উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা
উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা
নারায়ণের ধ্যানগম্ভীর অবয়বের দিকে তাকিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসন তখন কাঁপছে। হিমালয়ের প্রত্যন্ত বদরিকাশ্রমে যুগল ঋষি— নর আর নারায়ণ। তাঁদের তপস্যার যে তীব্র উত্তাপ, যাকে শাস্ত্রে বলে তপোঅগ্নি, তা মর্ত্যের সীমানা পেরিয়ে সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে স্বর্গের অমরাবতীতে। ইন্দ্রের চিরকালের এক রোগ, ক্ষমতার মোহ। যে যেখানেই একটু গভীর সাধনায় বসে, দেবরাজ ভাবেন— এই বুঝি গেল তাঁর তখত-তাউস! তিনি তড়িঘড়ি ডেকে পাঠালেন তাঁর প্রধান সেনাপতিদের। তবে এরা রক্তপাতের সৈন্য নয়, এরা কাম ও মোহের বাহিনী। মদনদেব, তাঁর পত্নী রতি, ঋতুরাজ বসন্ত আর স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা মেনকা-রম্ভারা রওনা দিলেন হিমালয়ের দিকে। ঋষিদের ধ্যান ভাঙতে হবে, এই হলো হুকুম।
বদরিকাশ্রমে নিমেষের মধ্যে ঋতুপরিবর্তন হয়ে গেল। অসময়ে ফুটল ফুল, মলয় বাতাস বইল, মেনকা-রম্ভার নূপুরনিক্কণে কেঁপে উঠল পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। মদনদেব তাঁর পুষ্পশরাসন তাক করলেন ঋষিদের বুক লক্ষ্য করে। কিন্তু আশ্চর্য! নর বা নারায়ণ— কারও ভ্রূযুগল কাঁপল না। তাঁরা যেন অচল মহীধর, ঝোড়ো হাওয়া যাঁদের স্পর্শ করে কিন্তু টলাতে পারে না। কামের বাণ এখানে এসে ভোঁতা হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর নারায়ণ মৃদু চোখ মেললেন। তাঁর চোখে ক্রোধ নেই, বিরক্তিও নেই। আছে এক অদ্ভুত কৌতুকী মায়া। যেন এক ওস্তাদ কারিগরকে কেউ তার খেলো খেলনা দেখিয়ে চমকে দিতে চাইছে, আর কারিগরটি মনে মনে হাসছেন। নারায়ণ একটি অতি সাধারণ ফুল তুলে নিলেন, তারপর সেটি রাখলেন নিজের ঊরুর ওপর। ব্যস, এইটুকুই।
পরমুহূর্তেই তিনি নিজের ঊরুতে একটি মৃদু আঘাত করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে, কোনো মন্ত্রতন্ত্র বা দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছাড়াই, সেই ঊরুদেশ থেকে আবির্ভূত হলেন এক নারী। সংস্কৃতে ‘ঊরু’ মানে উরু, সেখান থেকেই তাঁর নাম হলো— উর্বশী।
রূপের অহংকার বনাম সৃষ্টির অধিকার
উর্বশী যখন দাঁড়ালেন, তখন মেনকা, রম্ভা কিংবা তিলোত্তমাদের মনে হলো, এতকাল তাঁরা যাকে রূপ বলে অহংকার করে এসেছেন, তা আসলে এক অসম্পূর্ণ খসড়া মাত্র। উর্বশীর লাবণ্যের সামনে স্বর্গের অপ্সরাদের চটক এক লহমায় ম্লান হয়ে গেল। শুধু উর্বশীই নন, নারায়ণ তাঁর দাসী ও সখী হিসেবে আরও শত শত রূপসী রমণী তৈরি করলেন নিজের যোগবলে।
অপ্সরাদের নাচ-গান স্তব্ধ হয়ে গেল। এক চরম লজ্জা গ্রাস করল তাদের। এ লজ্জা পরাজয়ের নয়, এ লজ্জা আসলে নিজেদের ক্ষুদ্রতা বুঝতে পারার। তারা ভেবেছিল রূপ দিয়ে ক্ষমতাকে জয় করবে, কিন্তু নারায়ণ বুঝিয়ে দিলেন— পরম ক্ষমতার ভেতরেই প্রকৃত রূপের উৎস লুকিয়ে থাকে, তাকে বাইরে থেকে প্রলুব্ধ করা যায় না। লজ্জিত অপ্সরাকুল ঋষির চরণে নত হয়ে ক্ষমা চাইল।
"তোমাদের ওপর আমার কোনো রাগ নেই," শান্ত গলায় বললেন নারায়ণ, "তোমরা তো কেবল ইন্দ্রের আদেশ পালন করছিলে। যাও, এই উর্বশীকে তোমরা তোমাদের সঙ্গে স্বর্গে নিয়ে যাও। অমরাবতীর রাজসভাই ওর যোগ্য স্থান। আমার এই বৈরাগ্যের আশ্রমে রূপের কোনো প্রয়োজন নেই।"
যিনি সৃষ্টি করলেন জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীকে, তিনি তাকে দান করে দিলেন অতি অনায়াসে। উর্বশী চলে গেলেন দেবরাজের সভায়। ‘উর্বশী’ শব্দের আর একটি অর্থ— যিনি হৃদয় হরণ করেন। তিনি হলেন স্বর্গের প্রধান নর্তকী। তাঁর চিরযৌবন আর অধরা লাবণ্য দেবতাদেরও মোহগ্রস্ত করে রাখত যুগে যুগে।
মহাভারতের অমোঘ চক্রাবর্ত
কিন্তু এই কাহিনীর আসল চমক লুকিয়ে আছে মহাভারতের অন্য এক পৃষ্ঠায়, যা কালান্তরের সুতোয় বাঁধা। নর আর নারায়ণ তো সাধারণ কেউ ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরের দুই অবতার। দ্বাপর যুগে এই নারায়ণই কৃষ্ণ হয়ে এলেন মর্ত্যে, আর নর এলেন অর্জুন রূপে।
হাজার বছর পর, ইন্দ্রলোকের রাজসভায় বসে যখন মহাবীর অর্জুন উর্বশীর নৃত্য দেখছিলেন, তখন তিনি জানতেনও না— এই পরমাসুন্দরী আসলে তাঁরই পূর্বজন্মের সৃষ্টি! সেই রাতেই যখন উর্বশী কামার্ত হয়ে অর্জুনের শয্যায় এলেন, অর্জুন তাঁকে ‘মাতা’ বলে সম্বোধন করলেন। পুরু বংশের আদিজননী হিসেবে উর্বশীকে প্রণাম করলেন তিনি।
কী বিচিত্র নিয়তি! অর্জুনের পূর্বজন্মের সত্তা (নারায়ণ) যাকে সৃষ্টি করে স্বর্গে পাঠিয়েছিল, মর্ত্যের নিয়মে সেই উর্বশীই একদিন পুরু রাজবংশের জননী হলেন, যে বংশে স্বয়ং অর্জুনের জন্ম। মহাকালের এই নাট্যশালায় কোনো কিছুই আসলে বিচ্ছিন্ন নয়, সবটাই এক অদৃশ্য সুতোয় বোনা চমৎকার আলপনা।

Comments
Post a Comment