চরম মুহূর্ত: বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ

 চতুর্থ ভাগ: বন পর্ব


চরম মুহূর্ত: বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ

কাম্যক বনের গহন অন্ধকারে তখন শান্ত হয়ে আসছে দিন। পাণ্ডবরা নির্বাসনের এক রুক্ষ, অপরিচিত জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাথার ওপর মহীরুহদের ডালপালা জড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক নিচ্ছিদ্র ছাদ; রাজপ্রাসাদের সেই ঐশ্বর্য, কোলাহল, রাজকীয় সমারোহ এখন কেবলই ধূসর স্মৃতি। বর্তমান বলতে এখন শুধু গাছের মূল, বাকলের তৈরি বসন আর সূর্যদেবের দেওয়া সেই অলৌকিক তাম্রপাত্র। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ছাড়াই কীভাবে বেঁচে থাকা যায়, তারই এক কঠিন, মন্থর পাঠ নিচ্ছিলেন তাঁরা।

পাণ্ডবরা যখন বনের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন, হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে তখন অন্য এক ঝড় ঘনীভূত হচ্ছিল।

ধৃতরাষ্ট্র ভালো ছিলেন না।

যেদিন পাণ্ডবরা তাঁর নগরী ছেড়ে চলে গেল, সেদিন থেকেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করেছে অন্ধ রাজাকে। নির্জন কক্ষে একা বসে তিনি বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর স্মৃতিতে—সেই পাশা খেলা, প্রকাশ্য রাজসভা, দ্রৌপদীর আলুলায়িত কেশ, ভীমের ভয়ানক প্রতিজ্ঞা আর পাঁচ রাজপুত্রের বল্কল পরে হেঁটে যাওয়ার সময় গোটা নগরীর সেই বুকফাটা কান্না। তিনি নিজে এই সবকিছুর অনুমতি দিয়েছিলেন। যেখানে একটা অন্য সিদ্ধান্ত ইতিহাসকে বদলে দিতে পারত, সেখানে তিনি প্রতি পদে নিজের সম্মতি দিয়ে গেছেন। এখন সেই পাপের প্রতিক্রিয়া একটা ভারী পাথরের মতো তাঁর বুকের ওপর চেপে বসেছে, যা দিন দিন আরও ভারী হচ্ছে।

যা ঘটে গেছে, তা আর ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় নেই। ধৃতরাষ্ট্র তা জানতেন। কিন্তু তিনি এমন এক মানুষ, যাঁর বেঁচে থাকার জন্য সৎ পরামর্শের প্রয়োজন ছিল বাতাসের মতোই। আর হস্তিনাপুরে কেবল একজন মানুষই ছিলেন, যাঁর মন্ত্রণা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন—যদিও বহুবার সেই পরামর্শ মেনে চলতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি বিদুরকে ডেকে পাঠালেন।

বিদুর এলেন। কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো চাটুকারিতার মুখোশ নেই। তিনি এসে শান্তভাবে বসলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সামনে।

ধৃতরাষ্ট্রই প্রথম কথা বললেন। নিজের ভেতরের সেই তীব্র যন্ত্রণা, অনিদ্রা আর একাকীত্বের কথা অকপটে স্বীকার করলেন। তিনি বললেন যে তিনি কোনো শান্তি পাচ্ছেন না, বুঝতে পারছেন না এখন তাঁর কী করা উচিত। পূর্বের বহুবারের মতো, তিনি বিদুরের কাছে তাঁর স্পষ্ট মতামত চাইলেন।

বিদুর দীর্ঘক্ষণ অন্ধ রাজার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর ঠিক তাই বললেন, যা তিনি বিশ্বাস করেন। সত্য গোপন করা বিদুরের স্বভাবে ছিল না।

