অক্ষৌহিণী: মহাভারতের সেনাবাহিনী মাপার একক
অক্ষৌহিণী: মহাভারতের সেনাবাহিনী মাপার একক
প্রাচীন ভারতের যুদ্ধ পদ্ধতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায়, সেনাবাহিনীকে সাজানো হতো খুবই নিয়মমাফিক আর হিসেবি উপায়ে। রামায়ণ, মহাভারত আর নানা পুরাণে বিশাল বিশাল সেনার যে সংখ্যা পাওয়া যায়, তার সবচেয়ে বড় একক হলো "অক্ষৌহিণী"। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে ছিল ১১ অক্ষৌহিণী সেনা, আর পাণ্ডবদের পক্ষে ৭ অক্ষৌহিণী—মোট ১৮ অক্ষৌহিণী। এই সংখ্যাটা কিন্তু আন্দাজে বলা কোনো গল্প নয়, এর পেছনে আছে একদম নির্দিষ্ট একটা গাণিতিক হিসেব।
সেনাবাহিনীর চারটে অংশ
তখনকার সেনাবাহিনী গড়ে উঠত "চতুরঙ্গিণী" নীতির ওপর—অর্থাৎ চার রকমের সৈন্য নিয়ে বাহিনী তৈরি হতো: রথ, হাতি, ঘোড়া, আর পদাতিক (হেঁটে চলা সৈন্য)। একটা অক্ষৌহিণী বাহিনীতে এই চার রকম সৈন্য থাকত ১ : ১ : ৩ : ৫ অনুপাতে।
একটা পূর্ণ অক্ষৌহিণীতে কী কী থাকত, দেখে নেওয়া যাক:
- রথ: ২১,৮৭০টি
- হাতি (যুদ্ধহাতি): ২১,৮৭০টি
- ঘোড়া (সওয়ারিসহ): ৬৫,৬১০টি
- পদাতিক সৈন্য: ১,০৯,৩৫০ জন
রথ আর হাতির চালক, আর অন্যান্য সাহায্যকারী মানুষজন মিলিয়ে এক অক্ষৌহিণীতে মোট লোকসংখ্যা দাঁড়াত ২,১৮,৭০০।
ছোট থেকে বড়—ধাপে ধাপে গঠন
একটা অক্ষৌহিণী একবারে তৈরি হয়ে যেত না। ছোট ছোট দল একটার পর একটা জুড়ে জুড়ে তৈরি হতো এই বিশাল বাহিনী। সবচেয়ে ছোট এককটার নাম "পত্তি"।
১ পত্তি = ১টা রথ + ১টা হাতি + ৩টা ঘোড়া + ৫ জন পদাতিক
এই মূল এককটাকে ভিত্তি করেই ধাপে ধাপে সেনার আকার বড় হতো:
1. পত্তি: ১ রথ, ১ হাতি, ৩ ঘোড়া, ৫ পদাতিক
2. সেনামুখ: ৩টা পত্তি মিলে ১টা সেনামুখ
3. গুল্ম: ৩টা সেনামুখ মিলে ১টা গুল্ম
4. গণ: ৩টা গুল্ম মিলে ১টা গণ
5. বাহিনী: ৩টা গণ মিলে ১টা বাহিনী
6. পৃতনা: ৩টা বাহিনী মিলে ১টা পৃতনা
7. চমু: ৩টা পৃতনা মিলে ১টা চমু
8. অনীকিনী: ৩টা চমু মিলে ১টা অনীকিনী
9. অক্ষৌহিণী: ১০টা অনীকিনী মিলে তৈরি হতো ১টা সম্পূর্ণ অক্ষৌহিণী
কুরুক্ষেত্রে অক্ষৌহিণীর হিসেব
মহাভারতে স্পষ্ট করেই বলা আছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মোট ১৮ অক্ষৌহিণী সেনা জড়ো হয়েছিল। এই সংখ্যাটাকে গুণিতক করলে দাঁড়ায়—প্রায় ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার রথ ও হাতি, প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার ঘোড়া, আর প্রায় ১৯ লাখ ৬৮ হাজার পদাতিক সৈন্য। রথে চড়া যোদ্ধা, হাতির পিঠে বসা সেনাপতি, ঘোড়সওয়ার—সব মিলিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ৩৯ লাখেরও বেশি মানুষ।
শেষ কথা
তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, অক্ষৌহিণী শুধু একটা সংখ্যা নয়—এটা আসলে প্রাচীন ভারতের যুদ্ধবিদ্যার নিয়মশৃঙ্খলা আর পরিকল্পনার একটা দারুণ উদাহরণ। এত বিশাল সেনা পরিচালনা করা, তাদের সাজানো, আর যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য সেকালের সেনাপতিরা যে হিসেব আর পদ্ধতি বানিয়েছিলেন, "অক্ষৌহিণী" তারই একটা জীবন্ত প্রমাণ।

Comments
Post a Comment