ্ট করেছে এবং সমস্ত দিব্যাস্ত্রের সন্ধান পেয়েছে। স্বয়ং মহাদেব শিবের কাছ থেকে সে লাভ করেছে মহাশক্তিশালী পাশুপত অস্ত্র। শুধু অস্ত্র অর্জন নয়, তার প্রয়োগ, সংহার এবং কোনো নিরপরাধের প্রাণহানি হলে তার প্রায়শ্চিত্তের বিধান—সবই সে আয়ত্ত করেছে। এছাড়া যম, কুবের, বরুণ এবং ইন্দ্রও তাকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসমূহ দান করেছেন। গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে অর্জুন শিখেছে স্বর্গীয় নৃত্য ও সঙ্গীত। এখন সে অমরাবতীতে পরম সুখে দিন কাটাচ্ছে।"

মহর্ষি একটু থেমে যুধিষ্ঠিরের মুখের দিকে চাইলেন, "তবে ইন্দ্র একটি বিশেষ কথা বলে দিয়েছেন। স্বর্গের দেবতাদের এক পরম শত্রু আছে—নিবাতকবচ নামক দানবদল। দেবতারাও যাদের পরাস্ত করতে পারেনি, অর্জুনকে সেই অসুর বধের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই কাজ শেষ হলেই সে আবার তোমাদের কোলে ফিরে আসবে। ততদিন পর্যন্ত দেবরাজের পরামর্শ—তোমরা ব্রত ও তপস্যায় মনোনিবেশ করো। তপস্যার চেয়ে বড় বল আর কিছু নেই। আমি অর্জুন ও কর্ণ—উভয়কেই চিনি। স্পষ্টই বলছি, শৌর্য ও বীরত্বে অর্জুন কর্ণের চেয়ে বহু উচ্চে অবস্থান করে। আর হ্যাঁ, তোমরা যে তীর্থযাত্রার কথা ভাবছিলে, সে বিষয়েও সাহায্য করতে আমার এই আগমন।"

অর্জুনের এই অভাবনীয় সাফল্যের কথা শুনে যুধিষ্ঠিরের চোখ দুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল। লোমশ পুনরায় বললেন, "যুধিষ্ঠির, স্বর্গে অর্জুন তোমার কথাই বলছিল। সে বলল, তুমি ধর্মের অবতার, রাজা ও সাধারণ মানুষের কর্তব্য তোমার নখদর্পণে। তোমার ছত্রছায়ায় থেকে অনুজরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হচ্ছে। অর্জুনের অনুরোধেই আমি তোমাদের এই তীর্থযাত্রার পথপ্রদর্শক হতে চাই। এর আগে জীবনে দুবার আমি সমগ্র ভারতভূমি পরিক্রমা করেছি, এবার হবে আমার তৃতীয়বার। তোমার মতো সত্যনিষ্ঠ রাজা এই পুণ্যযাত্রার মাধ্যমে সমস্ত মানসিক গ্লানি থেকে মুক্ত হবে, যেমনটা অতীতে হয়েছিলেন রাজা ভগীরথ, গয় ও যযাতি।"

যুধিষ্ঠির গদগদ কণ্ঠে বললেন, "হে মহর্ষি, আপনার মুখে এই সংবাদ শুনে আমার হৃদয় জুড়িয়ে গেল। দেবরাজ যে আমাদের মতো বনবাসীদের মনে রেখেছেন, এটাই আমাদের পরম ভাগ্য। ধৌম্যের মুখে পুণ্যক্ষেত্রের কথা শুনে আমি মনে মনে যে সংকল্প করছিলাম, আপনার আগমনে তা পূর্ণতার পথ পেল। চলুন, আমরা এখনই এই যাত্রার প্রস্তুতি নিই।"

কাম্যক বনে আর মাত্র তিনটি রাত্রি যাপন করলেন পাণ্ডবরা। এই পুণ্যযাত্রার খবর ছড়িয়ে পড়ল চারপাশের আশ্রমের ব্রাহ্মণদের মধ্যে। প্রভাস তীর্থ, মহেন্দ্র পর্বত, পুণ্যতোয়া গঙ্গা আর প্রাচীন অক্ষয়বটের মতো পবিত্র স্থানগুলো দর্শন করার ব্যাকুলতায় বহু ব্রাহ্মণ পাণ্ডবদের সঙ্গী হতে চাইলেন। যুধিষ্ঠির সানন্দে তাঁদের সম্মতি দিলেন।

যাত্রার ঠিক আগের মুহূর্তে সেই তপোবনে এসে উপস্থিত হলেন আরও তিন মহাপ্রাণ—মহর্ষি বেদব্যাস, দেবর্ষি নারদ এবং মুনি পর্বত। যুধিষ্ঠির পরম সমাদরে তাঁদের স্বাগত জানালেন। এই ত্রিমূর্তি পাণ্ডবদের উদ্দেশে জীবনের এক পরম সত্য উচ্চারণ করলেন। তাঁরা বললেন, "মনে রেখো, কেবল শরীরের নয়, মনের পবিত্রতাই তীর্থযাত্রার আসল উদ্দেশ্য। অন্তরে যদি পরশ্রীকাতরতা, হিংসা বা দ্বেষ থাকে, তবে গঙ্গার জলেও পাপ ধুয়ে যায় না। মনকে কলুষমুক্ত করো, তবেই এই পুণ্যযাত্রার ফল লাভ হবে।"

ঋষিদের এই অমূল্য উপদেশ পাণ্ডবরা এবং দ্রৌপদী নত মস্তকে হৃদয়ে ধারণ করলেন। অবশেষে, অগ্রহায়ণ মাসের সেই পুণ্যময়ী পূর্ণিমা তিথিতে, আকাশের নক্ষত্ররাজি যখন শুভক্ষণে অবস্থান করছে, তখন দ্রৌপদী, পুরোহিত ধৌম্য, পথপ্রদর্শক লোমশ এবং একদল পরমজ্ঞানী ব্রাহ্মণকে সাথে নিয়ে পাণ্ডবরা এক নতুন আলোর সন্ধানে মহাতীর্থের পথে যাত্রা শুরু করলেন।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ১৮তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ১৭তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা