অন্ধকারের রাজপ্রাসাদে এক ফালি বিষাদের আলো
অন্ধকারের রাজপ্রাসাদে এক ফালি বিষাদের আলো
ইন্দ্রলোকের মেঘের রাজ্যে তখন অর্জুন। মর্ত্যের কোনো মানুষের হাত যা ছুঁতে পারেনি, সেইসব অলৌকিক দৈবাস্ত্রের গোপন বিদ্যা তিনি আয়ত্ত করছেন একাগ্র মনে। কিন্তু ক্ষমতার সেই অলৌকিক খবর তো শুধু স্বর্গের দেবতারা জানবেন না, তা একসময় চুইয়ে নামল মর্ত্যের মাটিতেও। হস্তিনাপুরের অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কানে যখন এই সংবাদ পৌঁছাল, তখন তাঁর বুকের ভেতরটা একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল।
ঠিক সেই সময়েই হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে পা রাখলেন মহর্ষি ব্যাসদেব। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের সামনে এসে বসলেন। ব্যাসদেবের কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত কিন্তু অমোঘ। তিনি কোনো লুকোছাপা না করে স্পষ্ট ভাষায় অন্ধ রাজাকে জানিয়ে দিলেন—মেঘের ওপারের সেই উচ্চতর জগতে অর্জুন কী কী অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। কোন কোন দিব্যাস্ত্র এখন তাঁর হাতের মুঠোয়, এবং ভবিষ্যতে কোন ভয়ানক উদ্দেশ্যে তিনি সেগুলো ব্যবহার করবেন, তার একটা নিখুঁত ছবি এঁকে দিলেন ব্যাসদেব। যা বলার তা বলা হয়ে গেলে, মহর্ষি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না, নগরের ধুলো উড়িয়ে বিদায় নিলেন।
ব্যাসদেব চলে যাওয়ার পর ধৃতরাষ্ট্র দীর্ঘক্ষণ একাকী বসে রইলেন। চারপাশের জমাট অন্ধকার যেন তাঁকে আরও বেশি করে গ্রাস করতে চাইল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি। অবশেষে তিনি ডেকে পাঠালেন সঞ্জয়কে—তাঁর সারথি, তাঁর মন্ত্রী, তাঁর একমাত্র বিশ্বস্ত আশ্রয়। মহর্ষি ব্যাসদেব যা যা বলে গেছেন, তার প্রতিটি শব্দ ধৃতরাষ্ট্র উগরে দিলেন সঞ্জয়ের কাছে।
একটু চুপ করে থেকে বৃদ্ধ রাজা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর কণ্ঠে এমন এক ক্লান্তি আর অবসাদ ঝরে পড়ল, যা আগে কখনো কেউ শোনেনি। তিনি বললেন, “সঞ্জয়, আমার পুত্র দুর্যোধনটা আসলে এক মহামূর্খ। তার বুদ্ধি এতটাই সংকীর্ণ যে সে অবলীলায় অন্যায় করে যায়, অথচ টেরও পায় না যে সেটা পাপ। সে কেবল ইন্দ্রিয়সুখে মত্ত হয়ে আছে। আমার কথা মিলিয়ে নিও সঞ্জয়, এই ছেলেই নিজের বোকামির জন্য একদিন গোটা সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। আর ওদিকে যুধিষ্ঠিরকে দেখো—সে যেন সাক্ষাৎ ধর্মের মূর্ত প্রতীক। জীবনে একটাও মিথ্যে কথা বলেনি সে। আর তার পাশে রয়েছে অর্জুনের মতো ভাই। অর্জুন যার সঙ্গে থাকে, সেই যুধিষ্ঠির অনায়াসে ত্রিভুবন জয় করে নিতে পারে। অর্জুন যখন একবার তার ধনুকে বাণ জোড়ে, তখন এই পৃথিবীর কোনো শক্তির সাধ্য নেই যে তার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়।”
সঞ্জয় সব শুনলেন। মাথাটা সামান্য নিচু করে, বিনীত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, “মহারাজ, দুর্যোধন সম্পর্কে আপনি যা বললেন, তা একবিন্দুও মিথ্যে নয়। আমিও লোকমুখে শুনেছি, অর্জুন স্বয়ং মহাদেব শংকরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। সেই যুবকের সাহস আর রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং মহাদেব নিজের হাতে তাঁকে পাশুপাত অস্ত্র দান করেছেন। শুধু মহাদেব কেন, অর্জুনের কঠোর তপস্যায় স্বর্গের সব দেবতারা এতটাই প্রীত হয়েছেন যে, প্রত্যেকেই তাঁকে নিজেদের সেরা অস্ত্র উপহার দিয়েছেন। অর্জুন সত্যিই এক ভাগ্যবান পুরুষ, মহারাজ। তাঁর ক্ষমতার পরিমাপ করা এখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে।”
ধৃতরাষ্ট্র তাঁর দৃষ্টিহীন চোখ দুটি বন্ধ করলেন। এক তীব্র অপরাধবোধ যেন তাঁর কণ্ঠকে ভারী করে তুলল। তিনি বললেন, “সঞ্জয়, এই দুর্যোধনের জন্যই তো পাণ্ডবদের আজ এই চরম দুর্দশা, এত গভীর যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। অথচ দেখো, দিন যত যাচ্ছে, ওদের শক্তি যেন আরও বাড়ছে। যখন বলরাম আর কৃষ্ণ যদুবংশের বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ওদের পাশে এসে দাঁড়াবে, তখন কৌরবদের কোনো যোদ্ধাই পাণ্ডবদের সামনে টিকতে পারবে না। ভীমের গদা কিংবা অর্জুনের বাণের মুখে কে দাঁড়াবে? যারা আমার মঙ্গল চেয়েছিল, আমি সেদিন তাদের পরামর্শ কানে তুলিনি। শুধু অন্ধের মতো ছেলের আবদার শুনে গেছি। আমার ভয় হচ্ছে সঞ্জয়, নিজের কৃতকর্মের মূল্য এবার আমাকে চড়া দামে চোকাতে হবে।”
সঞ্জয় মৃদু হেসে একটু সহানুভূতির সুরে বললেন, “মহারাজ, আপনি তো কম করেননি, বরং প্রয়োজনের চেয়ে ঢেরই বেশি করেছেন। ছেলেদের প্রতি অন্ধ ভালোবাসার কারণে আপনি তো কোনোদিন তাদের একটা অন্যায় কাজেও বাধা দেননি। আজ যা দেখছেন, তা তো সেই প্রশ্রয়েরই বিষাক্ত ফল। আপনার কি মনে পড়ে মহারাজ, দ্যূতক্রীড়ায় সব হারিয়ে পাণ্ডবরা যখন প্রথম কাম্যক বনে নির্বাসনে গেল, সেখানে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ কী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন? আমি তো তখনই আপনাকে এসে সব বলেছিলাম—কৃষ্ণ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, রাজা বিরাট, ধৃষ্টকেতু, কেকয়রাজ এবং সেখানে উপস্থিত বাকি রাজারা কী আলোচনা করছিলেন।
এরা সবাই যখন একসঙ্গে কৌরবদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে দাঁড়াবে মহারাজ, তখন আমাদের পক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করার মতো কেউ বেঁচে থাকবে কি?”
বৃদ্ধ রাজা আর কোনো উত্তর দিলেন না। হয়তো, আর নতুন করে কিছু বলার অবশিষ্টও ছিল না।
কাম্যক বনের কান্না এবং এক পরম সান্ত্বনা
অনেক দূরে, কাম্যক বনের গহন অন্ধকারে পাণ্ডবরা তখন দিন কাটাচ্ছেন। অর্জুন ছাড়া এই বনবাসের দিনগুলো যেন আরও বেশি ধূসর, আরও বেশি একাকী মনে হচ্ছিল। একদিন সন্ধ্যায়, প্রতিদিনের মতোই ভাইয়েরা যখন একসঙ্গে গোল হয়ে বসে গল্প করছিলেন, তখন ভীম আর নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে চেপে রাখতে পারলেন না। মনের কথা সোজা সাপ্টা বলে ফেলাই তাঁর স্বভাব। তিনি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে গুমরে উঠে বললেন:
“দাদা, আমরা সবসময় অর্জুনের ওপর ভরসা করে এসেছি। ও-ই তো আমাদের এই পরিবারের প্রাণ। তোমার কথা শুনেই ও দেবতাদের রণকৌশল শিখতে ইন্দ্রলোকে গেল, আর আজ কতদিন হলো ও আমাদের কাছে নেই। ওর যদি কোনো ক্ষতি হয়, যদি কোনো বিপদ ঘটে, তবে আমি নিশ্চিত—রাজা দ্রুপদ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি কিংবা স্বয়ং কৃষ্ণও আর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পাবেন না। আমরা তো পাবই না। অর্জুনের এই অসীম শক্তির জন্যই অন্তত শত্রুরা আমাদের কিছুটা হলেও সমীহ করে চলে। আমাদের হাতের জোরের কাছেই তো গোটা দুনিয়া মাথা নোয়ায়, আর কৃষ্ণ তো বন্ধু হয়ে সবসময় আমাদের আড়াল করে রেখেছেন।
দাদা, আমার ভেতরের রাগটা যে কতবার ফুঁসে উঠেছে, তা আমি নিজেই জানি না। ইচ্ছে করে এই মুহূর্তেই হস্তিনাপুরে গিয়ে কৌরবদের নিজের হাতে শেষ করে দিয়ে আসি। শুধু তোমার মুখের দিকে চেয়ে আমি নিজেকে আটকে রেখেছি। কৃষ্ণের সাহায্য নিয়ে আমরা এই মুহূর্তে কৌরব আর কর্ণকে গুঁড়িয়ে দিয়ে গোটা পৃথিবী আমাদের দখলে নিতে পারি। দাদা—দুর্যোধন নিজে বিশ্বজয় করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগেই কি আমাদের উচিত নয় ওদের সমূলে বিনাশ করা? শাস্ত্রেও তো লেখা আছে, শঠের সঙ্গে শঠতা করাই ধর্ম। তুমি শুধু একবার মুখ ফুটে বলো দাদা, আমি আজই এই নাটকের শেষ করে দিচ্ছি।”
