১৯তম বনপর্ব -তীর্থের পুণ্য ও এক রাজকন্যার ত্যাগ: অগস্ত্য-লোপামুদ্রার উপাখ্যান


১৯তম বনপর্ব -তীর্থের পুণ্য ও এক রাজকন্যার ত্যাগ: অগস্ত্য-লোপামুদ্রার উপাখ্যান

কাম্যক বনের শান্ত তপোবনে সেদিন এক অলৌকিক স্তব্ধতা। মহাপ্রস্থানের পূর্বে সেখানে পদার্পণ করেছেন তিন পরম তেজস্বী ঋষি—ব্যাস, নারদ এবং পর্বত। যুধিষ্ঠির পরম ভক্তিতে অবনত মস্তকে তাঁদের চরণে প্রণাম জানালেন, প্রার্থনা করলেন অন্তরের আশীর্বাদ।

যাওয়ার আগে ঋষিরা পাণ্ডবদের এমন এক পরম সত্যের পাঠ দিলেন, যা তাঁদের দীর্ঘ নির্বাসনের দিনগুলিতে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাবে। তাঁরা বললেন, “হে কুন্তীপুত্র, তীর্থভ্রমণ মানে কেবল পবিত্র জলে অবগাহন বা পুণ্যভূমি দর্শন নয়। তীর্থের আসল উদ্দেশ্য হলো অন্তরের কলুষতা ধুয়ে ফেলা। মনে যদি হিংসা, দ্বেষ বা তিক্ততা জমে থাকে, তবে জাহ্নবীর ধারাও পাপমুক্ত করতে পারে না। অন্তরকে পবিত্র না করলে তীর্থের প্রকৃত ফল মেলে না।” দ্রৌপদী ও অন্য ভাইয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন সেই বাণী।

অগ্রহায়ণ মাসের এক শুভ পূর্ণ তিথিতে, নক্ষত্রের অনুকূল সংযোগে, আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধানে পাণ্ডবেরা যাত্রা শুরু করলেন। তাঁদের সঙ্গে চললেন যাজ্ঞসেনী, কুলপুরোহিত ধৌম্য, পথপ্রদর্শক লোমশ এবং একদল বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ।

প্রথমেই তাঁরা পৌঁছলেন নৈমিষারণ্যে, গোমতী নদীর পবিত্র জলে স্নান সারলেন। সেখান থেকে একে একে কন্যা, অশ্ব, গৌত্রী তীর্থ হয়ে কালকোটি পার হয়ে বিশ্রাম নিলেন বিষপ্রস্থ পাহাড়ে। তারপর বহুদায় স্নান সেরে তাঁরা এলেন প্রয়াগে, যেখানে দেবতারা স্বয়ং যজ্ঞ করেন। এরপর ব্রহ্মার দিব্য ধামে কিছুকাল ফলমূল আর কন্দ খেয়ে দিন কযাপন করার পর পাণ্ডবেরা এসে পৌঁছলেন গয়াভূমিতে।

গয়ার মহানদী আর বেতসবনে ঘেরা গয়াশির পাহাড়, ধরণীধর শৃঙ্গ আর ধর্মরাজ অধিষ্ঠিত ব্রহ্মসরোবর—সব মিলিয়ে এক অতিপ্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানেই একদা মহাদেব পিনাকপাণি রূপ ধারণ করেছিলেন। পাণ্ডবদের আগমনে সেখানে সমবেত হলেন হাজারো ঋষি ও ব্রাহ্মণ। চাতুর্মাষ্য যজ্ঞ সম্পন্ন হলো, শাস্ত্রালাপে মুখরিত হলো চারপাশ। সেই সভায় শমথ নামের এক জ্ঞানী ছাত্র শোনালেন রাজা গয়ার মহত্ত্বের কথা, যাঁর রাজত্বে অন্ন আর দাক্ষিণ্যের কোনো অভাব ছিল না।

ভ্রমণ করতে করতে যুধিষ্ঠির যখন মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন, তখন লোমশ ঋষি শোনালেন এই তপোবনের এক অদ্ভুত ইতিহাস।

বহুকাল আগে, মহর্ষি অগস্ত্য একদিন দেখতে পেলেন তাঁর পিতৃপুরুষেরা শূন্যে উল্টো হয়ে ঝুলে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন। ব্যাকুল হয়ে কারণ শুধোতেই তাঁরা বললেন, “অগস্ত্য, তুমি যদি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম না দাও, তবে আমাদের এই বংশলোপের গ্লানি আর মুক্তি নেই।” সত্যনিষ্ঠ অগস্ত্য তাঁদের কথা দিলেন, তিনি বিবাহ করবেন।

কিন্তু উপযুক্ত পাত্রী কোথায়? সমগ্র পৃথিবী খুঁজেও যখন মনের মতো নারী পেলেন না, তখন অগস্ত্য গিয়ে দাঁড়ালেন বিদর্ভরাজের দরবারে। চাইলেন তাঁর কন্যা লোপামুদ্রার হাত। বিদর্ভরাজ ও রানী তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেন। ঋষির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তাঁর ক্রুদ্ধ অভিশাপে রাজ্য ছারখার হয়ে যাবে, আবার সুকুমারী কন্যাকে এক জটাধারী তপস্বীর হাতে সঁপে দিতেও বুক ফেটে যাচ্ছে। পিতা-মাতার এই তীব্র অন্তর্দাহ দেখে এগিয়ে এলেন লোপামুদ্রা। শান্ত স্বরে বললেন, “পিতা, তুমি শোক কোরো না। আমি সানন্দে মহর্ষির পত্নী হব। আমার ত্যাগে যদি রাজ্য আর পিতা-মাতার কল্যাণ হয়, তবে তাই হোক।”

