মহাভারতের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

 


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস যখন লিখতে বসেছিলেন, তখন হয়তো ভাবেননি তিনি শুধু একটা মহাকাব্য লিখছেন না, আসলে গড়ে তুলছেন একটা গোটা মহাবিশ্ব। আয়তনে সে এক বিপুল গ্রন্থ! পৃষ্ঠা ওল্টালে মনে হয় কোনো শেষ নেই। উপন্যাসের পর উপন্যাস, গল্পের ভেতরে গল্প—যেন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। ব্যাসদেব সেখানে শুধু যুদ্ধবিগ্রহের খতিয়ান রাখেননি; মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, সমাজনীতি, রাজনীতি, এমনকি রণকৌশলের এমন এক আশ্চর্য ও জীবন্ত দলিল তৈরি করেছেন যে, যুগে যুগে একটা কথাই এ দেশে প্রবাদ হয়ে গেছে—"যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে।" অর্থাৎ, এই মহাভারতে যা লেখা নেই, তা এই ভারতবর্ষেও আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিন্তু এই মহাকাব্যকে আমরা কীভাবে দেখি? ঠিক এই প্রশ্নটাই একদিন আলোড়িত করেছিল আমাদের রবীন্দ্রনাথকে।

রবীন্দ্রনাথ মহাভারতকে স্রেফ একটা বই হিসেবে দেখতে রাজি ছিলেন না। তাঁর চোখে এটা ছিল হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের এক জীবন্ত ইতিহাস—মানবতার এক বহমান স্রোত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন মহাভারতকে 'কাব্যময় ইতিহাস' বলে আখ্যা দিলেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে মৃদু আপত্তি জানিয়ে বললেন, না, এ আসলে 'ঐতিহাসিক কাব্য'। ইতিহাস আর কাব্যের তফাতটা তিনি বুঝতেন গভীর সংবেদনশীলতা দিয়ে। তিনি বলতেন, তথ্য আর সত্য এক জিনিস নয়। শুকনো কাঠ যেমন বনের ইতিহাস ধরে রাখে কিন্তু আলো দেয় না, তথ্যও ঠিক তেমনি ইতিহাসের মৃত কাঠখড়। আর কবির কল্পনা সেই কাঠখড়ে আগুন জ্বেলে যে আলো তৈরি করে, সেটাই হলো সত্য। মহাভারত হলো সেই সত্যের আলো।

রবীন্দ্রনাথের কাছে মহাভারত ছিল এক পরম ট্র্যাজেডি। কত মানুষের মৃত্যু, কত ক্ষয়! কুরুক্ষেত্রের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবরা যখন জয়ী হলো, তখন কি তারা উল্লাস করেছিল? না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কালান্তর’ গ্রন্থে চমৎকার দেখিয়েছেন যে, রক্তের বন্যায় ভেসে যে রাজ্য পাণ্ডবরা ফিরে পেল, তা তাদের মনে কোনো আনন্দ দিতে পারেনি। কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে আত্মীয়স্বজনদের চিতার ছাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক চরম বৈরাগ্য এসে গ্রাস করল তাদের। তারা রাজ্যপাট ছেড়ে মহাপ্রস্থানের পথে হেঁটে গেল।

পাশ্চাত্যের কোনো কবি হলে গল্পটা হয়তো পাণ্ডবদের জয়ের রাজমুকুট পরিয়েই শেষ করে দিতেন। কিন্তু ব্যাসদেব জানতেন, রাজসিংহাসন আরোহণে জীবনের শেষ কথা থাকে না, শেষ কথা থাকে ত্যাগে। সমস্ত কোলাহল, যুদ্ধ আর ষড়যন্ত্রের ভেতরেও মহাভারতের গভীরে একটা উদাসীন, শান্ত বৈরাগ্যের চোখ স্থির হয়ে আছে। আর সেই বৈরাগ্যেরই মুকুটমণি হয়ে আলো দিচ্ছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, যা ভারতবর্ষের চিরন্তন সমন্বয়ী চেতনাকে ধারণ করে আছে।

অথচ দেখুন, রামায়ণে যে পারিবারিক মাধুর্য আর আদর্শের সুর আমরা পাই, মহাভারতে কিন্তু তা এক লহমায় হারিয়ে যায়। এখানে জীবনটা বড় রুক্ষ, বড় জটিল। জুয়াখেলা, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, জালিয়াতি, ক্ষমতার লোভ আর যুদ্ধবিগ্রহের আবর্তে সাধারণ জীবনের সমস্ত সরলতা যেন খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে।

তাহলে এই বিপুল আখ্যান ঠিক কবে রচিত হয়েছিল? এ নিয়ে পণ্ডিতদের বিতর্কের শেষ নেই।

তবুও মোটামুটি একটা ধারণা করা হয়, যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই মহাকাব্য রূপ পেয়েছিল। স্বামী বিবেকানন্দ তো জোর দিয়েই বলেছিলেন, গৌতম বুদ্ধের জন্মের আগেই মহাভারত লেখা হয়ে গেছে। আবার আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা কুরুক্ষেত্রের আশেপাশের মাটি খুঁড়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দাবি করেছেন, মহাভারতের মূল ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের বাস্তব সত্য।

হিন্দু সমাজে মহাভারতকে পঞ্চম বেদ বা পবিত্র শাস্ত্রের মর্যাদা দেওয়া হয় বটে, কিন্তু অদ্ভুত এক লোকবিশ্বাস বা কুসংস্কারের কারণে এই বই সচরাচর মানুষের বসার ঘরের বুকশেলফে বা ঠাকুরঘরে জায়গা পায় না। লোকে বলে, মহাভারত ঘরে রাখলে নাকি গৃহবিবাদ হয়! কী অদ্ভুত হুজুগ! অথচ, ঘরে বই না থাকলেও আমাদের মজ্জায়, রক্তে, বড়দের মুখে মুখে শোনা গল্পে আমরা প্রতিক্ষণ মহাভারতের চরিত্রগুলোর সঙ্গেই বাস করি।

আজকের এই ইন্টারনেটের যুগে, যেখানে নতুন প্রজন্ম কাগজের বইয়ের থেকে স্ক্রিনে বেশি সময় কাটায়, সেখানে মহাভারতের এই সুবিশাল সাগরকে একটু ছোট করে, সহজ করে তাদের সামনে তুলে ধরার একটা তাগিদ আমি অনুভব করছিলাম। কুরুক্ষেত্রের সেই রাজনীতি, শকুনির পাশাখেলা, কিংবা কর্ণের ট্র্যাজেডি—আজকের দিনে দাঁড়িয়েও তো বিন্দুমাত্র পুরোনো হয়নি। এই যুগের ছেলেমেয়েরাও যাতে অনায়াসে আমাদের এই শিকড়ের সন্ধান পেতে পারে, বুঝতে পারে যে হাজার বছর আগের সেই গল্পগুলো আজও কতটা প্রাসঙ্গিক—ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই মহাভারতের এই গল্পগুলোকে একটু সংক্ষেপে, অনলাইনের পাতায় সাজিয়ে দেওয়ার এই আমার সামান্য চেষ্টা।

Go to index for reading mahabharata 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া