"মহারাজ," বিদুর বলতে শুরু করলেন, "আমি কোনো সান্ত্বনার বাণী শোনাব না, কারণ এই মুহূর্তে আপনার সান্ত্বনার চেয়ে সত্যকে চেনার বেশি প্রয়োজন। আপনার পুত্র দুর্যোধন পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যে অধর্ম করেছে, তা কোনো বীরত্ব বা শক্তির পরিচয় নয়। শকুনি আর তার কপট পাশার আশ্রয়ে সে এই কাজ করেছে। ছলনা দিয়ে সে পাণ্ডবদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।"

ধৃতরাষ্ট্র নীরব রইলেন। বিদুর থামলেন না।

"কিন্তু সেই পাশা খেলার চেয়েও ভয়ঙ্কর অপরাধ ঘটে গেছে সেই রাজসভায়। দ্রৌপদীর চুলে ধরে যেভাবে টেনে আনা হলো, পিতামহ, আচার্য এবং অন্য রাজন্যবর্গের সামনে যেভাবে তাঁকে অপমান করা হলো—তার কোনো ক্ষমা নেই। সেই সভায় উপস্থিত একজন মানুষও মনেপ্রাণে তা মেনে নিতে পারেননি। বড়দের সেই নীরবতা সম্মতি ছিল না মহারাজ, ওটা ছিল লজ্জা। আর পাণ্ডবরা সেই নীরবতার অর্থ বোঝে।"

বিদুর সামান্য ঝুঁকে এলেন রাজার দিকে।

"মহারাজ, পাণ্ডবরা সাধারণ মানুষ নয় যে এই অপমান ভুলে যাবে। ওরা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। ওদের ভেতরের সেই ক্রোধ এখন বনের নির্জনতায় আরও কঠিন, আরও ধারালো হচ্ছে। ভীম ভোলেনি, অর্জুন ভোলেনি। আর দ্রৌপদী? দ্রৌপদী সেই অপমানের আগুন বুকে নিয়ে বেঁচে আছে, যা একদিন কৌরবদের ভস্মীभूत না করা পর্যন্ত নিভবে না।"

বিদুরের কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত, কিন্তু তাঁর প্রতিটি শব্দের ওজন ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল।

"পাণ্ডবদের হাতে আপনার বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে, মহারাজ। আপনাকে ভয় দেখানো আমার উদ্দেশ্য নয়, এটাই পরম সত্য। আপনি আমার কাছে সত্য জানতে চেয়েছেন, আর বিদুর কোনোদিন অসত্য বলতে পারে না।"

বিপদ কোথায়, তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার পর বিদুর প্রতিকারের পথটাও দেখিয়ে দিলেন।

"তবে এখনও সময় আছে, যদি আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আমার পরামর্শ শুনুন"

বিদুর যেন এক মানচিত্র মেলে ধরলেন রাজার সামনে।

"দুর্যোধনকে বন্দী করুন। তাকে এমন এক জায়গায় সরিয়ে রাখুন যেখান থেকে সে আর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। শকুনিকে তার নিজের রাজ্য গান্ধারে ফেরত পাঠিয়ে দিন, যাতে সে আপনার পুত্রের কানে আর বিষ ঢালতে না পারে। তারপর কাম্যক বনে দূত পাঠান। পাণ্ডবদের সসম্মানে ফিরিয়ে এনে যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসান।"

ধৃতরাষ্ট্রের মুখাবয়বে অস্বস্তির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু বিদুর বলে চললেন।

"একটু স্থির হয়ে ভাবুন মহারাজ। যুধিষ্ঠিরের মতো ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ ও যোগ্য রাজা এই রাজ্য আর পাবে না। তার শাসনে প্রজারা নিজেদের নিরাপদ মনে করে। পাণ্ডবরা ফিরে এলে প্রজারা উৎসব করবে, কারণ যেদিন থেকে ওরা গেছে, হস্তিনাপুরের সুখও বিদায় নিয়েছে।"

শেষ কথাটি বিদুর বললেন অত্যন্ত ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে।

