কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক
কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক
বিষ কেবল প্রাণ হরণ করে না, বিষের এক নিজস্ব অহংকার আছে। সে চারপাশের বাতাস, জল আর মাটিকে নিজের মতো করে কলুষিত করতে চায়। যমুনার সেই গভীর দহটি বহু বছর ধরে সেই রকমই এক অহংকারী বিষের নীল চাদরে ঢাকা পড়েছিল। বৃন্দাবনের মানুষ নদীর দিকে যাওয়া ভুলেই গিয়েছিল। গাভীগুলো জল ছুঁত না, ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি আচমকা ডানা ঝটপট করে মরে ভেসে উঠত কালো জলের বুকে। তীরের কদম্ব গাছটি হয়ে গিয়েছিল অবশ, কুচকুচে কালো। যমুনার যে জল হওয়া উচিত ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ আর শীতল, তা এক উগ্র, তপ্ত বিষের কামড়ে সারাক্ষণ ফুটত, বুদবুদ তুলত।
সেই দহের অতল অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল কালীয়। তিন ভুবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে অহংকারী নাগরাজ। সে ভাবত, এই নদী, এই জল—সব তার নিজস্ব সাম্রাজ্য। চারপাশের এই মৃত্যু আর ধ্বংসকে সে তার রাজকীয় অধিকার বলেই ধরে নিয়েছিল।
কিন্তু নাগরাজ ভুল ভেবেছিল। আর সেই ভুলটা ভেঙে দেওয়ার জন্য যমুনার ঘাটে এসে দাঁড়াল এক নীল রঙের বালক।
রামনক দ্বীপ থেকে বৃন্দাবন: এক পলাতকের ইতিহাস
কালীয় চিরকাল যমুনার বাসিন্দা ছিল না। তার আসল ঘর ছিল মহাসমুদ্রের বুকে এক নির্জন ভূখণ্ড—রামনক দ্বীপে। কিন্তু সেখান থেকে তাকে তাড়া খেতে হয়েছিল সাপেদের চিরশত্রু, মহাবলশালী পক্ষীরাজ গরুড়ের ভয়ে। বিষ্ণুর বাহন গরুড়কে ভয় পায় না, তিন ভুবনে এমন সাপের জন্ম হয়নি। সেই ভয়টা কোনো যুক্তি মানত না, কারণ গরুড়ের নখ আর চঞ্চুর সামনে কোনো বিষই টেকেনি।
তবে বৃন্দাবনের একটা মস্ত সুবিধে ছিল। এখানকার সৌভরি মুনি একবার এক অপরাধে গরুড়কে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, পক্ষীরাজ যদি কোনোদিন বৃন্দাবনের সীমানায় পা রাখে, তবে তার মৃত্যু হবে। কালীয় ছিল চতুর। সে ভাবল, মহাবিশ্বের যেখানে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুর ঢোকা নিষেধ, সেখানেই আস্তানা গাড়তে হবে। সে সপরিবারে এসেঁ জাঁকিয়ে বসল যমুনার এই নিভৃত দহে।
তার পর থেকেই শুরু হলো যমুনার সর্বনাশ। চার ক্রোশ জুড়ে জল বিষাক্ত হয়ে ফুটতে লাগল। শুধু সেই অভিশপ্ত কদম্ব গাছটি কোনোমতে মরণ-কামড় দিয়ে বেঁচে রইল তীরের পাথরে। কালীয়র বিশাল শরীর থেকে দিনরাত যে কালকূট নিভে আসত, তা জলকে শুধু কালো করেনি, এক অদৃশ্য উত্তাপে পুড়িয়ে মারছিল চারপাশকে। বাতাস সেই বিষের কণা উড়িয়ে নিয়ে যেত দূর-দূরান্তে। কালীয় অবশ্য এসব ইচ্ছে করে করত না। সে তার নিজের স্বভাব অনুসারেই বিষ উগরে যেত। বৃন্দাবনের কান্নায় তার কিছু এসে যেত না। সে নিজে সুরক্ষিত, ব্যস—এটুকুই ছিল তার জগৎ। ভাগবতের ভাষায়, এটাই হলো অহংকারের চরম রূপ, যেখানে নিজের অস্তিত্ব অন্যের বিনাশের কারণ জেনেও কোনো বিকার থাকে না।
যমুনার তীরে রাখাল বালক
নন্দদুলাল কৃষ্ণ তখন বৃন্দাবনের মাঠে মাঠে ধেনু চরায়। গোচারণের মাঠ, অরণ্য আর যমুনা—এই নিয়েই তার কৈশোর। সে এক অদ্ভুত ছেলে। বৃন্দাবনের মানুষ তাকে ভালোবাসত, কিন্তু তার ভেতরের মায়াটুকু পুরোপুরি বুঝতে পারত না। তার মধ্যে এক আশ্চর্য সহজভাব ছিল, যেন এই জগতের সব রহস্য সে জন্ম থেকেই চিনে বসে আছে।
আর তাকে চোখে চোখে রাখাও ছিল এক দায়। কখন যে সে কোথায় চলে যায়! যশোদা মা সারাক্ষণ বুক দুরুদুরু করে মরতেন। কংসের পাঠানো একের পর এক রাক্ষস-দানবকে সে যেভাবে হেসে খেলে হারিয়ে দিয়েছে, তাতে তার মনে ভয়ের কোনো লেশমাত্র ছিল না। সেই কৃষ্ণ একদিন খেলাচ্ছলেই তার সখাদের নিয়ে এসে হাজির হলো কালীয়র সেই নিষিদ্ধ দহের কাছে। কৃষ্ণ তো সাধারণ বালক নয়, সে স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। হয়তো সে নিজেই এক অলক্ষ্য চাল চালছিল।
হঠাৎ করেই তাদের খেলার বলটি গিয়ে পড়ল সেই টগবগে কালো জলের মাঝখানে।
সখারা চিৎকার করে ওঠার আগেই, কৃষ্ণ তরতর করে চড়ে বসল সেই কদম্ব গাছটায়। তার পর, কোনো বাধা মানার আগেই, সটান ঝাঁপ দিল সেই বিষাক্ত যমুনার বুকে। তীরে তখন হাহাকার। গোকুলের মানুষ ছুটে এসেছে ঘাটে। যশোদা আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছেন, নন্দ নির্বাক। কিন্তু সেই কালান্তক জলের নিচে নামার সাহস কারোর ছিল না।
অতল জলের যুদ্ধ
দহের নিচে, যেখানে অন্ধকার সবচেয়ে ঘন আর জল সবচেয়ে তপ্ত, সেখানে কালীয় টের পেল এক অনধিকার প্রবেশ। একটা ছোট্ট বালক, তার সমস্ত বিষের তোয়াক্কা না করে, অবলীলায় হেঁটে বেড়াচ্ছে তার তলদেশে! কালীয় তার বিশাল শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে কুণ্ডলী খুলে উঠে দাঁড়াল।
নিমেষের মধ্যে নাগরাজ তার শত পাকে জড়িয়ে ধরল কৃষ্ণের কোমল শরীর। বিষাক্ত দাঁত বসিয়ে দিল তার বুকে। সেই বাঁধন এমন ছিল যে, কোনো সাধারণ মানুষের হাড়গোড় এতক্ষণে গুঁড়ো হয়ে জল হয়ে যেত।
তীরে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখছিল, জল কখনো টগবগ করে উঠছে, কখনো স্থির হয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণ আর উঠে আসছে না। যশোদার কান্না তখন যমুনার বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
কিন্তু জলের নিচে তখন অন্য খেলা শুরু হয়েছে। কালীয় বুঝতে পারল, যাকে সে পেঁচিয়ে ধরেছে, সে ক্রমশ ভারী হচ্ছে। কৃষ্ণ নিজের শরীরকে প্রসারিত করতে লাগলেন। এমন এক মহাজাগতিক চাপ তৈরি হলো যে কালীয়র শতপাক আলগা হয়ে গেল। সে বাধ্য হলো কৃষ্ণকে ছেড়ে দিতে। কৃষ্ণ আবার জলের নিচে নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তার পর শুরু হলো তার ওপরে ওঠার পালা।
শত ফণার ওপর মায়াবী নর্তন
কালীয়র একশো একটা ফণা। ক্রোধে, অপমানে সে যখন ফণা তুলে ফুঁসে উঠল, কৃষ্ণ হালকা চালে লাফিয়ে উঠলেন সেই ফণার ওপর। আর তার পরেই শুরু হলো সেই অলৌকিক নৃত্য।
সে নাচ কোনো যোদ্ধার হিংস্র পদক্ষেপ নয়। এ এক অদ্ভুত ছন্দ, যাতে জড়িয়ে ছিল সৃষ্টির আনন্দ আর মহাবিশ্বের অমোঘ শাসন। ভাগবত বলে, কৃষ্ণ যখন নাচছিলেন, তখন তাঁর চরণে ভর করেছিল সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ওজন।