রাজকীয় বসন ও অলঙ্কার ত্যাগ করে লোপামুদ্রা পরিধান করলেন বল্কল আর মৃগচর্ম। রাজপ্রাসাদের সুখ ভুলে তিনি হলেন তপোবনের কৃচ্ছ্রসাধিকা।

কিছুকাল পরে, ঋতুস্নাত লোপামুদ্রার লাবণ্য আর অলৌকিক সৌন্দর্য দেখে অগস্ত্য তাঁর কাছে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু লোপামুদ্রা দ্বিধায় পড়লেন। বললেন, “হে আর্য, তপস্বীর বেশে এই মিলন শোভা পায় না। আমি যখন আপনার অঙ্কে আসব, তখন আমি যেন রাজকন্যার সাজে থাকি, আর আপনিও থাকুন উপযুক্ত বেশে।” অগস্ত্য বললেন, “আমার তো কোনো ধনসম্পদ নেই।” লোপামুদ্রা মনে করিয়ে দিলেন, তপস্যার জোরে ঋষি নিমেষে সব সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু অগস্ত্য অনড়, “সংসারসুখের জন্য আমি তপোবল ক্ষয় করব না।” লোপামুদ্রাও নিজের শর্তে স্থির। অবশেষে অগস্ত্য মর্ত্যলোকে ধন সংগ্রহে বের হতে বাধ্য হলেন।

তিনি গেলেন রাজা শ্রুতর্বা ও ব্রধ্নশ্বের কাছে। রাজারা সাদরে আহ্বান জানালেন, কিন্তু অগস্ত্য তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করে দেখলেন, তাঁদের থেকে ধন নিলে রাজকোষ শূন্য হয়ে যাবে। প্রজারা কষ্ট পাবে। তাই তিনি নিলেন না। এরপর তাঁরা গেলেন ইক্ষ্বাকু বংশের ত্রসদস্যুর কাছে, কিন্তু সেখান থেকেও শূন্য হাতে ফিরতে হলো।

শেষে তাঁরা উপস্থিত হলেন দানবরাজ ইল্বলের দুয়ারে। ইল্বল ছিলেন অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী। অগস্ত্য কোনো ভণিতা না করে সোজা নিজের প্রয়োজনের কথা জানালেন। ইল্বল মাথা নত করে বললেন, “বলুন ঋষিবর, কী চাই আপনার?” অগস্ত্য চাইলেন দশ হাজার গাভী, সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা এবং দুই দ্রুতগামী ঘোড়া ‘বিরাব’ ও ‘সুরাব’ চালিত একটি স্বর্ণরথ। ইল্বল বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সব দান করলেন।

ঋষি সেই বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে আশ্রমে ফিরলেন। লোপামুদ্রার সব ইচ্ছা পূরণ হলো। রাজকীয় শয্যায় যখন দুজনে মিলিত হবেন, তখন অগস্ত্য সুধালেন, “প্রিয়ে, তুমি কেমন পুত্র চাও? সাধারণ হাজারো পুরুষের সমান একশত পুত্র? নাকি একশত জনের সমান দশজন? নাকি দশ হাজার জনের সমান তেজস্বী একটি মাত্র পুত্র?” লোপামুদ্রা উত্তর দিলেন, “আমার বহু লঘুচিত্ত সন্তানের প্রয়োজন নেই। আমি একটিই পুত্র চাই, যে একাই সহস্রের সমকক্ষ হবে।”

যথাসময়ে লোপামুদ্রা গর্ভধারণ করলেন। দীর্ঘ সাত বছর গর্ভে ধারণ করার পর জন্ম নিলো এক পরম তেজস্বী পুত্র—দৃঢ়স্যু। সে অল্প বয়সেই বেদ-উপনিষদে পারঙ্গম হয়ে উঠল। তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই অগস্ত্যের পিতৃপুরুষেরা নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গে আরোহণ করলেন।

লোমশ ঋষি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “হে ধর্মরাজ, এই সেই অগস্ত্যাশ্রম, যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুণ্যতোয়া গঙ্গা। এখানেই একদা পরশুরাম স্নান করে তাঁর ক্ষয়প্রাপ্ত তেজ ফিরে পেয়েছিলেন। দুর্যোধনের অন্যায়ে আপনার যে তেজ আজ ম্লান হয়েছে, এই পবিত্র জলে স্নান করলে আপনিও সেই রাজকীয় মহিমা আর শক্তি ফিরে পাবেন।” যুধিষ্ঠির সশ্রদ্ধ চিত্তে সেই পুণ্য ভূমির ধূলি মাথায় নিলেন।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ১৯তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।


বনপর্বের ১৮তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা