বন পর্বের ১৭তমভাগ -কাম্যক বনের শূন্যতা ও পুণ্যতীর্থের আহ্বান-
নারদের বিদায়ের পর কাম্যক বনের সেই আলো-ছায়া ঘেরা প্রান্তরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এল। দেবর্ষির প্রতিটি কথা যেন তখনো বনের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। যুধিষ্ঠির গভীর চিন্তামগ্ন। তাঁর চোখের সামনে ভাসছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অথচ অন্তরে এক সুগভীর বিশ্বাসের ফল্গুধারা। তিনি সহসা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ধীর, সংযত পদক্ষেপে ভাইদের পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন কুলপুরোহিত মহর্ষি ধৌম্যের দিকে। অত্যন্ত বিনীত অথচ অন্তরের এক তীব্র আকুলতা নিয়ে যুধিষ্ঠির বললেন—
"প্রভু, অনুজ অর্জুনকে আমি দেবরাজ ইন্দ্রের অমরাবতীতে পাঠিয়েছি। সে সেখানে গেছে দিব্যাস্ত্রের নিগূঢ় সন্ধান আর সাধনা করতে। আমার অন্তরাত্মা বলে, অর্জুন আর কৃষ্ণ—এঁরা সাধারণ মর্ত্যের মানুষ নন, এঁরা স্বয়ং নর আর নারায়ণ। এই ধরণীর ধূলিমাটিতে তাঁরা অবতীর্ণ হয়েছেন দেবত্বের মহিমা নিয়ে। মহর্ষি বেদব্যাসও এই সত্য মানেন, আর আজ দেবর্ষি নারদও নিজের মুখে তাঁদের দেবতা বলে উল্লেখ করলেন। ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য—এই ষড়ৈশ্বর্য তো তাঁদের অবয়বেই মূর্ত।
যখনই কৌরবদের কথা ভাবি, পিতামহ ভীষ্ম আর আচার্য দ্রোণের মহীরুহসম অবয়ব আমার মনে ত্রাস জাগায়। অশ্বত্থামা আর কৃপাচার্যও কম যান না, দুর্যোধন তো ইতিমধ্যেই তাঁদের আনুগত্য নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। আর আছেন সূতপুত্র কর্ণ, যাঁর বীরত্ব আর ব্রহ্মাস্ত্রের জ্ঞান প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রভু, আমার বিশ্বাস, ফাল্গুনী যখন সমস্ত স্বর্গীয় অস্ত্রের সন্ধান নিয়ে ফিরবে, সে একাই এই কৌরব-বাহিনীকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিতে পারবে। তার তুল্য আর কেউ নেই। আমরা শুধু সেই আশাটুকু বুকে নিয়ে চাতকের মতো তার ফেরার প্রতীক্ষা করছি। এখন আপনি আমাদের এমন কোনো পবিত্র, শান্ত তীর্থের সন্ধান দিন, যেখানে ফল আর ফুলের প্রাচুর্য আছে, যেখানে সাধু-সজ্জনদের বাস। অর্জুনের ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা সেখানেই এই উৎকণ্ঠার দিনগুলো কাটাতে চাই।"
মহর্ষি ধৌম্য যুধিষ্ঠিরের এই ব্যাকুলতা লক্ষ্য করলেন। তাঁর সৌম্য মুখে এক চিলতে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন—
"ধর্মরাজ, তোমার এবং দ্রৌপদীর মনের এই তীব্র ক্লান্তি দূর করতেই আমি এই পৃথিবীর পুণ্যতীর্থ, পবিত্র আশ্রম আর রমণীয় পর্বতমালাগুলির কথা বলছি। তীর্থের মহিমা শ্রবণ করলেও মনের কলুষতা দূর হয়, আর সেখানে সশরীরে পদার্পণ করলে তো শতগুণ পুণ্যলাভ ঘটে।
শোনো, প্রথমে পূর্বদিকের পবিত্র স্থানগুলোর কথা বলি।