মহাবিশ্বের ভার: প্রতিটি পদক্ষেপে কৃষ্ণ কালীয়র এক একটি উদ্ধত ফণাকে মাটির দিকে নামিয়ে আনছিলেন। একটা ফণা মাথা তুলতে গেলেই কৃষ্ণের চরণ সেখানে আঘাত করছিল।
সারা দহের জল থরথর করে কাঁপতে লাগল। তীরের মানুষ বিস্ময়ে দেখল, জলের ওপর শত ফণার মাঝখানে নীলমণি কৃষ্ণ নাচছেন। কালীয়র দর্প চূর্ণ হতে বেশি সময় লাগেনি। তার মুখ দিয়ে বিষের বদলে রক্ত উঠতে শুরু করল। যে বিশাল শরীর নিয়ে সে এতকাল অহংকার করত, তা এবার অবশ হয়ে ভেঙে পড়তে লাগল। কালীয় বুঝতে পারল, এ কোনো সাধারণ মানবশিশু নয়—এ স্বয়ং চরাচরের ঈশ্বর।
নাগপত্নীদের আকুতি ও ক্ষমা
ঠিক এই সময়েই জলের নিচ থেকে উঠে এল এক করুণ সুর। কালীয়র পত্নীরা যখন দেখল তাদের স্বামী আর বাঁচে না, তখন তারা এলোকেশে, অলঙ্কারহীন অবস্থায় কৃষ্ণের চরণে এসে লুটিয়ে পড়ল।
তারা কোনো তর্ক করল না, কোনো শর্ত দিল না। তারা শুধু চাইল তাদের স্বামীর প্রাণভিক্ষা। তারা বুঝল, এই বিশ্বেশ্বরের সামনে অহংকার চলে না, শুধু আত্মসমর্পণ চলে। কৃষ্ণ নাচ থামালেন। তাঁর মুখে কোনো জয়ের অহংকার ছিল না, ছিল এক গভীর প্রশান্তি। তিনি তো কালীয়কে বধ করতে আসেননি, এসেছিলেন তার ভেতরের বিষটুকু শোধন করতে।
জ্ঞান ফেরার পর কালীয় নিজেও কৃষ্ণের চরণে মাথা নোয়াল। সে প্রতিজ্ঞা করল, আর কোনোদিন সে কারও ক্ষতি করবে না।
নির্বাসন ও পরম আশীর্বাদ
কৃষ্ণ তাকে আদেশ দিলেন, "তুমি সপরিবারে এই যমুনা ত্যাগ করে আবার সেই সমুদ্রের রামনক দ্বীপে ফিরে যাও।"
কালীয় ভয়ে ভয়ে বলল, "প্রভু, সেখানে তো গরুড় আমাকে চিবিয়ে খাবে!"
কৃষ্ণ হাসলেন। বললেন, "ভয় নেই। তোমার ফণার ওপর আমার চরণের চিহ্ন এঁকে দিলাম। এই পদচিহ্ন দেখলে গরুড় তোমাকে স্পর্শও করবে না। যে দণ্ড আজ তুমি পেলে, সেটাই তোমার চিরকালের বর্ম হয়ে রইল।"
কালীয় পরম ভক্তিতে কৃষ্ণকে প্রণাম করে সপরিবারে সমুদ্রের দিকে যাত্রা করল। আর সে চলে যাওয়ার পর মুহূর্তেই—
যমুনার রূপান্তর
জলের রঙ কুচকুচে কালো, ঘোলাটে থেকে কাচের মতো স্বচ্ছ, নীল হয়ে গেল,
তাপমাত্রা ফুটন্ত, তপ্ত থেকে শীতল, মিষ্টি হয়ে গেল,
চারপাশের পরিবেশ মৃত পাখি, শুষ্ক কদম্ব পুনরুজ্জীবিত হল।
কৃষ্ণ জল থেকে উঠে এলেন। রাখাল বালকেরা তাকে জড়িয়ে ধরল, যশোদা মা তাকে বুকে চেপে ধরে চোখের জলে ভাসলেন। বৃন্দাবনে আবার আনন্দের জোয়ার এল।
দেবসভায় বসে এই গল্পটাই ইন্দ্র বলছিলেন মহর্ষি লোমশকে। অর্জুনকে কেন নিবাতকবচ রাক্ষসদের বধ করতে পাঠানো হলো, কৃষ্ণের বদলে—সেটার ব্যাখ্যা ছিল এখানেই। কৃষ্ণের শক্তি তো সীমাহীন, তিনি এক নিমেষে সব ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু সেই পরম শক্তি যখন জাগ্রত হয়, তখন তা কোনো গণ্ডি মানে না। যমুনার কালীয় ছিল এক সীমিত সমস্যা, যার দাওয়াই ছিল মায়াময় শাসন আর করুণা। সেখানে ধ্বংসের প্রয়োজন ছিল না, সংস্কারের প্রয়োজন ছিল।
নিবাতকবচদের জন্য প্রয়োজন ছিল অর্জুনের মতো এক নির্দিষ্ট অস্ত্রের, যে কাজ শেষ করে থেমে যেতে জানে। কৃষ্ণ হলেন সেই মহাসমুদ্রের আগুন, যাকে শুধু মহাপ্রলয়ের জন্যই তুলে রাখা ভালো। একটি হলো সুন্দর নৃত্য, অন্যটি হলো সর্বগ্রাসী দাবানল। কোন্ সময়ে কোন্টা প্রয়োজন, সেটুকুই শুধু চিনে নিতে হয়।

Comments
Post a Comment