কাম্যকবনের অশ্রুজল ও তীর্থরাজের মহিমা
কাম্যকবনের অশ্রুজল ও তীর্থরাজের মহিমা
সেই বিষণ্ণ মেঘের মতো থমথমে দুপুর। কাম্যক বনের পত্রপল্লব চিরে যেটুকু আলো আসছিল, তাতে পাণ্ডবদের মুখের গভীর রেখাবলি ঢাকা পড়ে না। মাথার ওপর থেকে নেমে গেছে এক অখণ্ড সাম্রাজ্য, চোখের সামনে জতুগৃহের মতো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রাজসুয় যজ্ঞের সেই গৌরবদীপ্ত দিনগুলি। যুধিষ্ঠির, ভীম, আর যমজ ভ্রাতারা বসে আছেন এক প্রাচীন বৃক্ষমূলে; তাঁদের মাঝখানে দ্রৌপদী—যার চোখের কোণে এখনো লেগে আছে কুরুসভার সেই চরম অপমানের তপ্ত অশ্রু। রাজ্যহীন, দর্পহীন, কেবল এক বুক ক্ষোভ আর ধর্মসংকট নিয়ে তাঁরা যখন দিন গুনছেন, ঠিক তখনই সেই আরণ্যক স্তব্ধতা ভেঙে সেখানে আবির্ভূত হলেন দেবর্ষি নারদ। তাঁর হাতে মহতী বীণা, চোখে ত্রিকালের সত্য।
যুধিষ্ঠির অবহেলা করেননি। এই ঘোর দুর্দিনেও ক্ষীয়মাণ রাজকীয় মর্যাদার শেষটুকু দিয়ে তিনি দেবর্ষিকে স্বাগত জানালেন। অর্ঘ্যপ্রদান আর কুশলবিনিময়ের পর, যুধিষ্ঠিরের মনের গহনে বহুদিনের জমে থাকা এক সংশয় ও জিজ্ঞাসা এবার ভাষারূপ পেল। তিনি বিনীত কণ্ঠে শুধালেন, "হে দেবর্ষি, মহাজনের মুখে শুনেছি, মানুষ যদি সংসারের সব মায়া ফেলে পুণ্যতীর্থের পবিত্র জলে স্নান করে, তবে নাকি মহাযজ্ঞের সমতুল্য পুণ্যলাভ হয়। আপনি ত্রিভুবনচারী, আপনার অজানা কিছুই নেই। আমাকে কৃপা করে বলুন, এই তীর্থভ্রমণের প্রকৃত মাহাত্ম্য কী? মানুষ এতে কেমন করে পরমার্থ লাভ করে?"
নারদ মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে যেন কাম্যকবনের সমস্ত গ্লানি এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তিনি পাণ্ডবদের কাছে এসে বসে বলতে লাগলেন, "ধর্মরাজ, তুমি যা শুনেছ, তা পরম সত্য। শোনো তবে, কেন তীর্থযাত্রা এত মহিমান্বিত। তুমি যে রাজসূয় বা অশ্বমেধের মতো মহাযজ্ঞের কথা বললে, তা সম্পন্ন করতে প্রয়োজন বিপুল ঐশ্বর্য, অজস্র সোনাদানা, ঘৃত, অন্ন আর বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দীর্ঘ দক্ষিণা। এ কেবল রাজা আর ধনকুবেরদের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু এই পৃথিবীর দীনদরিদ্র মানুষ, যার পরনে হয়তো শুধু একখণ্ড জীর্ণ বস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নেই, সে তবে ঈশ্বরের দয়া থেকে বঞ্চিত হবে? না, ধর্মরাজ, বিধাতার বিধান এমন নির্মম নয়। তীর্থযাত্রা হলো সেই পথ, যা বিত্তহীনকেও বিত্তবানের সমান পুণ্য অর্জনের অধিকার দেয়। এখানে সোনাদানার পরিমাপ চলে না, চলে অন্তরের ভক্তির পরিমাপ।"
দেবর্ষি বলে চললেন, "এই সব পবিত্র তীর্থের জল কিন্তু সাধারণ জল নয়। যুগের পর যুগ ধরে দেবতারা এবং ব্রহ্মর্ষিরা তাঁদের কঠোর তপস্যা দিয়ে এই সব নদী আর হ্রদের তীরভূমিকে পবিত্র করেছেন। কোনো মানুষ যদি সরল অন্তরে, সমস্ত ছলনা আর হিংসা বর্জন করে এই জলে গা ভেজায়, তবে তার শরীরের ধূলিকণাই শুধু ধুয়ে যায় না, ধুয়ে যায় তার জন্মান্তরের পাপের গুরুভারও। তাছাড়া, তীর্থযাত্রা মানুষকে ধৈর্য আর বিনয় শেখায়। মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে চলা, রুক্ষ মাটিতে ঘুমানো, যা জোটে তা-ই খেয়ে খিদে মেটানো—এ তো এক প্রকার তপস্যাই! এই কৃচ্ছ্রসাধনই মানুষের মনকে খাঁটি সোনার মতো উজ্জ্বল করে তোলে।"
পুষ্কর থেকে প্রয়াগ: দেবতাদের ঘর ও তীর্থের রাজা
নারদ একে একে ভারতের মানচিত্রে ছড়িয়ে থাকা সেই সব পুণ্যভূমির নাম উচ্চারণ করতে লাগলেন। তিনি প্রথমে বললেন পুষ্করের কথা।
"ধর্মরাজ, পুষ্কর কোনো সাধারণ সরোবর নয়। সেখানে স্বয়ং আদিত্য, বসুগণ, রুদ্র এবং মরুৎ দেবতারা বাস করেন। গন্ধর্বদের সুর আর অপ্সরাদের নূপুরধ্বনি সেখানে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। পুষ্করে স্নান করা মানে সমগ্র দেবসভার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মাকে পবিত্র করা।"
একটু থেমে, নারদের গলার স্বর যেন কিছুটা গম্ভীর ও শ্রদ্ধাবনত হলো। তিনি বললেন, "কিন্তু যুধিষ্ঠির, এই পৃথিবীর সমস্ত তীর্থের মুকুটমণি যদি কেউ থাকে, তবে তা হলো প্রয়াগ। ঋষিরা তাকে বলেন 'তীর্থরাজ'। কেন জানো? কারণ সেখানে স্বয়ং সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মা আর পালককর্তা বিষ্ণু একসঙ্গে অবস্থান করেন। সেখানে বাস করেন লোকপালগণ, সনৎকুমার এবং পাতালের নাগরাজেরা। প্রয়াগে তিনটি অদৃশ্য যজ্ঞকুণ্ডের আগুন কখনো নেভে না।"
গঙ্গা-যমুনার সেই অলৌকিক মিলন
"যেখানে স্বর্গ থেকে নেমে আসা শ্বেতশুভ্র গঙ্গা আর সূর্যতনয়া কালিন্দী বা যমুনার কৃষ্ণ জলরাশি এসে একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে, সেই সঙ্গমস্থল দেখতে কেমন জানো? যেন এক জননীর গর্ভদেশ, যেখানে জগতের সমস্ত সৃষ্টি এসে নতুন করে জন্ম নেয়। এই দুই বিপরীত স্রোতের মিলনে যে ব্রহ্মতেজ উৎপন্ন হয়, তাতে স্নান করলে মানুষের এমন কোনো পাপ নেই যা খণ্ডন হয় না।"
নারদ প্রয়াগের মহিমা বর্ণনা করে বললেন যে, কেউ যদি কেবল মনে দৃঢ় সংকল্প করে যে সে প্রয়াগে যাবে, তবে তার যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ ফেলার আগেই দেবতাদের খাতায় তার পাপের ক্ষয় শুরু হয়ে যায়। আর যারা সেখানে দেহত্যাগ করেন, তাঁরা সংসারের এই জন্ম-মৃত্যুর চাকা থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়ে যান। শুধু তা-ই নয়, প্রয়াগে দাঁড়িয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করলে, সেই পুণ্যের আলো অতীতে বিলীন হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষদের আত্মাকেও তৃপ্তি দেয়।
বদ্রিকাশ্রমের তুষার-তপস্যা
কথার শেষ পর্বে দেবর্ষি নারদ পাণ্ডবদের নিয়ে গেলেন হিমালয়ের সেই দুর্গম, উদাসীন উচ্চতায়—যেখানে বাতাসের চেয়েও ঈশ্বরের নৈকট্য বেশি অনুভূত হয়।
"সবশেষে শোনো বদ্রিকাশ্রমের কথা। যেখানে স্বয়ং নারায়ণ 'নর-নারায়ণ' রূপে যুগ যুগ ধরে তপস্যা করেছেন। হিমালয়ের তুষারপাত আর হাড়-কাঁপানো শীতের মধ্য দিয়ে যে মানুষ সেই বদ্রীবনের ছায়ায় পৌঁছাতে পারে, তার সেই কষ্টটুকুই পরম পুণ্য হয়ে দাঁড়ায়। পাহাড় আর বরফের দুর্গম পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছানো মানেই হলো নিজের শরীরটাকে ঈশ্বরের পায়ে উৎসর্গ করা। সেখানে পৌঁছালে মনের ভেতর এমন এক নিস্পৃহ শান্তি নেমে আসে, যা এই সমতলের কোলাহলমুখর পৃথিবীতে কোথাও পাওয়া যায় না।"
নারদের প্রতিটি কথা পাণ্ডব ভাইদের বুকের ভেতর এক নতুন শক্তির সঞ্চার করল। যুধিষ্ঠির বুঝলেন, কৌরবেরা তাঁদের রাজপ্রাসাদ কেড়ে নিতে পেরেছে, সিংহাসন কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু অন্তরের ধর্ম আর আত্মশুদ্ধির এই যে পরম পথ—যা বনের দরিদ্রতম মানুষের জন্যও খোলা—তা কেড়ে নেওয়ার সাধ্য ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের কেন, ত্রিলোকের কারও নেই। কাম্যকবনের সেই গাছের তলায় বসে ভাইরা আর দ্রৌপদী যেন এক নতুন আলোর দিশা পেলেন।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata)
মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)

Comments
Post a Comment