নল-দময়ন্তী কথা: (চতুর্থ পর্ব ) দেব-আশীর্বাদ ও সর্বনাশের বীজ

 


নল-দময়ন্তী কথা: (চতুর্থ পর্ব ) দেব-আশীর্বাদ ও সর্বনাশের বীজ

যুধিষ্ঠির মহর্ষি বৃহদশ্বের কাছ থেকে এমন এক রাজার গল্প শুনতে চেয়েছিলেন, যিনি রাজা যুধিষ্ঠিরের মতোই অত্যন্ত দুর্ভাগ্যপীড়িত ছিলেন। তাই বৃহদশ্ব গল্পটি শুরু করেছিলেন।

এটি নল ও দময়ন্তীর পর্বটির চতুর্থ পর্ব। তৃতীয় পর্বটি আগেই প্রকাশিত  হয়েছে।

তৃতীয়  পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

১. নাগরাজ কর্কোটক ও নলের রূপান্তর

নিশীথরাতে নিদ্রিতা স্ত্রীকে বনের মধ্যে ফেলে রেখে নল যখন একা হেঁটে চললেন, তখনই এক তীব্র অনুশোচনা আর গভীর বিষাদ এসে গ্রাস করল তাঁকে। কলির মায়াজাল তখনও তাঁর মস্তিস্ককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তাই তিনি পিছন ফিরে তাকানোর পথটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। লক্ষ্যহীন, উদ্ভ্রান্তের মতো গভীর অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে চললেন নিষধরাজ। নিজের এই চরম পতন আর লজ্জার গ্লানিতে তাঁর চেতনা তখন প্রায় লুপ্ত।

এমনই এক রাতে, বনের এক শূন্য প্রান্তরে হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ল এক লেলিহান অগ্নিকুণ্ড। সেই দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের মধ্য থেকে এক রহস্যময় কণ্ঠস্বর তাঁকে নাম ধরে ডেকে উঠল।

বিস্মিত নল আগুনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, শিখার মাঝখানে আটকা পড়ে আছে এক অতিকায় সর্প। আগুনের বেষ্টনী ভেদ করে পালাবার কোনো পথ নেই তার। নলকে দেখে সেই সর্পরাজ আবার বলে উঠল, "হে রাজন নল! আমি নাগরাজ কর্কোটক। একদা মহর্ষি নারদকে প্রতারণা করার অপরাধে তিনি আমাকে এই অভিশাপ দিয়েছিলেন। আজ আমি এখানে অবরুদ্ধ। মহর্ষিরই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, একমাত্র তুমিই পারবে আমাকে এই অগ্নিদাহ থেকে মুক্তি দিতে। আর তোমাকে মুক্ত করার বিনিময়ে তুমিও খুঁজে পাবে তোমার জীবনের এক অদ্ভুত রূপান্তর। আর দেরি কোরো না, আমাকে এই আগুন থেকে উদ্ধার করো, আমি তোমার এই ঋণ শোধ করব।"

ক্লান্ত এবং প্রায় মৃতপ্রায় নল এই আর্ত প্রাণীর কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না। তিনি সমস্ত ভয় দূরে সরিয়ে আগুনের ভেতরে হাত বাড়িয়ে কর্কোটককে তুলে নিলেন এবং আগুনের বাইরে নিয়ে এলেন। মুক্ত হয়েই কর্কোটক নলকে বললেন, "রাজন, এবার তুমি মাটির দিকে তাকিয়ে এক এক করে পা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাও, আর প্রতি পদক্ষেপে গুনতে থাকো।"

নল এক, দুই করে হাঁটতে লাগলেন। যেই তিনি দশম পদক্ষেপে পৌঁছলেন, অমনি কর্কোটক দংশন করল তাঁর গায়ে। এই দংশনের মধ্যে কোনো হিংসা বা ক্রোধ ছিল না, ছিল এক গূঢ় উদ্দেশ্য। কামড় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নল অনুভব করলেন তাঁর সর্বাঙ্গে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। তাঁর সেই অনিন্দ্যসুন্দর, রাজকীয় অবয়ব চোখের পলকে সংকুচিত ও বিকৃত হয়ে গেল। গায়ের উজ্জ্বল বর্ণ হয়ে উঠল কৃষ্ণকায়। মুহূর্তে তিনি রূপান্তরিত হলেন এক খর্বকায়, স্থূলকায় এবং কুৎসিত পুরুষে— যাকে দেখে চেনা তো দূরের কথা, অতীতে কেউ তাঁকে রাজা বলে জানত, তা কল্পনা করাও অসম্ভব।