"আর যুধিষ্ঠির—সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফিরে আসবে না। সে সেই ধাতুতে গড়া মানুষ নয়। সে ফিরে এসে আপনার পুত্রদের ভাইয়ের মতোই বুকে টেনে নেবে, কারণ তার কাছে ধর্মের স্থান সবকিছুর ওপরে। মহারাজ, আপনার একদিকে আছে এমন এক পুত্র যে ছলে-বলে-কৌশলে ভাইদের ধ্বংস করতে চায়, আর অন্যদিকে আছে এমন এক ভ্রাতুষ্পুত্র যে সর্বস্ব হারিয়েও নিজের ক্রোধকে সংযত করে রেখেছে যাতে কৌরব বংশ রক্ষা পায়। এদের মধ্যে কে রাজা হওয়ার যোগ্য, তা আপনার চেয়ে ভালো আর কে জানে?"

ধৃতরাষ্ট্র এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন।

কিন্তু সেই কণ্ঠে কোনো অনুশোচনা বা বোধোদয়ের সুর ছিল না। পুত্রের প্রতি অন্ধ মোহ এক মুহূর্তের মধ্যে বিদুরের সমস্ত সত্যকে একপাশে সরিয়ে দিল। রাজার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল শীতল ও কঠোর।

"বিদুর, তুমি আমার আশ্রিত। আমার রাজসভায় আমার অনুগ্রহে তুমি বাস করো। আর তুমি আমার সামনে বসেই আমার পুত্রদের নিন্দা করছ আর পাণ্ডবদের গুণগান গাইছ? তোমার আনুগত্য কোথায়? যে অন্ন তুমি গ্রহণ করো, তার প্রতি তোমার কোনো বিশ্বস্ততা নেই?"

বিদুর একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না।

"যে মানুষ তার প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ত নয়, তাকে আমার প্রয়োজন নেই," ধৃতরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভ ফেটে পড়ল। "এই সম্পর্কের এখানেই ইতি হওয়া ভালো। আমি চাই তুমি এখনই হস্তিনাপুর ত্যাগ করো।"

কক্ষের ভেতর এক দীর্ঘ, স্তব্ধ নীরবতা নেমে এলো।

বিদুর তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার দিকে তাকালেন—এই সেই অন্ধ রাজা, যিনি আজ হস্তিনাপুরের একমাত্র সত্যবাদী মানুষকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। বিদুরের মনে কী চলছিল, তা তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না। তিনি কোনো তর্ক করলেন না, কোনো অনুনয় করলেন না। রাজাকে মনে করিয়ে দিলেন না যে পূর্বে তাঁর কথা শুনলে আজ হস্তিনাপুরের এই দশা হতো না।

তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে, এক পরম মর্যাদার সাথে আসন ছেড়ে উঠলেন এবং কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

তিনি সোজা চলে গেলেন রথশালায়। রথ প্রস্তুত করার আদেশ দিলেন। সারথি রথ নিয়ে এলে তিনি তাতে চড়ে বসলেন এবং নির্দেশ দিলেন—কাম্যক বনের দিকে চলো।

হস্তিনাপুরে যদি বিদুরের প্রয়োজন না থাকে, তবে তিনি সেখানেই যাবেন যেখানে তাঁর প্রজ্ঞার কদর আছে। নদীর তীরে, গাছের ছায়ায় বসে থাকা সেই পাঁচ ভাইয়ের কাছে, যাঁরা চরম অন্যায় সহ্য করেও নিজেদের মর্যাদা হারাননি।

রথ যখন হস্তিনাপুরের তোরণ পার হয়ে যাচ্ছিল, নগরবাসী অপলক চোখে চেয়ে রইল সেই চলে যাওয়ার দিকে।

বিদুরের যাত্রা: দুই পৃথিবীর মাঝে এক প্রাজ্ঞ পুরুষ

হস্তিনাপুর থেকে কাম্যক বনের দীর্ঘ পথ। বিদুর রথের ওপর স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। যে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে তিনি সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে সেবা করেছেন, তিনি আজ তাঁকে অবিশ্বাসী তকমা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিদুরের মনে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

রথ যখন কাম্যক বনের গভীরে প্রবেশ করল, বিদুরের চোখে পড়ল পাণ্ডবদের শিবিরের চিহ্ন। গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে যজ্ঞের আগুন, বাতাসে ভেসে আসছে ব্রাহ্মণদের বেদপাঠের ধ্বনি। আর তারপরই তিনি তাঁদের দেখতে পেলেন।

পাঁচ ভাই একটা বড় গাছের নিচে বসে আছেন। রাজকীয় বৈভব হারিয়েও তাঁদের চেহারায় এক অন্যরকম দীপ্তি। রথের শব্দে তাঁরা মুখ তুলে তাকালেন, আর বিদুরকে দেখেই তাঁদের ক্লান্ত মুখগুলো এক পরম শান্তিতে ভরে উঠল।

পাণ্ডবরা উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বিদুরকে অভ্যর্থনা জানালেন। কোনো কৃত্রিম রাজকীয়তা নয়, এ ছিল এক আন্তরিক হৃদয়ের টান। তাঁকে বসার আসন দেওয়া হলো, শ্রান্তি দূর করার পর যুধিষ্ঠির কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "খুড়ামশাই, এই গহন বনে আপনার আকস্মিক আগমনের কারণ কী?"

বিদুর সবকিছু বললেন। ধৃতরাষ্ট্রের কক্ষে কী ঘটেছিল, তিনি কী পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং কীভাবে রাজা তাঁকে চলে যেতে বললেন—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে বলে গেলেন, যেন কোনো তৃতীয় ব্যক্তির গল্প বলছেন।

তারপর তিনি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "যুধিষ্ঠির, তুমি জ্ঞানী, ধর্মাত্মা। আমি যা বলতে এসেছি, তা হয়তো তুমি নিজেও জানো। তাও আজ আমাদের মুখোমুখি এই কথাগুলো বলা প্রয়োজন।"

যুধিষ্ঠির শান্ত হয়ে শুনছিলেন।

"কৌরবদের কোনোদিন নিজের শত্রু মনে কোরো না। তারা তোমার সাথে যা করেছে, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি, প্রতি পদে প্রতিবাদ করেছি। আমি তোমাকে সেই অন্যায় ভুলে যেতে বলছি না। কিন্তু তুমি কৌরবদের চেয়ে অনেক উঁচুতে, তোমার আচরণই ঠিক করে দেবে এই বংশের ভবিষ্যৎ কী হবে।"

তিনি আরও বললেন, "ভাইদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখো। দুর্যোধনের হয়তো সেই ক্ষমতা নেই, কিন্তু তোমার আছে। রাজ্য এবং প্রজাকল্যাণের জন্য তোমাকে ধৈর্য ধরতেই হবে।"

যুধিষ্ঠির বিদুরের এই উপদেশ এক পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করলেন।

"খুড়ামশাই," যুধিষ্ঠির বিনীত কণ্ঠে বললেন, "আপনার আদেশ আমার শিরোধার্য। আপনিই বলুন, এই মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিত? ধর্মের পথ কোনটি?"

বনভূমির সেই নিস্তব্ধতার মাঝে, ব্রাহ্মণদের মন্ত্রোচ্চারণের সমান্তরালে তাঁদের সেই কথোপকথন চলতে লাগল।

এদিকে হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে ধৃতরাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছিল।

যে ক্রোধের বশে তিনি বিদুরকে তাড়িয়েছিলেন, তা কর্পূরের মতো উড়ে যেতে সময় লাগেনি। এখন তাঁর মনের ভেতর এক তীব্র শূন্যতা ও অনুশোচনা দানা বাঁধছিল। বিদুর কেবল তাঁর ভাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন হস্তিনাপুরের শ্রেষ্ঠ নীতিজ্ঞ ও দূরদর্শী পুরুষ। সেই বিদুর এখন কৌরবদের ত্যাগ করে পাণ্ডবদের শিবিরে গিয়ে বসে আছেন—এই চিন্তাটাই ধৃতরাষ্ট্রের বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