যুধিষ্ঠির শান্তভাবে ভীমের সব কথা শুনলেন, একটুও রাগ করলেন না। ভীম থামতেই তিনি এগিয়ে গিয়ে ভাইকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরলেন, ঠিক যেমন কোনো বাবা তাঁর দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা সন্তানকে বুকে টেনে নেন।
অত্যন্ত মৃদু অথচ শান্ত কণ্ঠে যুধিষ্ঠির বললেন, “ভাই আমার, আমরাই শক্তিশালী এবং আমরাই শক্তিশালী থাকব। এই তেরোটা বছর কেটে যাক। তারপর তুমি আর অর্জুন মিলে কৌরবদের যা ইচ্ছে করো, আমি আটকাব না। কিন্তু আমি আমার জীবনে কোনোদিন একটাও মিথ্যে কথা বলিনি, আজ এই বয়সে এসেও বলতে পারব না। সত্যই আমার ধর্ম, আমি তা থেকে বিচ্যুত হব না। আমরা যদি ওদের সততার সঙ্গে, ধর্মযুদ্ধে হারাতে পারি, তবে কেন আমরা ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে যাব?”
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইকে ধৈর্যের পাঠ দিচ্ছেন, তখনই তাঁদের সেই বনের কুটিরে এসে উপস্থিত হলেন পরম শ্রদ্ধেয় মহর্ষি বৃহদশ্ব।
এক মহান ঋষিকে আসতে দেখে যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পরম সমাদরে তাঁকে স্বাগত জানালেন। তাঁর পা ধুইয়ে দিয়ে, জল ও বনের ফলমূল দিয়ে অতিথি সেবা করলেন। বনের কুটিরের সবচেয়ে আরামদায়ক আসনটি পেতে দিলেন ঋষিবরের বসার জন্য।
মহর্ষি যখন শান্ত হয়ে বসলেন, তখন যুধিষ্ঠির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর ভেতরের সব জমানো দুঃখ বাঁধ ভাঙা জলের মতো বেরিয়ে এল। তিনি তাঁদের জীবনের শুরু থেকে ঘটে যাওয়া সমস্ত অন্যায়ের কাহিনী একে একে বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, “মহর্ষি, কৌরবরা এক ছলনার পাশা খেলায় আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। ওটা কোনো খেলা ছিল না মহর্ষি, ওটা ছিল একটা চক্রান্ত। তারা সমস্ত গুরুজন আর রাজাদের সামনে দ্রৌপদীকে চরম অপমান করতেও দ্বিধা করেনি। আর সবশেষে আমাদের এই বনে তাড়িয়ে দিল। আপনিই বলুন মহর্ষি, আপনার এই সুদীর্ঘ জীবনে আমার চেয়ে অভাগা, আমার চেয়ে হতভাগ্য কোনো রাজা কি কখনো দেখেছেন? আমার মতো এত দুঃখ আর কি কোনো মানুষ কোনোদিন পেয়েছে?”
মহর্ষি বৃহদশ্ব যুধিষ্ঠিরের মুখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখে ছিল এক গভীর ও শান্ত দৃষ্টি। তিনি আলতো করে মাথা নাড়লেন।
“ধর্মরাজ,” মহর্ষি বললেন, “তুমি যা ভাবছ, তা সত্যি নয়। এই পৃথিবীতে এমন এক রাজা ছিলেন, যিনি তোমার চেয়েও ঢের বেশি অভাগা, তোমার চেয়েও অনেক বেশি দুঃখ আর যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন। তুমি যদি শুনতে চাও, তবে আমি সেই রাজার গল্প তোমাকে শোনাতে পারি।”
যুধিষ্ঠির বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বললেন, “কৃপা করে বলুন মহর্ষি।” আর তখনই, কাম্যক বনের সেই নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়, মহর্ষি বৃহদশ্ব শুরু করলেন রাজা নলের সেই বিখ্যাত উপাখ্যান।
নলের বিখ্যাত উপাখ্যান- পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন.
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬টি ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১৪ পর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।
Go to all publications for full reading as per index

Comments
Post a Comment