পুরু বংশের বর্ণনা
পুরু বংশের বর্ণনা
মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত চন্দ্রবংশের অন্যতম গৌরবময় শাখা হলো পুরু রাজবংশ বা পৌৰব রাজবংশ।
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে দেব-মানবের সংযোগ এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এই রাজবংশের ইতিহাস ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য ঐতিহ্য। নিচে মহাভারত অনুসারে এই বংশের উৎপত্তি এবং রাজা পুরু পর্যন্ত এর বিস্তার একটি প্রবন্ধ আকারে আলোচনা করা হলো:
মহাভারত অনুসারে পুরু রাজবংশের ইতিহাস
ভূমিকা: সৃষ্টির আদি উৎস
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই বংশের যাত্রাপথ শুরু হয়েছে সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার মানসপুত্রদের হাত ধরে। প্রজাপতি দক্ষের কন্যা অদিতির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিবস্বান (সূর্য)। বিবস্বানের পুত্র ছিলেন বৈবস্বত মনু, যাঁকে সনাতন ঐতিহ্যে মানবজাতির আদি পিতা গণ্য করা হয়। মনুর কন্যা ইলার গর্ভে এবং চন্দ্রপুত্র বুধের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন পুরূরবা। এই পুরূরবা ছিলেন এক পরম পরাক্রমশালী রাজা, যাঁর হাত ধরে পৃথিবীতে চন্দ্রবংশের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
পুরূরবা থেকে রাজা যযাতি
পুরূরবার জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন আয়ু। আয়ুর বংশেই জন্ম নেন মহাতেজস্বী রাজা নহুষ, যিনি তাঁর পুণ্যবলে একসময় স্বর্গের ইন্দ্রত্ব লাভ করেছিলেন। নহুষের পুত্র ছিলেন রাজা যযাতি। মহাভারতের ইতিহাসে যযাতি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মোড় পরিবর্তনকারী চরিত্র। রাজা যযাতির দুই রাণী ছিলেন—দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা। দেবযানী ছিলেন অসুরগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা এবং শর্মিষ্ঠা ছিলেন অসুররাজ বৃষপর্বার কন্যা।
বংশ বিভাজন ও রাজপুত্রদের ভূমিকা
রাজা যযাতির দুই রাণীর গর্ভে পাঁচজন বীর পুত্রের জন্ম হয়। দেবযানীর গর্ভে জন্ম নেন দুই পুত্র—যদু ও তুর্বসু। অন্যদিকে শর্মিষ্ঠার গর্ভে জন্ম নেন তিন পুত্র—দ্রুহ্যু, অনু এবং পুরু।
পরবর্তীকালে এই পাঁচ পুত্রকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে পাঁচটি বিখ্যাত রাজবংশের সৃষ্টি হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুর নামানুসারে ইতিহাসের বিখ্যাত যাদব বংশের উৎপত্তি হয়, যে বংশে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর কনিষ্ঠ পুত্র পুরুর নামানুসারে সূচনা হয় পৌরব বংশের।
পুরুর আত্মত্যাগ ও রাজ্যাভিষেক
মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত একটি বিশেষ ঘটনার কারণে কনিষ্ঠ পুত্র হওয়া সত্ত্বেও পুরু এই রাজবংশের মূল উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন। শ্বশুর শুক্রাচার্যের অভিশাপে রাজা যযাতি অকালেই জরাগ্রস্ত ও বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। কামনাবাসনা অপূর্ণ থাকায় তিনি তাঁর পুত্রদের কাছে তাঁদের যৌবন ভিক্ষা চান এবং নিজের বার্ধক্য তাঁদের দিতে চান। যদুসহ বাকি চার পুত্র পিতার এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান।
কিন্তু পিতৃভক্তিতে অনন্য কনিষ্ঠ পুত্র পুরু সানন্দে পিতার বার্ধক্য নিজের শরীরে গ্রহণ করেন এবং নিজের চির-যৌবন পিতাকে দান করেন। সহস্র বছর পর যযাতি যখন নিজের ভুল বুঝতে পারেন, তখন তিনি পুরুকে তাঁর যৌবন ফিরিয়ে দেন। জ্যেষ্ঠ পুত্ররা পিতাকে অবজ্ঞা করায় যযাতি তাঁদের সাম্রাজ্যের মূল অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন এবং পরম ধার্মিক ও ত্যাগী কনিষ্ঠ পুত্র পুরুকে পৃথিবীর রাজচক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন।
রাজা পুরু ও পৌরব বংশের বিস্তার
সিংহাসনে আরোহণ করার পর রাজা পুরু অত্যন্ত ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে রাজ্য পরিচালনা করেন। মহাভারতের বিবরণ অনুযায়ী, রাজা পুরুর পত্নী ছিলেন রাণী কৌশল্যা। রাজা পুরু ও রাণী কৌশল্যার মিলনে এই বংশের পরবর্তী প্রদীপ রাজা জনমেজয় (প্রথম) জন্মগ্রহণ করেন। পুরুর নামানুসারেই এই বংশের নাম হয় 'পুরু বংশ' বা 'পৌরব বংশ'।
উপসংহার
পুরু রাজবংশ কেবল একটি রাজনৈতিক বংশলতিকা নয়, এটি ত্যাগ, ভক্তি এবং সনাতন ধর্মের আদর্শের প্রতীক। এই পুরু বংশেই পরবর্তীকালে জন্ম নিয়েছিলেন রাজা দুষ্মন্ত, তাঁর মহিমান্বিত পুত্র ভরত (যাঁর নামানুসারে আমাদের দেশের নাম 'ভারতবর্ষ' হয়েছে), এবং রাজা কুরু (যাঁর নামানুসারে কুরুবংশ নাম হয়)। সর্বশেষে, মহাভারতের মূল চরিত্র—ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, কৌরব এবং পাণ্ডবগণ সকলেই ছিলেন রাজা পুরু ও রাণী কৌশল্যার এই পবিত্র বংশেরই উত্তরসূরি।

Comments
Post a Comment