বিদুর যদি পাণ্ডবদের কৌরবদের সব দুর্বলতা এবং রণকৌশল বুঝিয়ে দেন, তবে কৌরবদের ধ্বংস অনিবার্য। এই আশঙ্কায় ধৃতরাষ্ট্রের দম আটকে আসছিল। তিনি ব্যাকুল হয়ে সঞ্জয়কে ডেকে পাঠালেন।

সঞ্জয় এসে রাজাকে অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় দেখলেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "সঞ্জয়, আমি এক মহাভুল করে ফেলেছি। বিদুর আমার পরম হিতৈষী। আমি রাগের মাথায় তাকে অপমান করেছি। তুমি এখনই কাম্যক বনে যাও। তাকে বলো, আমি তাকে ছাড়া বাঁচব না। তাকে বুঝিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরিয়ে আনো।"

সঞ্জয় আর বিলম্ব না করে রথ নিয়ে ছুটে গেলেন কাম্যক বনের উদ্দেশ্যে।

বনে পৌঁছে সঞ্জয় দেখলেন, ঠিক যা ধৃতরাষ্ট্র ভয় পাচ্ছিলেন—বিদুর পাণ্ডবদের মাঝে বসে পরম সুখে ধর্মালোচনা করছেন। বনের সেই শান্ত পরিবেশ হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদের চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র।

সঞ্জয়কে দেখে পাণ্ডবরা তাকেও সমাদর করলেন। সঞ্জয় তখন বিদুরের সামনে দাঁড়িয়ে ধৃতরাষ্ট্রের বার্তা পৌঁছে দিলেন, "মহাত্মন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আপনার বিরহে অত্যন্ত কাতর। তিনি নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত এবং আপনাকে অবিলম্বে হস্তিনাপুরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।"

বিদুর কোনো বিস্ময় প্রকাশ করলেন না। কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—তিনি ফিরে যাবেন। কারণ ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর কর্তব্য এখনও শেষ হয়নি।

বিদুর যখন হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন, ধৃতরাষ্ট্র প্রায় ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।

"বিদুর, আমাকে ক্ষমা করো," অন্ধ রাজার কণ্ঠে আজ কোনো অহংকার ছিল না। "আমি তোমার সাথে অত্যন্ত অন্যায় আচরণ করেছি। তুমি আমার এই অপরাধ ভুলে যাও।"

বিদুর রাজাকে শান্ত করে বললেন, "মহারাজ, আমি কেবল পাণ্ডবদের অবস্থা দেখতে বনে গিয়েছিলাম। কৌরব ও পাণ্ডব—উভয়ই আমার সমান প্রিয়। আমার একমাত্র লক্ষ্য এই বংশকে রক্ষা করা, কোনো ধ্বংস নয়। আমি সর্বদা হস্তিনাপুরের মঙ্গলের জন্যই কথা বলব।"

ধৃতরাষ্ট্রের বুকের ওপর থেকে যেন একটা মস্ত পাথর নেমে গেল। তিনি বিদুরকে আলিঙ্গন করলেন।

বিদুর হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন বটে, রাজপ্রাসাদের পুরোনো ছন্দও ফিরে এলো। কিন্তু যা ভেঙে গেছে, তা কি আর জোড়া লাগে? দ্রৌপদীর চুল তখনও উন্মুক্ত, ভীমের প্রতিজ্ঞা তখনও বাতাসে কাঁপছে। কাম্যক বনের সেই অন্ধকার কৌরবদের ধ্বংসের দিন গুনছিল, আর নির্বাসনের চৌদ্দটি বছর তখনও অনেক, অনেক দূরে।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের চতুর্থ ভাগের  সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা