অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা
অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা
বারো বছরের বনবাস। শুনতে যতটা সহজ, যাপন করা ঠিক ততটাই নির্মম। প্রথম প্রথম যখন রাজপ্রাসাদের রাজকীয় শয্যা ছেড়ে এই বুনো ঘাসের ওপর এসে শুতে হতো, তখন গা রি রি করে উঠত অভিমানে। বুক ফেটে কান্না আসত। কিন্তু এখন আর কান্না আসে না। এখন একটা নিস্পৃহ, ভারী পাথর চেপে বসেছে পাণ্ডবদের বুকে। তারা রাজকোট ছেড়ে এখন যাযাবর। প্রতিদিনের এই ধুলোবালি, এই অনিশ্চয়তা—এ যেন এক অন্তহীন ক্ষয়।
কুরুক্ষেত্রের সেই মহাকাব্যিক দূরত্বের বাইরে, এক সন্ধ্যায় তাঁরা যখন বনের এক কোণে এসে বসলেন, তখন চারপাশের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না সেই সভার। কোনো অতিথি আসেননি, কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ারও ছিল না। শুধু সারাদিনের ক্লান্তির পর পাঁচ ভাই আর তাঁদের যৌথ দয়িতা দ্রৌপদী চুপচাপ বসেছিলেন। আর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙেই বেরিয়ে এলো এতদিনের জমানো এক তীব্র হাহাকার। দ্রৌপদীর ভেতরের সেই আগুন, যা তিনি এতদিন চেপে রেখেছিলেন, তা হঠাৎ করেই ফেটে পড়ল।
দ্রৌপদীর ক্রোধ: "তোমাদের গাণ্ডীব কি আজ শুধু খেলনা?"
স্বামীদের দিকে তাকালেন দ্রৌপদী। এই পুরুষদের তিনি ভালোবেসেছিলেন, এঁদের বীরত্বের ওপর ভরসা রেখেছিলেন। কিন্তু আজ তাঁদের এই দশা দেখে দ্রৌপদীর ভেতরের কিছু একটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
"মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কী করে হতে পারে?" দ্রৌপদীর গলায় তখন তপ্ত লাভা। কাউকে নাম ধরে বলতে হলো না, সবাই বুঝল কার কথা হচ্ছে। "দুর্যোধন আমাদের এই ধ্বংস দেখে একটুও কাঁপল না? একটা মুহূর্তের জন্য তার বুকে অনুশোচনা হলো না? আমাদের এই বনে পাঠিয়ে সে নিজে প্রাসাদে গিয়ে উৎসব করছে! তার বুকটা নিশ্চয়ই পাথর দিয়ে তৈরি।"
একটু থামলেন দ্রৌপদী। তারপর তাঁর গলায় নেমে এলো হাজারটা বিনিদ্র রাতের ক্লান্তি আর তীব্র ক্ষোভ।
"সে তোমাদের জিতেছে ছলনা করে। বীরত্বে নয়, কোনো সততার লড়াইয়ে নয়—শকুনি আর ধৃতরাষ্ট্রের এক কুৎসিত চালের খেলায়। আর জেতার পরও তার শান্তি হয়নি। তোমাদের অপমান না করা পর্যন্ত তার রাতের ঘুম আসত না। আর আজ? সে হস্তিনাপুরে বসে বন্ধুদের নিয়ে মদ্যপান করছে, হাসাহাসি করছে, আর তোমরা—মহাবীর পাণ্ডবরা—এই বুনো ঘাসের ওপর শুয়ে আছ!"
তিনি তাকালেন ভীমের দিকে। সেই বিশাল চওড়া শরীরটা আজ মাটির সঙ্গে মিশে আছে, চোখ দুটো বন্ধ।
"আমি আর সহ্য করতে পারছি না, মধ্যম পাণ্ডব! তোমাদের এই মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে আমার সেই সিংহাসনগুলোর কথা মনে পড়ে—হাতির দাঁত আর চন্দন কাঠে তৈরি সেই রাজকীয় আসন, যেখানে বসার জন্য চারপাশের রাজারা করজোড়ে অপেক্ষা করত। রাজসূয় যজ্ঞের সময় যে রাজারা তোমাদের পায়ে মাথা নত করেছিল, আজ তাদেরই তোমরা এই নামহীন, ঠিকানাহীন বনের পথ দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে হেঁটে যেতে দেখছ?"
