ভীম ও রাক্ষস কির্মীর: কাম্যক বনের সেই প্রথম কালরাত
ভীম ও রাক্ষস কির্মীর: কাম্যক বনের সেই প্রথম কালরাত
মৈত্রেয় মুনির অভিশাপটা যখন কৌরভ সভার স্তম্ভগুলোতে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে গেল, তখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদের বাতাস আচমকা ভারী হয়ে উঠেছিল। ঠিক যেন একটা কালো মেঘ মাথার ওপর থমকে দাঁড়িয়েছে, যা কাটবার কোনো লক্ষণ নেই।
ধৃতরাষ্ট্র অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মনের ভেতর থেকে একটা দৃশ্য কিছুতেই মুছছে না—দুর্যোধন নির্বিকার হাসছে, পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে, অহংকারে অন্ধ যুবকের চোখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। আর সেই সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের কানের কাছে তখনো বাজছিল মৈত্রেয়ের মুখে উচ্চারিত একটি নাম—‘কির্মীর’। মুনি যাওয়ার আগে অবহেলায় বলে গেছেন নামটা, যেন ওটা পাণ্ডবদের ক্ষমতার একটা সামান্য উদাহরণ মাত্র।
ধৃতরাষ্ট্র আর স্থির থাকতে পারলেন না। হাতড়ে হাতড়ে, অন্ধ মানুষের চেনা অভ্যাসে শরীরটাকে সামান্য ঝুঁকিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন বিদুরের কক্ষে।
"বিদুর," ধৃতরাষ্ট্রের গলায় এক অদ্ভুত আর্তি, "আমাকে সবটা খুলে বলো। মহর্ষি মৈত্রেয় কোন রাক্ষসের কথা বলে গেলেন? কির্মীর? হস্তিনাপুর ছেড়ে বনে যাওয়ার প্রথম রাতেই নাকি ভীম তাকে বধ করেছে? আমি সবটা শুনতে চাই বিদুর, একটুও গোপন কোরো না।"
বিদুর চিরকালই শান্ত, সত্য বলতে তাঁর দ্বিধা নেই। যেখানে অন্যেরা চাটুকারিতা বেছে নেয়, বিদুর সেখানে নিরাসক্ত স্বরে গল্প শুরু করলেন।
সেই অন্ধকার মহাপ্রস্থান
সে রাতটা ছিল এক্কেবারে কুচকুচে কালো। আকাশে চাঁদ তো দূরস্থান, মেঘের ঘন আস্তরণ ভেদ করে একটা নক্ষত্রের আলোও এসে পৌঁছাচ্ছিল না মাটিতে। ঠিক এমনই একটা রাতেই পাণ্ডবেরা তাঁদের জন্মভূমি, তাঁদের আজন্মের চেনা হস্তিনাপুর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। যে শহর তাঁদের আপন ছিল, একমুঠো হাতির দাঁতের পাশা আর কিছু কুচক্রী ভাইয়ের ক্রূর হাসির শব্দে তা এক নিমেষে পর হয়ে গেল।
যুধিষ্ঠির হাঁটছিলেন মুখ ঢেকে। প্রজারা তাঁকে দেবতার মতো পুজো করত, আজ এই চরম অপমানের পর তাদের মুখোমুখি হওয়ার মতো মুখ তাঁর ছিল না। পাশে দ্রৌপদী। তাঁর চুলগুলো পিঠের ওপর অবিন্যস্ত, রুক্ষ। দুঃশাসন রাজসভায় যে চুলে হাত দিয়েছিল, সেই চুল আর বাঁধা হয়নি। দ্রৌপদী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছেন, দুঃশাসনের রক্তে পা ধুয়ে তবেই আবার ও চুলে চিরুনি ছোঁয়াবেন।
তাঁদের পেছনে আসছিলেন একদল অনুগত ব্রাহ্মণ আর বিশ্বস্ত অনুচর, যাঁরা এই দুর্দিনেও পাণ্ডবদের ত্যাগ করতে রাজি হননি। আর সবার আগে আগে পথ দেখিয়ে চলছিলেন পুরোহিত ধৌম্য। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সামগান গাইছিলেন। দৃশ্যটা দেখতে লাগছিল ঠিক যেন একটা শবযাত্রা। এক অর্থে তা-ই তো! পাণ্ডবদের অতীত জীবনটা তো ওই পাশা খেলার রাতেই মরে গেছে।
সারারাত হেঁটে, পরের পুরো দিনটা পার করে, আবার যখন রাত নামল, ততক্ষণে তাঁরা এসে পৌঁছেছেন কাম্যক বনের সীমানায়। একটানা ক্লান্তিতে পুরো দলটার ওপর যেন অবসাদের আরেকটা অন্ধকার চেপে বসেছে।
কাম্যক বনের শ্বাপদসংকুল অন্ধকার
সূর্যাস্তের পর কাম্যক বন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আদিম, বিশাল সব গাছপালা। তাদের শেকড়গুলো মাটির ওপর এমনভাবে জেগে আছে যেন ক্লান্ত পথিকের পা আটকে আছাড় মারার জন্য ওত পেতে বসে আছে। ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে আসছিল অদ্ভুত সব শব্দ—নিশাচর পাখিদের ডানা ঝাপটানো, বুনো জানোয়ারের ভারী পায়ের আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে এমন কিছু আর্তনাদ যা পশুর কি অন্য কিছুর, তা ঠাহর করা দায়।
ভয়ে ব্রাহ্মণরা একে অপরের আরও গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। যাঁরা নিছক আনুগত্যের টানে এসেছিলেন, এই নিশ্ছিদ্র অরণ্যের অন্ধকার তাঁদের ভক্তির পরীক্ষা নিতে শুরু করল।
ঠিক তখনই, সামনের অন্ধকার ফুঁড়ে রাস্তা আটকে দাঁড়াল এক অতিপ্রাকৃতিক অবয়ব।
রাক্ষস কির্মীর
সে যে কত বড়, তা অন্ধকারেই বোঝা যাচ্ছিল। রূপ বা গায়ের রঙের আগে তার ওই দানবীয় শরীরটাই মানুষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সে আদিম যুগের এক রাক্ষস, যার কাজই হলো বনে আসা পথিকদের ধরে ধরে খাওয়া। তার নাম কির্মীর। আর সে অন্য কেউ নয়, ভীমের হাতে একচক্রা নগরীতে নিহত বকাসুরের আপন ভাই।
রাক্ষসটা বনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শিকার পাওয়ার এক পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে দলটার দিকে তাকাল। তার গায়ের রং জলভরা মেঘের মতো কালো, চোখ দুটো যেন কামারশালার জ্বলন্ত চুল্লি থেকে বের করা লাল লোহা। মাথার জট পাকানো চুলগুলো আগুনের মতো লালচে, আর তামাটে দাড়ি। তার দুই হাতে দুটো জ্বলন্ত মশাল—আলোর জন্য নয়, বরং ওই আলোর নাচনে নিজেকে আরও বেশি ভয়ঙ্কর দেখানোর জন্য। রাক্ষসেরা ভয় দেখাতে ভালোবাসে, কির্মীরও তার ব্যতিক্রম নয়।
যখন সে কথা বলল, সেই আওয়াজটা কানের আগে মানুষের বুকে গিয়ে ধাক্কা মারল।
"কারা তোমরা?" কির্মীর গর্জে উঠল, "এই মাঝরাতে আমার বনে ঢোকার সাহস পাও কোথা থেকে? জানো না এই এলাকা আমার? এই বনের প্রতিটি প্রাণী আমার খাদ্য, আর যারা এ পথ দিয়ে যায় তারা আমার ভোগে লাগে। আজ আমার বড় সৌভাগ্য, অনেকদিন পর এমন জম্পেশ ভোজ পাব। বড় খিদে পেয়েছে আমার!"
ভীমের সম্মুখসমর
ব্রাহ্মণরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলেন। দ্রৌপদী, যিনি গত কয়েকদিনে পৃথিবীর সমস্ত অপমান সহ্য করেছেন, তিনিও ভয়ে পাশের মহিলার হাতটা চেপে ধরলেন। যুধিষ্ঠির, যাঁর মানসিক স্থৈর্য সহজে নড়ে না, তিনিও এই চরম ক্লান্তির মুহূর্তে এক হিমশীতল আশঙ্কায় শিউরে উঠলেন।
কিন্তু একজন মানুষ পিছিয়ে যাননি। তিনি ভীম।
কিছু মানুষ থাকে, বিপদ যত বাড়ে তারা তত শান্ত হয়ে যায়। সাধারণ জীবনে যে তেজ ঘুমিয়ে থাকে, হিংসার মুখোমুখি হলে তা যেন জেগে ওঠে। ভীম এগিয়ে গেলেন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কেউ তাঁকে ভয় দেখায়নি, কেবল তাঁর পথ আটকে সামান্য বিরক্ত করেছে।
ভীম শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি ভীম। পাণ্ডুপুত্র। পবনদেব বায়ুর সন্তান। আর তুমি আমার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছ।"
কির্মীর কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল—যেন পাহাড়ের ওপর থেকে বড় বড় পাথর গড়িয়ে পড়ছে।
"ভীম! ওরে বাবাসে, এই নাম তো আমি জানি! তুই আমার ভাই বককে মেরেছিস, আমার বন্ধু হিড়িম্বিকেও শেষ করেছিস! কতদিন ধরে তোর খোঁজ করছি আমি। আজ দেবতারা নিজে হাতে তোকে আমার সামনে এনে ফেলেছেন। আজ তোকে চিবিয়ে খাব, আর তোর পেছনের ওই ভিতুর ডিমগুলোকে জলখাবার বানাব। এক বসাতেই ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ আর পেটের খিদে—দুটোই মিটবে।"
ভীমের মুখের রেখা একটুও বদলাল না। তিনি বললেন, "তোর ভাই বক আর হিড়িম্বি নিজের পাপেরই শাস্তি পেয়েছে। বক ছিল একটা পরজীবী অত্যাচারী। বেশ তো, যখন এসেছিস, তখন বংশের পুরোনো দেনাপাওনাটা আজ একসঙ্গেই চুকে যাক!"
সেই আদিম লড়াই
এই লড়াইটা কোনো রাজকীয় যুদ্ধ ছিল না। যেখানে কোনো সৈন্যদল নেই, কোনো যুদ্ধকৌশল নেই, সেনাপতির আদেশ নেই। এ ছিল দুই আদিম পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি সংঘাত।
কির্মীর হাতের মশাল দুটো ছুঁড়ে ফেলে মাটি থেকে একটা আস্ত বিশাল শাল গাছ শেকড়সুদ্ধ উপড়ে নিয়ে ভীমের দিকে ছুঁড়ে মারল। ভীম একপাশে সরে গিয়ে নিজেও একটা গাছ উপড়ে নিলেন। তারপর সেই উপড়ানো গাছের গুঁড়ি দিয়ে শুরু হলো একে অপরকে আঘাত করা। সেই কাঠের ভাঙার শব্দে পুরো কাম্যক বন থরথর করে কাঁপতে লাগল, বনের অন্য সব পশুপাখি ভয়ে চুপ মেরে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাছ দুটো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। এবার শুরু হলো খালি হাতের মল্লযুদ্ধ। এটাই ভীমের আসল জায়গা। দশ হাজার হাতির বল তো তিনি বৃথা পাননি! দ্রোণাচার্য আর বলরামের কাছে শেখা গদাযুদ্ধ আর কুস্তির সমস্ত কৌশল তাঁর নখদর্পণে। তার ওপর মনের ভেতর জ্বলছে অপমানের আগুন। শকুনি যেদিন পাশা ফেলেছিল, সেদিন থেকে যে ক্ষোভ বুকের ভেতর জমা হচ্ছিল, আজ তা উগরে দেওয়ার একটা মোক্ষম পাত্র পেয়েছেন ভীম।
রাক্ষসটাও কম যায় না। তার শরীরী ক্ষমতা ছিল অসুরের মতো, সে বারবার নিজের বিশাল শরীর দিয়ে ভীমকে পিষে ফেলার চেষ্টা করছিল। তাদের পায়ের তলায় কাম্যক বনের মাটি আলগা হয়ে ধুলো উড়তে লাগল। চারপাশের গাছপালা মড়মড় করে ভেঙে পড়তে লাগল।
কিন্তু তিনি তো ভীমসেন।
তিনি কির্মীরের সেই বিশাল কোমরটা দু-হাতে জড়িয়ে ধরে এমন এক চাপ দিলেন যে রাক্ষসটা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। তারপর তাকে শূন্যে তুলে নিলেন। এক পাক, দু পাক... ঠিক যেন ঘূর্ণি ঝড়ের মতো রাক্ষসটাকে ঘোরাতে লাগলেন ভীম, যেন নিজের পরিবারের সব অপমান আর লাঞ্ছনার ভার ওই এক মরণঘূর্ণিতে ঢেলে দিচ্ছেন।
তারপর, সর্বশক্তি দিয়ে কির্মীরকে আছাড় মারলেন মাটিতে।
বজ্রপাতে যেমন বড় গাছ ভেঙে পড়ে, কির্মীর ঠিক সেভাবে মাটিতে আছড়ে পড়ল। ভীম তাকে ওঠার আর কোনো সুযোগ দিলেন না। একের পর এক কিল, চড়, আর লাথিতে রাক্ষসের হাড়গোড় গুঁড়ো করে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনের সেই কোলাহল থেমে গেল। কির্মীর নিথর হয়ে পড়ে রইল মাটিতে। শুধু একপাশে পড়ে থাকা রাক্ষসের মশাল দুটো তখনো ধিকধিক করে জ্বলছিল।
### কালরাত্রির পর এক নতুন ভোর
বন আবার শান্ত হলো। এতক্ষণ ভয়ে পাথর হয়ে থাকা ব্রাহ্মণরা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দধ্বনি করে উঠলেন। তাঁরা ভীমের বীরত্বের স্তুতি গাইতে লাগলেন। যুধিষ্ঠিরকে ভাগ্যিস দিলেন এমন এক ভাই থাকার জন্য।
যুধিষ্ঠির এগিয়ে এসে ভীমকে জড়িয়ে ধরলেন। এ কোনো রাজার যোদ্ধাকে আলিঙ্গন নয়, এ এক বড় ভাইয়ের পরম মমতা, যিনি এইমাত্র তাঁর ছোট ভাইকে এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে দেখলেন।
দ্রৌপদী ভীমের দিকে তাকালেন। সেই চাউনিতে ছিল এক অদ্ভুত মিশ্রণ—সেখানে কৃতজ্ঞতা ছিল, আবার ছিল এক হিংস্র তৃপ্তি। দ্রৌপদী রাজসভার অপমান ভোলেননি, নিজের প্রতিজ্ঞার কথা প্রতি মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ে। আর ভীম যেভাবে কোনো দ্বিধা না করে বনের সমস্ত অন্ধকারকে একাই উপড়ে ফেলতে পারেন, তা দেখে দ্রৌপদীর মন শান্ত হলো। ভীম তাঁদের করা প্রতিজ্ঞা ভুলবেন না, ভুলতে পারেন না।
পাণ্ডবেরা আরও গভীর বনে এগিয়ে গিয়ে সে রাতের মতো শিবির স্থাপন করলেন। যে রাতটা এত রক্তক্ষয়ী হতে পারত, তা একসময় কেটে গিয়ে এক সাধারণ, শান্ত ভোরে রূপ নিল।
গল্প শেষ করে বিদুর চুপ করলেন। ধৃতরাষ্ট্রের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি। অন্ধ রাজা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না।
তিনি বিদুরকে ডেকেছিলেন এটা বুঝতে যে, মহর্ষি মৈত্রেয় কেন ভীমকে অতটা বিপজ্জনক বলে গেছেন। ধৃতরাষ্ট্র এবার তা হাড়েমাসে টের পেলেন। বিদুরের গল্প শেষ হওয়ার পর ঘরের ভেতর যে স্তব্ধতা নেমে এল, তা আসলে এক অপরাধী পিতার অবরুদ্ধ চিত্তের নীরবতা—যে এতদিন সত্যটা এড়িয়ে যাওয়ার হাজারটা বাহানা খুঁজছিল, আজ সে চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদম নির্বাক হয়ে গেছে।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ৬ষ্ঠ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
Go to all publications for full reading as per index

Comments
Post a Comment