কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান


কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান

মর্ত্যের ধুলোবালি আর রক্তের তৃষ্ণা থেকে অনেক দূরে, অমরাবতীর স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোয় সেদিন এক অদ্ভুত নাটক তৈরি হচ্ছিল। দেবরাজ ইন্দ্রের আমন্ত্রণে অর্জুন তখন স্বর্গলোকে। উদ্দেশ্য—দিব্য অস্ত্র লাভ এবং গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্য-গীতের শিক্ষা নেওয়া। অর্জুনের সেই ক্লান্তিহীন, পেশীবহুল শরীর, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মহাসমুদ্রের গাম্ভীর্য আর বীরত্ব দেখে স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা উর্বশীর রক্তে দোলা লাগল। যে উর্বশীর এক একটি পলকপাতে ত্রিলোকের মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভেঙে যায়, সে আজ মর্ত্যের এক ধনুর্বাজির সামনে ব্যাকুল, কামনার আগুনে দগ্ধ।

দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই উর্বশীকে পাঠালেন অর্জুনের কক্ষে। বসন্তের মায়াবী বাতাসে উর্বশী যখন অর্জুনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর পরনে সূক্ষ্ম মেঘের মতো বসন, চোখে মদিরার আহ্বান, আর ঠোঁটে এক আদিম আদিখ্যেতা। স্বর্গের নিয়ম আলাদা; সেখানে সম্পর্ক মানে শুধুই মুহূর্তের আনন্দ, সেখানে কোনো মর্ত্যের বন্ধন নেই।

কিন্তু অর্জুন? তিনি তো শুধু এক জন মহান যোদ্ধা নন, তিনি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির ধারক। উর্বশীর সেই উত্তাল রূপ দেখে অর্জুন কামনায় অন্ধ হলেন না। উল্টে, তাঁর দুই চোখ জুড়ে নেমে এল পরম ভক্তি আর বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি দুই হাত জোড় করে, মাথা নিচু করে প্রণাম করলেন স্বর্গের সেই অনিন্দ্যসুন্দরীকে।

উর্বশী বিস্মিত, কিছুটা ক্ষুব্ধ। পুরুষাঙ্গের এমন শীতলতা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি অধীর হয়ে বললেন, "হে অর্জুন, আমি কোনো মর্ত্যের নারী নই যে সমাজ আর লোকলজ্জার নিয়মে বাঁধা পড়ব। আমি অপ্সরা। আজ আমি তোমার কাছে এসেছি প্রেমিকা হিসেবে, কামনার ডালি নিয়ে। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিও না।"

অর্জুন অত্যন্ত শান্ত, অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "দেবী, আপনি আমার কাছে পরম পূজনীয়। আপনি আমার জননী।"

জননী! স্বর্গের অপ্সরা এই সম্বোধনে শিউরে উঠলেন। এ তো শুধু প্রত্যাখ্যান নয়, এ যেন তাঁর চিরযৌবনা রূপের অবমাননা! কিন্তু অর্জুন ভুল কিছু বলেননি।  অর্জুনের হৃদয়ে তখন কাজ করছিল বংশের এক সুপ্রাচীন ইতিহাসবোধ। অর্জুন জানতেন তাঁর শিকড়ের কথা।

বহু যুগ আগে, চন্দ্রবংশের তেজস্বী রাজা পুরূরবার রূপে মুগ্ধ হয়ে এই উর্বশীই মর্ত্যে এসে তাঁর ঘর বেঁধেছিলেন। তাঁদের প্রেম থেকে জন্ম নিয়েছিল আয়ুস, তারপর একে একে নহুষ এবং যযাতি। যযাতির কনিষ্ঠ পুত্র পুরু—যাঁর নাম থেকে তৈরি হয়েছিল মহান পুরু রাজবংশ। সেই বংশেরই প্রদীপ ভরত, কুরু, শান্তনু, বিচিত্রবীর্য হয়ে পাণ্ডু, আর পাণ্ডুর ঔরসে অর্জুনের জন্ম।

উর্বশী ➔ পুরূরবা ➔ আয়ুস ➔ নহুষ ➔ যযাতি ➔ পুরু ➔ ভরত ➔ কুরু ➔ শান্তনু ➔ পাণ্ডু ➔ অর্জুন


অর্জুন উর্বশীকে মনে করিয়ে দিলেন সেই অমোঘ সত্য—"দেবী, কুরুবংশের আদিজননী আপনি। পুরু রাজবংশের রক্ত যাঁর গর্ভে প্রথম স্পন্দিত হয়েছিল, তিনি আমার মা ছাড়া আর কী হতে পারেন? মর্ত্যের কোনো পুত্র কি তাঁর মায়ের দিকে কামনার চোখে তাকাতে পারে?"

অপ্সরার অহংকারে এই যুক্তি প্রচণ্ড আঘাত করল। স্বর্গের কামনার কাছে মর্ত্যের এই নীতিবোধ উর্বশীর সহ্য হলো না। রাগে, অপমানে কাঁপতে কাঁপতে তিনি অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন—"যে পুরুষত্ব নিয়ে তোমার এত অহংকার, যে রূপের গরবে তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে, সেই পুরুষত্ব তোমার লোপ পাক! তুমি নপুংসক হয়ে বেঁচে থাকো।"

অর্জুন মাথা পেতে নিলেন সেই অভিশাপ। কিন্তু মহাকালের এক নিজস্ব চমৎকারিত্ব থাকে। উর্বশীর এই অভিশাপই পরবর্তীতে পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময় অর্জুনের সবচেয়ে বড় বর্ম হয়ে উঠেছিল। বিরাট রাজার প্রাসাদে যখন নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল, তখন অর্জুন এই অভিশাপের ফলেই ‘বৃহন্নলা’ রূপ ধারণ করতে পেরেছিলেন। এক বছর অন্তঃপুরের নারীদের নৃত্য ও গীত শিখিয়ে তিনি অক্ষত অবস্থায় কাটিয়ে দেন সেই কঠিন সময়। উর্বশীর ক্রোধ শেষ পর্যন্ত অর্জুনের জন্য আশীর্বাদ হয়েই নেমে এসেছিল।

মর্ত্যের নৈতিকতা আর স্বর্গের কামনার এই দ্বন্দ্বে জয় হয়েছিল অর্জুনের সেই সুগভীর শ্রদ্ধাবোধের, যা রক্তের সম্পর্ককে শুধু শরীর দিয়ে নয়, ইতিহাসের পবিত্র সুতো দিয়ে বেঁধেছিল।

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন,অথবা নিচের comment boxএ comment করুন:

WhatsApp করুন

Comments

Popular posts from this blog

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া