দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ
দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ
স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের বুকে এমন এক দুঃশ্চিন্তা বহু যুগ ধরে পাথরের মতো চেপে ছিল, যার সমাধান তিনি নিজেও করতে পারছিলেন না। শত্রু যদি সাধারণ শত্রু হয়, তবে বজ্রধারী ইন্দ্রের পক্ষে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি সেই শত্রুকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এমন আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন, যা তাকে দেবতাদের কাছেও অজেয় করে তোলে, তবে?
অর্জুনের জন্মের বহু আগে, হস্তিনাপুরে পাশা খেলার বহু আগে, পাণ্ডবদের বনবাসেরও বহু আগে, স্বর্গলোকের আকাশে এই এক নামই আতঙ্কের ছায়া হয়ে ভাসত— নিবাতকবচ।
কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত নিয়ম। যে সমস্যার সমাধান যুগ যুগ ধরে দেবতারা খুঁজে পাননি, তার উত্তর একদিন এসে দাঁড়াল এক মানবযোদ্ধার হাতে— যার হাঁটুর উপর বিশ্রাম নিচ্ছিল গাণ্ডীব ধনুক, আর যার রথ ছুটছিল স্বর্গের পথে।
নিবাতকবচদের জন্ম ও তপস্যা
অতি প্রাচীন কালে, যখন দেবতা ও অসুরদের সংঘর্ষ ছিল জগতের নিয়মের মতো স্বাভাবিক, তখন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির গর্ভে জন্ম নেয় এক শক্তিশালী অসুরগোষ্ঠী। এদের নাম ছিল নিবাতকবচ।
দেবতাদের মতোই তারা কশ্যপের সন্তান। অর্থাৎ, দেবতা ও অসুর আসলে একই পরিবারের দুই শাখা। কিন্তু সেই রক্তের সম্পর্ক কখনোই বৈরিতাকে মুছে দিতে পারেনি।
নিবাতকবচরা ছিল অসাধারণ শক্তিশালী। তারা কেবল বলবানই ছিল না, যুদ্ধবিদ্যা, মায়াবিদ্যা ও দেবাস্ত্র ব্যবহারে ছিল অতুলনীয়। কিন্তু তাদের প্রকৃত শক্তির উৎস ছিল অন্যত্র।
তারা কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত হল।
বহু সহস্র বছর ধরে তারা সমস্ত ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে কঠিন ব্রত পালন করল। তাদের তপস্যার তেজে তিন লোক কেঁপে উঠল। দেবতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। অবশেষে সেই তপস্যার ফলে স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা তাদের সামনে আবির্ভূত হলেন।
ব্রহ্মা বললেন,
— "বৎসগণ, তোমাদের তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট। বলো, কী বর চাও?"
নিবাতকবচরা অনেক ভেবে নয়, যেন বহুদিন ধরে প্রস্তুত উত্তরই দিল।
তারা বলল,
— "আমাদের এমন বর দিন, যাতে দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ কিংবা তিন লোকের কোনো শক্তিশালী সত্তাই আমাদের পরাজিত করতে না পারে।"
ব্রহ্মা সম্মতি দিলেন।
সেই মুহূর্ত থেকে তাদের শরীরের সঙ্গে এক অদৃশ্য কবচ জড়িয়ে গেল। কোনো দেবাস্ত্র তাকে ভেদ করতে পারবে না, কোনো ঐশ্বরিক শক্তি তাকে ধ্বংস করতে পারবে না।
এ যেন অমরত্ব নয়, কিন্তু অমরত্বেরই অন্য রূপ।
সমুদ্রতলের নগরী তোয়মপুর
বর লাভের পর নিবাতকবচরা সমুদ্রের গভীরে নিজেদের রাজধানী নির্মাণ করল।
সেই নগরীর নাম ছিল তোয়মপুর।
সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না, সমুদ্রের অন্ধকার গহ্বরে তারা গড়ে তুলেছিল এক বিস্ময়কর সাম্রাজ্য। বিশাল প্রাচীর, সুবিস্তৃত রাজপথ, রত্নখচিত প্রাসাদ, অপরিমেয় ধনসম্পদ— সব মিলিয়ে তোয়মপুর ছিল অসুরদের এক স্বপ্ননগরী।
তারা জানত, দেবতারা তাদের কিছুই করতে পারবে না।
এই নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাই ধীরে ধীরে তাদের হৃদয়ে অহংকারের জন্ম দিল।
আর মহাভারত বারবার শেখায়— অহংকারই পতনের প্রথম ধাপ।
স্বর্গের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
একদিন নিবাতকবচদের দৃষ্টি পড়ল স্বর্গপুরীর দিকে।
ইন্দ্রের অমরাবতী— সুরসঙ্গীত, অপ্সরাদের নৃত্য, দেবতাদের ঐশ্বর্যে ভরা সেই নগরী যেন তাদের অহংকারকে উসকে দিল।
তারা স্বর্গ আক্রমণ করল।
তারপর শুরু হল দীর্ঘ যুদ্ধ।
দেবসেনা ও নিবাতকবচদের মধ্যে একের পর এক ভয়ংকর সংঘর্ষ হতে লাগল। দেবতাদের হাতে ছিল অসংখ্য দিব্যাস্ত্র, অগণিত বীরযোদ্ধা এবং স্বয়ং ইন্দ্রের বজ্র।
কিন্তু কোনো অস্ত্রই কার্যকর হল না।
ইন্দ্রের বজ্র যে একসময় মহাদানব বৃত্রাসুরকে হত্যা করেছিল, সেই বজ্রও নিবাতকবচদের শরীরে আঘাত করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল।
বারবার দেবতারা আক্রমণ করলেন।
বারবার পরাজিত হলেন।
ব্রহ্মার বর অটুট রইল।
স্বর্গের রাজা বুঝলেন— এই সমস্যার সমাধান দেবতাদের হাতে নেই।
অর্জুনের আগমন
এদিকে পৃথিবীতে পাণ্ডবদের বনবাস চলছে।
সেই সময় অর্জুন কঠোর তপস্যার মাধ্যমে মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপতাস্ত্র এবং পরে দেবতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দিব্যাস্ত্র লাভ করেন। এরপর ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যান।
সেখানে অর্জুন দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গীয় অস্ত্রচালনার শিক্ষা গ্রহণ করলেন। অল্প সময়েই তিনি এমন দক্ষতা প্রদর্শন করলেন যে দেবরাজ ইন্দ্র নিজেও বিস্মিত হলেন।
তখন বহু যুগের পুরনো দুঃখের কথা মনে পড়ল ইন্দ্রের।
একদিন তিনি অর্জুনকে ডেকে বললেন,
— "পার্থ, গুরুদক্ষিণা হিসেবে তোমার কাছে একটি কাজ চাই।"
অর্জুন মাথা নত করলেন।
— "আদেশ করুন, দেবরাজ।"
ইন্দ্র বললেন,
— "সমুদ্রের গভীরে তোয়মপুর নামে এক নগরীতে নিবাতকবচ নামে আমার প্রাচীন শত্রুরা বাস করে। তারা অসংখ্য— কেউ বলে তিন কোটি। রূপে, শক্তিতে ও বীর্যে তারা সমান। বহু যুগ ধরে তারা দেবতাদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। ব্রহ্মার বরে তারা দেবতাদের কাছে অজেয়।"
কিছুক্ষণ থেমে তিনি গভীর দৃষ্টিতে পুত্রের দিকে তাকালেন।
— "তুমি মানব। সেই কারণেই হয়তো তাদের বিনাশ সম্ভব।"
অর্জুনের চোখে তখন যুদ্ধের দীপ্তি জ্বলে উঠেছে।
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "যদি এ আপনার ইচ্ছা হয়, তবে নিবাতকবচদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।"
স্বর্গের বহু যুগের অমীমাংসিত সমস্যা তখন প্রথমবারের মতো সমাধানের পথে এগোতে শুরু করল।
সমুদ্রের অতল অন্ধকারে, তোয়মপুরের সোনালি প্রাসাদগুলোর উপর তখনও নেমে আসেনি সেই ঝড়ের পূর্বাভাস। নিবাতকবচরা জানত না— দেবতাদের নয়, এক মানবযোদ্ধার হাতেই লেখা আছে তাদের ভাগ্যের শেষ অধ্যায়।
যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী অংশে প্রকাশ করা হবে।

Comments
Post a Comment