তুমি নিশ্চয়ই নৈমিষারণ্যের নাম শুনেছ? গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত এই স্থানটি দেবতাদের অত্যন্ত প্রিয় এবং পরম পবিত্র। কত শত ঋষি সেখানে তপস্যা করেছেন। আর আছে গয়া—বলা হয়, কোনো ভাগ্যবান ব্যক্তির পুত্র যদি গয়াক্ষেত্রে গিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করে, তবে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দশ প্রজন্ম মুক্তি পায়। গয়ার পাশেই বইছে পুণ্যতোয়া ফল্গু নদী, আর সেখানে রয়েছে অক্ষয়বট। সেই মায়াবী বৃক্ষের ছায়ায় শ্রাদ্ধ করলে অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়। পূর্বদিকেই কৌশিকী নদীর তীরে বিশ্বামিত্র কঠোর তপস্যা করে ক্ষত্রিয় থেকে ব্রহ্মর্ষি হয়েছিলেন। যেখানে ভাগীরথী আর যমুনা মিলিত হয়েছে, সেই প্রয়াগ মহাতীর্থ—যেখানে স্বয়ং ব্রহ্মা যজ্ঞ করেছিলেন। এছাড়া কালঞ্জর পর্বতের হিরণ্যবিন্দু আশ্রম এবং মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের তপস্যাভূমি—সবই এই পূর্ব দিকেই বিরাজমান।
এবার দক্ষিণে তাকাও। সেখানে ঋষিদের আশ্রমে ঘেরা পবিত্র গোদাবরী নদী প্রবহমান। বেণা আর ভগবতী নদীও সেখানে পুণ্য ছড়াচ্ছে। রাজা নৃগের যজ্ঞভূমি পয়োষ্ণী নদীর জল স্পর্শ করলেই মানুষের সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়।
আরও দক্ষিণে দ্রাবিড় ভূমিতে তাম্রপর্ণী নদী, অগস্ত্য আশ্রম, গোকর্ণ এবং কুমারী তীর্থের মতো রূপময় স্থান রয়েছে।
পশ্চিমে সৌরাষ্ট্রের বুকে রয়েছে প্রভাস তীর্থ, পিণ্ডারক ও উজ্জয়ন্ত পর্বত। আর সেখানেই রয়েছে দ্বারকা—যেখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও ধ্বংসের নিয়ন্তা, পরমেশ্বরূপে অবস্থান করছেন। পশ্চিমেরই মহাতীর্থ নর্মদা নদী, যার তীরে বসে কুবেরের জন্ম হয়েছিল। এছাড়া পুষ্কর হ্রদের কথা তো স্বয়ং ব্রহ্মাই বলেছেন—যে মানুষ পুষ্করে যাওয়ার কথা কেবল মনে মনে চিন্তা করে, সে-ও স্বর্গের অধিকারী হয়।
উত্তরে রয়েছে যমুনার উৎপত্তিস্থল আর পবিত্র সরস্বতী নদী। এই সরস্বতীর জলে স্নান করলে স্বর্গলাভ নিশ্চিত হয়। আর উত্তরের হিমালয়ের কোল ঘেঁষে যেখানে গঙ্গা নেমে এসেছে, সেই গঙ্গাদ্বারে রয়েছে বদরিকাশ্রম। তার কাছেই নারায়ণ-ক্ষেত্র বিশালপুরী। যেখানে এককালে শীতল ও উষ্ণ জলধারা একসঙ্গে বইত। এই ত্রিভুবনে বদরিকাশ্রমের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই।
অতএব ধর্মরাজ, তুমি তোমার অনুজদের এবং এই পণ্ডিত ব্রাহ্মণদের সঙ্গে নিয়ে এই পুণ্যতীর্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করো।"
মহর্ষি ধৌম্যের কথা শেষ হতে না হতেই, সেই তপোবনের অরণ্য-ছায়া ভেদ করে, এক অপার্থিব জ্যোতি ছড়িয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন তেজস্বী মহর্ষি লোমশ।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ১৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

Comments
Post a Comment