একটা মুকুট, দুই ভাই শান্তনু, আর বাহ্লীক:আর এক নীরব বিসর্জনের গল্প
একটা মুকুট, দুই ভাই শান্তনু, আর বাহ্লীক:আর এক নীরব বিসর্জনের গল্প
পৌরব রাজবংশের ধুলো পড়া ইতিহাসের পাতায় যে গল্পটা সবচেয়ে চুপচাপ হারিয়ে গেছে, সেটা শান্তনু আর বাহ্লীকের আলাদা হয়ে যাওয়ার গল্প।
প্রতীপ তখন হস্তিনাপুরের রাজা। তিন ছেলে তাঁর—দেবাপি, শান্তনু, আর বাহ্লীক। বড় ছেলে দেবাপি ছিলেন গভীর ধার্মিক, সংসারে মন ছিল না তাঁর। চর্মরোগের অজুহাতে তিনি সিংহাসনের দাবি ছেড়ে সোজা চলে গেলেন বনে। রয়ে গেলেন দুই ভাই—শান্তনু আর বাহ্লীক।
শান্তনু ছোট। হস্তিনাপুরের প্রজা আর রাজসভার চোখ সবসময় থাকত বড় ভাই বাহ্লীকের ওপর। সুপুরুষ, সাহসী, সিংহাসনের স্বাভাবিক দাবিদার—সবদিক থেকেই যেন বাহ্লীকের কথা। কিন্তু ইতিহাস কি আর অত সহজে মাপা যায়?
গল্পের শুরুটা হয় উত্তরের এক বিশাল প্রান্তর থেকে। বাহ্লীকের মায়ের বাবা ছিলেন বাহ্লীক দেশের রাজা—আজকের বালখ বা মধ্য এশিয়ার আশপাশের কোনো এক অঞ্চল। তাঁর কোনো ছেলে ছিল না। মরার আগে তিনি হস্তিনাপুরে খবর পাঠালেন—তাঁর রাজ্যটাকে বাঁচাতে একজন যোগ্য রাজপুত্র চাই।
একদিন সন্ধেবেলা যমুনার ধারে দুই ভাই দাঁড়ালেন মুখোমুখি। শান্তনু তখন সবে কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পা দিচ্ছেন, বাহ্লীক ততদিনে পরিণত এক তরুণ।
বাহ্লীক শান্তনুর কাঁধে হাত রাখলেন। ধীর গলায় বললেন, "ছোট, হস্তিনাপুর তোর। গঙ্গার ধারের এই মাটি, এই প্রাসাদ, এই প্রজাদের ভার তুই নে। আমি উত্তরে যাচ্ছি। দাদামশায়ের রাজ্য আজ অরক্ষিত, সেখানে নতুন কাউকে দরকার।"
শান্তনু অবাক হয়ে গেলেন। "দাদা, তুমি বড়। হস্তিনাপুরের মুকুট তো তোমারই পাওয়ার কথা! এই এত বড় দায়িত্ব আমাকে কেন দিচ্ছ?"
বাহ্লীক একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা—যেন সব বুঝে ফেলা একজন মানুষের হাসি। বললেন, "ক্ষমতা, সিংহাসন—এসব তো একটা মোহ মাত্র রে শান্তনু। তুই আমার ছোট ভাই, তোকে ভালোবাসাই তো আমার আসল কাজ। আর তাছাড়া, ওই উত্তরের দেশটা, হিমালয়ের ওপারের ওই প্রান্তর, আমাকে ডাকছে। নতুন কিছু গড়তে হবে সেখানে। আর সত্যি বলতে, আমরা দুজন যদি একসাথে হস্তিনাপুরে থেকে যাই, একদিন না একদিন ক্ষমতার একটা চাপা লড়াই শুরু হয়েই যাবে। সেই বিষ আমি আমাদের বংশে ঢুকতে দিতে চাই না।"
শান্তনু অনেক চেষ্টা করলেন দাদাকে থামাতে। কিন্তু বাহ্লীক ছিলেন এক স্বাধীন, একরোখা মানুষ—যাকে বেঁধে রাখা যায় না। মুকুট, রাজ্যের সব ঐশ্বর্য, নির্দ্বিধায় ছোট ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী আর কিছু বিশ্বস্ত মানুষ নিয়ে তিনি রওনা হয়ে গেলেন সপ্তসিন্ধুর ওপারে।
সেদিন যমুনার ঘাটে দুই ভাইয়ের শেষ আলিঙ্গনে কোনো রাজনীতি ছিল না। ছিল শুধু ভালোবাসা, আর এক নিঃশব্দ ত্যাগ।
বাহ্লীক চলে যাওয়ার পর শান্তনু বসলেন হস্তিনাপুরের সিংহাসনে। আর বাহ্লীক উত্তর-পশ্চিমে গিয়ে গড়ে তুললেন এক শক্তিশালী রাজ্য—নিজের নামেই, "বাহ্লীক রাজ্য"। দুই ভাই আলাদা হয়ে গেলেন ভৌগোলিকভাবে, কিন্তু সেই বিচ্ছেদের ভিত্তি ছিল এক মহৎ আত্মত্যাগ, কোনো ঝগড়া নয়।
পরে শান্তনুর বংশে সিংহাসন নিয়ে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধল—মহাভারতের সেই কুরুক্ষেত্র—বাহ্লীক তখন বহুদূরে, নিজের রাজ্যে। তবু সেই পুরনো বিচ্ছেদের দাম তাঁকে চোকাতে হলো শেষ বয়সে, কুরুক্ষেত্রের মাটিতে এসে দাঁড়িয়ে—শুধুই রক্তের টানে।

Comments
Post a Comment