দ্রৌপদীর গলাটা কেঁপে উঠল, কিন্তু তিনি থামলেন না।
"ভীম—এই একা মানুষটা পুরো কৌরব সেনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। সবাই তা জানে। কিন্তু সে আজ অলস বসে আছে, কারণ তুমি চুপ করে আছ, মহারাজ! আর অর্জুন? যার দুটো হাত চললে মনে হয় হাজারটা হাত একসঙ্গে বাণ ছুঁড়ছে, যার ধনুকের টঙ্কারে দিকবিদিক কাঁপত, সে আজ এই বনে পরিচয়হীন এক পথিকের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে!"
এবার দ্রৌপদী সরাসরি তাকালেন যুধিষ্ঠিরের দিকে। তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।
"কোথায় আপনার রাগ, মহারাজ? কী করে আপনি এত শান্ত, এত অবিচলিত হয়ে বসে আছেন? আপনার এই ভাইরা, যারা কোনোদিন কারও ক্ষতি করেনি, তারা আজ বন্য পশুর মতো দিন কাটাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখেও কি আপনার ভেতরের ক্ষত্রিয় রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে না?"
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
"আমি রাজা দ্রুপদের মেয়ে, ধৃষ্টদ্যুম্নের বোন, আর এই পাঁচ মহাবীরের স্ত্রী। অথচ আমি এই বনে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি জানি না এই অপমানের শেষ কোথায়। আপনার এই অসীম ধৈর্যের আমি প্রশংসা করতে পারছি না, মহারাজ! যে ক্ষত্রিয়ের মনে রাগ নেই, সে কিসের যোদ্ধা? নিজের সবকিছু কেড়ে নিয়ে যখন শত্রুরা উৎসব করে, তখন যে পুরুষের রক্ত গরম হয় না, সে আসলে মৃত!"
গলাটা আরও নামিয়ে, কামানের গোলার মতো শব্দগুলো ছুঁড়ে দিলেন দ্রৌপদী:
"ক্ষমা শত্রুর জন্য নয়, মহারাজ। যারা তোমাকে ধ্বংস করতে চায়, তাদের কাছে নিজের দুর্বলতা দেখানো কোনো পুণ্য নয়, ওটা আসলে কাপুরুষতা। একটা ভুল মানুষ একবার করতে পারে, তাকে ক্ষমা করা যায়। কিন্তু দুর্যোধন আর তার দলবল দিনের পর দিন আমাদের অপমান করেছে। যে বারবার অপরাধ করে, তাকে শাস্তি দিতে হয়। আর কৌরবরা ভয়ের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বোঝে না।"
অন্ধকার বনের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দ্রৌপদী বললেন, "সময় এসেছে, মহারাজ। আমাদের যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। ওদের শাস্তি দিন।"
যুধিষ্ঠিরের উত্তর: "ক্ষমা কোনো দুর্বলতা নয়, যাজ্ঞসেনী"
দ্রৌপদী থামার পর যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি রেগে গেলেন না, দ্রৌপদীর কথাগুলোকে উড়িয়েও দিলেন না। তিনি জানেন, এই ক্রোধের পেছনে কতটা গভীর ক্ষত লুকিয়ে আছে। তিনি দ্রৌপদীর অপমানটা নিজের বুকেও টের পাচ্ছিলেন।
কিন্তু যখন তিনি কথা বললেন, তাঁর গলা ছিল একদম শান্ত, ধীর। এক আধুনিক দার্শনিকের মতো, যিনি জীবনের চরম সত্যটা বুঝে গেছেন।
"দ্রৌপদী," মৃদু স্বরে বললেন যুধিষ্ঠির, "যে মানুষ রাগের মাথায় কাজ করে, সে কোনোদিন বুদ্ধিমানের মতো কাজ করতে পারে না। রাগ মানুষকে দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করে, কিন্তু সেখানে কোনো বিচারবুদ্ধি থাকে না। যে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যে রাগকে ছুঁয়ে দেখতে পারে কিন্তু তার দাস হয় না, আসল ক্ষমতা তো তারই। আর যে রাগের কাছে হেরে যায়, সে শত্রুকে মারার আগে নিজের ভেতরটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।"
তিনি একটু ঝুঁকে বসলেন।
"রাগ মানুষকে দিয়ে এমন সব কাজ করায়, যা সে সুস্থ মাথায় কোনোদিন করত না। গুরুজনকে অপমান করা, অধর্মের পথ নেওয়া—সবই হয় ওই রাগের মাথায়। মানুষ তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মুখ থেকে এমন সব বিষাক্ত শব্দ বেরিয়ে যায়, যা আর কোনোদিন ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।"
মাথা নাড়লেন যুধিষ্ঠির।
"আমি এই নিয়ে অনেক ভেবেছি। এই অন্ধকার রাতগুলোয়, যখন তোমরা ঘুমিয়ে পড়তে, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নগুলোই নিজেকে করেছি। আর প্রতিবার আমি একই উত্তরে পৌঁছেছি—আমি রাগের কাছে আত্মসমর্পণ করব না। তার মানে এই নয় যে আমার কষ্ট হয় না। তোমার বুকে যে আগুন জ্বলছে, তা আমার বুকেও আছে, দ্রৌপদী। কিন্তু রাগের মাথায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া মানে দুর্যোধনকে দ্বিতীয়বার জয়ী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।"
একটু থেমে তিনি আবার বললেন, "একটা কথা ভেবে দেখেছ? একটা রাগী মানুষের সামনে যখন অন্য একটা মানুষ চরম ধৈর্য নিয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই রাগের আগুনটা একা একাই নিভে যায়, কারণ সে কোনো জ্বালানি পায় না। এই ধৈর্যের মধ্যেই আসল শক্তি লুকিয়ে আছে।"
যুধিষ্ঠির এবার দ্রৌপদীর চোখের দিকে তাকালেন।
"ক্ষমা কোনো দুর্বলতা নয়, দ্রৌপদী। জ্ঞানীরা চিরকাল এটা জেনে এসেছেন। ক্ষমাই হলো আসল সত্য, ক্ষমাই ধর্মের ভিত্তি। মহর্ষি কশ্যপ বলেছিলেন, যে মানুষ প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ না হয়ে ক্ষমাকে বেছে নেয়, সে এক উচ্চতর মানুষে পরিণত হয়। যে শুধু ধ্বংস করতে জানে, সে কোনোদিন বড় হতে পারে না।"
তিনি এক এক করে নামগুলো বলতে লাগলেন, যেন নিজের মনের ভেতরের এক চিরন্তন বিশ্বাসের তালিকা পড়ছেন:
"কৃষ্ণ এটা জানে। পিতামহ ভীষ্ম জানেন। আমাদের পুরোহিত ধৌমা, বিদুর, কৃপাচার্য, সঞ্জয়, এমনকি ব্যাসদেব—সবাই একবাক্যে বলেছেন যে ক্ষমাই হলো সনাতন ধর্মের মূল কথা। এঁরা কেউ ছোট মানুষ নন, দ্রৌপদী। এঁরা এই পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ, আর তাঁরা সবাই এই একটি কথাই বলে গেছেন।"
তিনি দ্রৌপদীর হাতটা আলতো করে ছুঁলেন।
"আমি তোমার কষ্টটা বুঝি, আমি জানি তোমার এই রাগ মিথ্যে নয়। কিন্তু আমি রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো অন্যায় করব না। আমি এই বনবাসের দুঃখ সহ্য করব সত্য আর ক্ষমার পথ ধরে। কাপুরুষতার জন্য নয়, বরং আমি বিশ্বাস করি এটাই সঠিক পথ। যখন লড়াইয়ের সময় আসবে, আমরা লড়ব। কিন্তু সেই লড়াই হবে ধর্মের, অধর্মের নয়। আমরা অন্তত ওদের মতো পশু হয়ে যাব না।"
বন এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার। আগুনের শিখাটা ক্রমশ নিভে আসছে, বুনো পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে গাছের মগডালে। দ্রৌপদী অনেকক্ষণ ধরে যুধিষ্ঠিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি হয়তো সব কথায় সায় দিতে পারলেন না—তাঁর ভেতরের সেই রাজকীয় অপমান এত সহজে শান্ত হওয়ার নয়—কিন্তু তিনি এই মানুষটাকে বুঝলেন। যুধিষ্ঠিরকে তিনি চিরকাল এভাবেই চিনে এসেছেন, যদিও মনে মনে কখনো কখনো চেয়েছিলেন যে যুধিষ্ঠির যদি আর পাঁচটা সাধারণ পুরুষের মতো হিংস্র হতেন!
বনবাস চলতেই থাকল। সেই বুনো ঘাসের শয্যা, সেই গাছের পাতার দেওয়াল। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও এই ছয়টি মানুষ একে অপরের সঙ্গে এক অদ্ভুত বাঁধনে বাঁধা পড়ে রইলেন—আর সেটাই ছিল সেই মুহূর্তে তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের নবম পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
Go to all publications for full reading as per index
!DOCTYPE html>

Comments
Post a Comment