কর্কোটক তখন শান্ত স্বরে বলল, "হে নল, এই রূপান্তর আসলে তোমার প্রতি আমার এক পরম করুণা। ঘোর কলি, যে তোমাকে তিলে তিলে ধ্বংস করেছে, সে এখনও তোমার ভেতরেই বাসা বেঁধে আছে। আমার এই নীল বিষ এখন তোমার রক্তে মিশে কলিকে চরম যন্ত্রণা দিচ্ছে। খুব শীঘ্রই এই বিষের তীব্রতায় সে তোমার শরীর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। যতদিন না সেই শুভদিন আসছে, তুমি অযোধ্যার রাজা ঋতুপর্ণের দরবারে চলে যাও। সেখানে নিজের পরিচয় গোপন করে 'বাহুক' নামে তাঁর সেবা করো। রাজা ঋতুপর্ণ অক্ষহৃদয় এবং রথ চালনায় অত্যন্ত দক্ষ। অশ্ববিদ্যায় তুমি পারদর্শী হলেও, তাঁর কাছ থেকে এমন কিছু শেখার আছে যা তুমি এখনও জানো না। আর শোনো, যখনই তুমি তোমার এই প্রকৃত রূপ ফিরে পেতে চাইবে, মনে মনে শুধু আমার কথা স্মরণ কোরো আর এই সাধারণ বস্ত্রখণ্ডটি পরিধান কোরো, তুমি আবার আগের নল হয়ে উঠবে।"

নলকে একটি জাদুকরী বস্ত্র দিয়ে নাগরাজ কর্কোটক অরণ্যের অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেলেন। আর নল, নিজের চেনা রূপ-যশ-ঐশ্বর্য হারিয়ে, 'বাহুক' নাম নিয়ে অযোধ্যার পথের দিকে পা বাড়ালেন।

২. ঋতুপর্ণের রাজসভায় বাহুক

অযোধ্যায় পৌঁছে নল রাজা ঋতুপর্ণের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং নিজেকে একজন দক্ষ সারথি ও অশ্বপালক হিসেবে পরিচয় দিলেন। রাজা ঋতুপর্ণ সেই খর্বকায়, কুৎসিত মানুষটির চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলেন, পশুপালনে এর এক অদ্ভুত সহজাত ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সানন্দে বাহুককে নিজের রাজসভায় স্থান দিলেন।

বাহুক— যে এখন নিজের আসল পরিচয় শুধু সমাজেই নয়, নিজের মনের গভীরেও লুকিয়ে রেখেছে— অচিরেই প্রমাণ করল যে অশ্ব চালনায় এবং তাদের পরিচর্যায় তার সমকক্ষ সমগ্র আর্যাবর্তে কেউ নেই। শুধু তাই নয়, যমরাজের সেই পুরনো বরের কারণে তার রান্নার হাত ছিল অসাধারণ। বাহুকের তৈরি সুস্বাদু ব্যঞ্জন ঋতুপর্ণের রাজকীয় ভোজনশালাকে প্রতিনিয়ত তৃপ্ত করত। অল্পদিনের মধ্যেই সে রাজার পরম বিশ্বস্ত পাত্র হয়ে উঠল। কিন্তু সেই রাজসভার কেউ, এমনকি স্বয়ং রাজা ঋতুপর্ণও বিন্দুমাত্র টের পাননি যে, তাদের এই অতি সাধারণ দেখতে দাসটি আসলে এককালের প্রতাপশালী রাজা এবং পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে রূপবতী নারী দময়ন্তীর স্বামী।

 ৩. বিদর্ভে মিলনের বার্তা

এদিকে বিদর্ভরাজ ভীমক জানতে পারলেন যে তাঁর কন্যা ও জামাতা অরণ্যের গহীন অন্ধকারে কোথাও হারিয়ে গেছেন। শোকার্ত রাজা তৎক্ষণাৎ রাজ্যের সমস্ত ব্রাহ্মণদের ডেকে পাঠালেন। তিনি ঘোষণা করলেন, "যিনি নল ও দময়ন্তীকে খুঁজে বের করতে পারবেন, তাঁকে এক সহস্র গাভী এবং একটি বিশাল ভূসম্পত্তি পুরস্কার দেওয়া হবে। আর যিনি শুধু তাদের কোনো সন্ধান এনে দিতে পারবেন, তিনিও পাবেন এক সহস্র গাভী।" রাজার এই ঘোষণা শুনে ব্রাহ্মণেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন।

বহু খোঁজাখুঁজির পর, সুদেব নামের এক ব্রাহ্মণ এসে পৌঁছলেন চেদি রাজ্যের রাজধানীতে। সেখানে রাজপ্রাসাদের এক কোণে এক মলিনবসনা, বিষণ্ণ নারীকে দেখে সুদেবের চেনা চেনা ঠেকল। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তিনি চিনতে পারলেন, এ তো স্বয়ং দময়ন্তী!

সুদেব তাঁর সামনে গিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, "হে বিদর্ভনন্দিনী, আমি মহারাজ ভীমকের নির্দেশে তোমাদের সন্ধানে চর্তুদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি তোমার ভ্রাতার পরম মিত্র। বিদর্ভে তোমার পিতামাতা এবং সন্তানরা সকলেই কুশলে আছেন, কিন্তু তোমার আর নলের চিন্তায় তাঁরা দিনরাত চোখের জল ফেলছেন। তোমাদের খোঁজার জন্য মহারাজ সমস্ত পৃথিবীতে ব্রাহ্মণদের পাঠিয়েছেন, আমি তাঁদেরই একজন।"

সুদেবকে চিনতে পেরে দময়ন্তী ব্যাকুল হয়ে নিজের পরিবারের সকলের কুশল সংবাদ জানতে চাইলেন এবং কথা বলতে বলতেই তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে এল। চেদি রাজকুমারী সুনন্দা এই দৃশ্য দেখে দ্রুত তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে সমস্ত কথা জানালেন। চেদির রানি স্বয়ং কৌতূহলী হয়ে সুদেবের কাছে এলেন এবং জানতে চাইলেন এই রহস্যময়ী নারীর পরিচয়।

সুদেব তখন সজল চোখে দময়ন্তীর জীবনের সেই করুণ ও গৌরবময় কাহিনীর অবতারণা করলেন। সব শুনে চেদির রানি স্তব্ধ হয়ে গেলেন এবং পরম স্নেহে দময়ন্তীকে বুকে টেনে নিলেন। রানি বললেন, "প্রিয়া, তুমি তো আমার দিদির কন্যা! আমরা দুজনেই দশার্ণরাজ সুদামার কন্যা। এই রাজপ্রাসাদ, এই সমস্ত ঐশ্বর্য যেমন আমার, তেমনই তোমারও।"

মাসির স্নেহের আশ্রয়ে দময়ন্তীর তপ্ত মন কিছুটা শান্ত হলো। তিনি বললেন, "মাসি, তোমার এই ভালোবাসার ঘরে আমি হয়তো আরও কিছুদিন কাটাতে পারতাম। কিন্তু আমার ছোট ছোট সন্তানরা আর বৃদ্ধ পিতামাতা বিদর্ভে আমার জন্য চাতকের মতো পথ চেয়ে বসে আছে। তুমি আমাকে আমার বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।"

চেদির রানির কাছ থেকে অশ্রুসজল বিদায় নিয়ে দময়ন্তী অবশেষে বিদর্ভে ফিরে এলেন। মহারাজ ভীমক দুই হাত বাড়িয়ে তাঁর ভাগ্যহতা কন্যাকে বুকে টেনে নিলেন। সন্তানদের ফিরে পেয়ে দময়ন্তীর শূন্য কোল আবার পূর্ণ হলো। আর সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ সুদেব, রাজার প্রতিশ্রুতি মতো লাভ করলেন এক সহস্র গাভী এবং এক বিশাল জমিদারি।

বিদর্ভের আকাশে মেঘ কেটে আলোর আভাস দেখা দিল, কিন্তু দময়ন্তীর মনের মণিকোঠায় তখনও জেগে রইল একটাই প্রশ্ন— নল এখন কোথায়?

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৫ ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।এই পর্বটি নল ও দময়ন্তী ষষ্ঠ পর্বে  চলবে। এখন চলছে নল ও দময়ন্তীর চতুর্থ পর্ব ।


পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পেতে এখানে ক্লিক  করুন ।


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন




Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া