৷কুরুবংশের সেই অভিশপ্ত জন্মলগ্ন ব্যাসদেবের বর এবং একটি গোপন ভয়


প্রথমে কুরু বংশের জটিল রহস্যটা ছোট করে বুঝে নেওয়া যাক:

রক্তের টান আর কুরু নামের মায়া।ইতিহাস বড় বিচিত্র। আমরা যাদের 'কৌরব' বলে জানি, সেই ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারীর সন্তানদের কেন 'কুরু বংশ' বলা হয়—তার উত্তরটা লুকিয়ে আছে বংশের আদি শিকড়ে।

১. সেই আদি পুরুষ: এই বংশের নাম এসেছিল মহাপ্রতাপশালী রাজা কুরু-র নাম থেকে। তিনি ছিলেন ভরত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁর নামেই সেই বিখ্যাত কুরুক্ষেত্র। ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর একশ ছেলে যেহেতু সেই বংশের সিংহাসনে বসেছিলেন, তাই তাঁরাই হয়ে উঠলেন কুরুদের আসল প্রতিনিধি বা 'কৌরব'।

২. নামের রাজনীতি: মজার ব্যাপার হলো, পাণ্ডবরাও কিন্তু একই বংশের ছেলে। কিন্তু গল্পে দুই পক্ষকে আলাদা করার জন্য পাণ্ডুর ছেলেদের বলা হলো 'পাণ্ডব', আর ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের ওপর সেঁটে দেওয়া হলো আদি পুরুষের নাম—'কৌরব'।

৩. এক আশ্চর্য ধন্দ: এখানেও সেই পরাশর-সত্যবতীর গল্পের একটা অদ্ভুত মোচড় আছে। শান্তনুর বংশের আসল রক্তধারা কিন্তু মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল। ব্যাসদেবের সেই 'নিয়োগ' প্রথার মাধ্যমেই জন্ম নিলেন ধৃতরাষ্ট্র আর পাণ্ডু। অর্থাৎ, শরীরে মুনি-ঋষির রক্ত বইলেও তাঁরা বড় হলেন কুরুদের রাজপ্রাসাদে, তাঁদেরই নীতি আর আদর্শে।

রক্তের চেয়েও বড় হয়ে উঠল উত্তরাধিকার। তাই পরাশরের নাতি আর ব্যাসদেবের ছেলেরা ইতিহাসে আজও কুরু বংশের শেষ প্রদীপ হয়েই জ্বলছেন।

ইতিহাসের চাকা যখন ঘোরে, তখন ছোট ছোট কিছু মানবিক ঈর্ষা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা অজান্তেই এক বিশাল ধ্বংসের পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলে। হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে সেদিনও ঠিক তাই ঘটেছিল।

ব্যাসদেবের বর এবং একটি গোপন ভয়


একদিন মহর্ষি ব্যাসদেব এলেন হস্তিনাপুরে। গান্ধারীর সেবায় তিনি মুগ্ধ হলেন। ঋষিরা যখন তুষ্ট হন, তখন তাঁরা অকৃপণ হাতে বর বিলিয়ে দেন। ব্যাসদেবও চাইলেন গান্ধারীকে কিছু দিতে। ঠিক সেই সময়েই কুন্তী সন্তানসম্ভবা। গান্ধারীর মনের কোণে তখন এক চোরা ভয়—কুন্তীর সন্তান যদি আগে জন্ম নেয়, তবে সে-ই হবে হস্তিনাপুরের যুবরাজ। নিজের গর্ভের সন্তান কি তবে গুরুত্ব হারাবে?

গান্ধারী ভাবলেন, যদি তাঁর অনেকগুলো পুত্র থাকে, তবে তারা সংখ্যায় এবং শক্তিতে কুন্তীর সন্তানকে ছাপিয়ে যাবে। ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর বংশই হবে হস্তিনাপুরের একচ্ছত্র অধিপতি। তাই ব্যাসদেবের কাছে তিনি চাইলেন ধৃতরাষ্ট্রের মতোই একশটি বলবান পুত্র। ব্যাসদেব 'তথাস্তু' বলে বিদায় নিলেন।

লোহার পিণ্ড ও ১০০টি ঘৃতকুম্ভ

গান্ধারী গর্ভবতী হলেন ঠিকই, কিন্তু দুই বছর কেটে গেলেও কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো না। ওদিকে কুন্তীর কোলে এসে গেছে যুধিষ্ঠির। হতাশায় আর যন্ত্রণায় গান্ধারী নিজের উদরে আঘাত করলেন। ভূমিষ্ঠ হলো মাংসের এক কঠিন লোহার মতো পিণ্ড। ব্যাসদেব তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে সব জানতে পেরে ছুটে এলেন। তাঁরই পরামর্শে সেই পিণ্ডকে শীতল জলে সিক্ত করে ১০১টি টুকরো করা হলো।

ব্যাসদেব নির্দেশ দিলেন, এই টুকরোগুলোকে আলাদা আলাদা ঘৃতপূর্ণ পাত্রে ভরে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। এরপর তিনি চলে গেলেন হিমালয়ে তপস্যা করতে। সময় বয়ে চলল। একে একে দু'বছর পূর্ণ হলে সেই পাত্রগুলো খোলার দিন এল।

দুর্যোধনের জন্ম ও অমঙ্গলের সংকেত

প্রথম পাত্রটি যখন খোলা হলো, জন্ম নিল দুর্যোধন। কিন্তু সেই জন্মলগ্নেই প্রকৃতির এক বীভৎস রূপ দেখল হস্তিনাপুর। শিশুটি জন্মানোর পরেই গাধার মতো ডাকতে শুরু করল। বাইরে শেয়াল আর কাকের চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ শুরু হলো বজ্রসহ ঝড়, কোথাও কোথাও বিনা মেঘেই আগুন লেগে গেল।

ভীত ধৃতরাষ্ট্র ডাকলেন ভীষ্ম, বিদুর আর মন্ত্রীদের। তিনি চিন্তিত ছিলেন—যুধিষ্ঠির তো বড়, সে রাজা হবে ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই ছেলে কি কোনোদিন সিংহাসন পাবে? ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে আবার শেয়ালের ডাক শোনা গেল। মহাজ্ঞানী বিদুর কেঁপে উঠলেন। তিনি রাজাকে স্পষ্ট বললেন, "মহারাজ, এই অলক্ষুণে লক্ষণগুলো ভালো নয়। এই শিশুটিই কুরুবংশ ধ্বংসের কারণ হবে। শাস্ত্র বলে, কুল রক্ষার জন্য একজনকে ত্যাগ করা উচিত, গ্রাম রক্ষার জন্য একটি পরিবারকে, আর দেশ রক্ষার জন্য একটি গ্রামকে। এই কুলঙ্গারকে ত্যাগ করুন, পৃথিবী শান্ত হবে।"

কিন্তু অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পিতৃস্নেহ সেই বিবেককেও ছাপিয়ে গেল। তিনি বিদুরের কথা শুনলেন না। একে একে জন্ম নিল আরও ৯৯টি পুত্র, আর একমাত্র কন্যা দুঃশলা।

যুজুৎসু এবং পরবর্তী ইতিহাস


মজার ব্যাপার হলো, গান্ধারী যখন গর্ভবতী ছিলেন, তখন এক বৈশ্য কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের সেবা করতেন। তাঁর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ন্যায়নিষ্ঠ বালক—যার নাম যুজুৎসু। কৌরব ভাইদের মধ্যে সে-ই ছিল ব্যতিক্রম।

পরবর্তীতে ধৃতরাষ্ট্রের সব ছেলেরাই বড় যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠলেন। তাঁদের বিয়ে হলো সুন্দরী রাজকন্যাদের সাথে। আর একমাত্র আদরের বোন দুঃশলার বিয়ে হলো সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের সঙ্গে।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল এক বিশাল শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিদুর জানতেন, সেই ১০১টি ঘৃতকুম্ভের ভেতরে আসলে এক মহাপ্রলয়ের বিষ ঢেলে দিয়ে গেছে নিয়তি। সেই বিষই একদিন কুরুক্ষেত্রের রক্তে ধুয়ে যাবে।


Comments

Popular posts from this blog

"পতন একদিনে হয় না, উত্থানও একদিনে হয় না — কিন্তু সেই একটা মুহূর্তের সিদ্ধান্তই সব ঠিক করে দেয়।"

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয়