অরণ্যবাস ও ব্রাহ্মণকূল: যুধিষ্ঠিরের প্রথম পরীক্ষা
২য় ভাগ- সংক্ষেপে মহাভারতের বনপর্বের
অরণ্যবাস ও ব্রাহ্মণকূল: যুধিষ্ঠিরের প্রথম পরীক্ষা
প্রমাণ নামের সেই বিশাল বটবৃক্ষের নিচে প্রথম রাতটা কেটে গেল অন্য সব অচেনা জায়গার প্রথম রাতের মতোই—মন্থর, বিনিদ্র এবং অরণ্যের নানাবিধ অদ্ভুত শব্দে আকুল। চারপাশের সেই গভীর জঙ্গল যেন এক নতুন ভাষায় কথা বলছিল, যা পান্ডবদের কেউই তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
সকাল হতেই পাণ্ডবেরা শয্যাত্যাগ করলেন। স্নান, আহ্নিক, নিত্যপূজা—সবকিছুই সম্পন্ন করলেন চিরকালের সেই শান্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে। পরিস্থিতি যতই বিপর্যস্ত হোক না কেন, মানুষের জীবনচর্যা তো এক দিনে বদলে যায় না। একজন মানুষ রাতারাতি তার রাজ্য হারাতে পারে, কিন্তু সে যদি যুধিষ্ঠির হয়, তবে তার সকালের প্রার্থনা কখনো বাদ পড়ে না।
তারা যখন অরণ্যের আরো গভীরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই যুধিষ্ঠির পিছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন, গত রাতের অন্ধকারে তাদের চারপাশ ঘিরে জড়ো হয়েছেন অসংখ্য ব্রাহ্মণ। বেদজ্ঞ পণ্ডিত, পুরোহিত ও তত্ত্বজ্ঞানী ঋষিকুল—যাঁরা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এসেছেন এবং তাঁদের চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। যুধিষ্ঠির ক্ষণকাল তাঁদের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর, যে অকৃত্রিম সততা তাঁর চরিত্রের ভূষণ, সেই স্বরেই কথা বলতে শুরু করলেন।
"হে মহাত্মন ব্রাহ্মণগণ," যুধিষ্ঠির বললেন, "আমি আপনাদের সঙ্গে কোনো ছদ্মবেশ না রেখে অত্যন্ত স্পষ্ট কিছু কথা বলতে চাই। আশা করি আপনারা অপরাধ নেবেন না। আমরা আজ সর্বস্বান্ত। আমাদের ধনসম্পদ লুন্ঠিত, রাজ্য কেড়ে নেওয়া হয়েছে, শত্রুরা আমাদের সমস্ত বৈষয়িক সম্বল থেকে বঞ্চিত করেছে। আজ থেকে আমরা অরণ্যের সাধারণ মানুষ—এই বনভূমি আমাদের যে ফলমূল, কন্দ বা শাক দেবে, তা খেয়েই আমাদের দিন কাটাতে হবে। এটাই আমাদের সামনের অমোঘ ভবিষ্যৎ।"
তিনি একটু থামলেন। তাঁর কণ্ঠে একাধারে ঝরে পড়ছিল আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং গভীর উদ্বেগ।
"এই অরণ্যজীবনে আপনাদের এমন সব কষ্ট ও অভাবের মুখোমুখি হতে হবে, যা আপনাদের মতো বিদ্যান এবং তপস্বী মানুষদের অভ্যাসের বাইরে। আপনারা জীবন কাটিয়েছেন শাস্ত্রচর্চায় ও দেব আরাধনায়, বন্য পশুর মতো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার রুক্ষ বাস্তবতায় আপনারা অভ্যস্ত নন। আমি আপনাদের চলে যেতে বলছি না এ জন্য যে আপনারা আমাদের কাছে অনভিপ্রেত—আপনাদের সান্নিধ্য আমার কাছে কতটা আনন্দের, তা আমি মুখে প্রকাশ করতে পারব না। আমি আপনাদের নিজেদের আশ্রমে ফিরে যেতে অনুরোধ করছি কেবল এই কারণে যে, আমাদের জন্য আপনারা কষ্ট পাবেন—এই গ্লানি আমি সইতে পারব না।"
ব্রাহ্মণেরা ধৈর্য ধরে তাঁর কথা শুনলেন। তারপর তাঁরা সমস্বরে উত্তর দিলেন। সেই কণ্ঠে ছিল এমন এক দৃঢ়তা ও স্নেহের ওম, যা কোনো যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায় না।
"রাজন," তাঁরা বললেন, "আমরা আপনার সঙ্গেই থাকতে চাই। কোনো কর্তব্যবোধ বা সামাজিক দায় থেকে নয়, সম্পূর্ণ নিজেদের ভালোবাসায়। দয়া করে আমাদের সেই অনুমতি দিন। আর আমাদের অন্ন ও আশ্রয়ের কথা ভেবে আপনি বিন্দুমাত্র চিন্তিত হবেন না—সে ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করে নেব। আমরা আমাদের ইষ্টদেবতার আরাধনা করব, ধ্যান করব, মন্ত্রোচ্চারণ করব এবং নিজেদের আত্মিক সাধনা চালিয়ে যাব। এই সাধনাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা আপনাকে পুণ্যগাথা শোনাব, আমাদের লব্ধ জ্ঞান ভাগ করে নেব এবং এই অরণ্যে আপনার পাশে শান্তিতে সহবস্থান করব। আমাদের দেখভালের কোনো আর্থিক বোঝা আপনাকে বইতে হবে না।"
যুধিষ্ঠির যখন তাঁদের কথা শুনলেন, তাঁর চোখমুখ এক গভীর আবেগে ভরে উঠল। তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল 'হ্যাঁ' বলতে—এই সজ্জন মানুষদের নিজের কাছে রেখে দিতে, অরণ্যবাসের প্রতিটা সন্ধ্যাকে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ আর তত্ত্বালোচনায় মুখরিত করে তুলতে। জ্ঞানী এবং ধার্মিকদের সাহচর্যই তো বরাবর যুধিষ্ঠিরের অন্তরের প্রধান পুষ্টি ছিল।
কিন্তু তাঁর বিবেক তাঁকে 'হ্যাঁ' বলতে দিল না। তিনি মাথা নেড়ে বললেন:
"আপনারা পরম করুণাময় কথা বলেছেন এবং আমি জানি এ কথার প্রতিটি অক্ষর আপনাদের সরল অন্তঃকরণ থেকে নিঃসৃত। আমিও আপনাদের মতো মহাপুরুষদের মাঝে বাঁচতে চাই—এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আমার আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু এই গভীর অরণ্যে আপনারা নিজেরা নিজেদের আন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করবেন, আর আমাদের সংস্রবে থাকার অপরাধে এত কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করবেন—এই দৃশ্য কল্পনা করলেও আমার বুক ফেটে যায়। এই পাপবোধ আমার বিবেকের ওপর এমন এক পাথরের মতো চেপে বসবে, যা বহন করার ক্ষমতা আমার নেই।"
তিনি একপ্রকার ভেঙে পড়ে মাটিতে বসে পড়লেন। তাঁর শরীরের প্রতিটি রেখায় তখন এক অব্যক্ত দুঃখের ছাপ। যে মানুষটি জন্ম থেকে জেনে এসেছেন অতিথিসেবা করাই রাজার ধর্ম, আশ্রিতকে অন্ন দেওয়া যাঁর পরম কর্তব্য—আজ তিনি এক অরণ্যের বৃক্ষতলে রিক্তহস্তে বসে আছেন, আর শত শত পুণ্যবান মানুষ তাঁর মুখের দিকে চেয়ে আছেন। একজন ধর্মপ্রাণ রাজার পক্ষে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে!
ঠিক এই মুহূর্তেই মহাজ্ঞানী শৌনক এক পা এগিয়ে এলেন। তিনি পরম পণ্ডিত ও আত্মজ্ঞানী পুরুষ, গত রাত থেকেই যুধিষ্ঠিরকে খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের পাশে বসলেন এবং কথা বলতে শুরু করলেন—কোনো সস্তা সান্ত্বনা নয়, বরং এমন কিছু পরিমাপিত, গভীর শব্দ, যা মানুষের দুঃখের মূল উৎসকে ছুঁয়ে যায়।
"হে রাজন," শৌনক বললেন, "আমার কথা মন দিয়ে শুনুন। মূঢ় ব্যক্তিদের জন্য পৃথিবীতে শোক আর ভয়ের হাজারটা কারণ ছড়িয়ে থাকে—সেগুলো অনবরত বাড়তেই থাকে এবং মনকে গ্রাস করে। কিন্তু আপনার মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষ কখনো নিজেকে সেই বন্ধনে বাঁধতে দিতে পারেন না। যাঁরা প্রকৃত জ্ঞানী, তাঁরা এই সমস্ত মানসিক জট থেকে মুক্ত থাকেন। আপনার মন শাস্ত্রের শাসনে তৈরি, আপনার বুদ্ধি জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত। আপনি বিদ্যা ও স্মৃতির জোরে বলীয়ান। এমন মানুষ কখনো ভেঙে পড়তে পারেন না।"
শৌনকের কণ্ঠস্বর ছিল ধীর, শান্ত ও গম্ভীর।
"মহাবীর রাজা জনক একবার বলেছিলেন যে মানুষের জীবনে দুঃখের প্রধান উৎস চারটি। প্রথমটি রোগব্যাধি। দ্বিতীয়টি হলো দুঃখের উপাদানের সংস্পর্শে আসা—অর্থাৎ এমন কিছু বস্তু, মানুষ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া যা বেদনা দেয়। তৃতীয়টি অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ক্লান্তি। আর চতুর্থটি হলো নিজের কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি না পাওয়া। এই চারটি জিনিস মানুষের মনকে ব্যাকুল করে তোলে, আর ব্যাকুল মন শরীরকে দুর্বল করে দেয়। একটি উদাহরণ দিই—একটি তপ্ত লোহার টুকরো যদি এক পাত্র জলের মধ্যে ফেলে দেওয়া যায়, তবে সেই জলও গরম হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনই, মানসিক কষ্টকে যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে তা এক সময় শারীরিক যন্ত্রণায় রূপ নেয়। মন আর শরীরের সম্পর্ক এমনই নিবিড়।"
যুধিষ্ঠির কোনো বাধা না দিয়ে স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন। শৌনক বলতে থাকলেন:
"কিন্তু যেমন শীতল জল অগ্নিনির্বাপণ করে, তেমনই শান্ত ও স্থির জ্ঞান মনের সমস্ত বিকৃতিকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে। আপনি যদি আপনার মনকে স্থির রাখতে পারেন, তবে আপনার শরীরও শক্ত থাকবে। এটা কোনো বায়বীয় দর্শন নয় রাজন, এটাই জীবনের অমোঘ বাস্তব সত্য।"
একটু থেমে শৌনক এবার সমস্যার আসল শিকড়টার দিকে আলো ফেললেন।
"আসক্তি," তিনি মৃদুস্বরে বললেন, "আসক্তিই হলো মনের সমস্ত দুঃখের জননী। এই আসক্তিই মানুষকে কোনো বস্তু বা ফলাফলের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। ভয়, শোক আর অনুতাপের একমাত্র কারণ এই আসক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ ভালোবাসার টানে কোনো কিছুর প্রতি অন্ধ হয়ে পড়ে, আর যখন সেই জিনিসটি হারিয়ে যায় বা বিপন্ন হয়, তখন দুঃখের রাত নেমে আসে অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে।"
কথাটা যুধিষ্ঠিরের মনে গেঁথে যাওয়ার জন্য তিনি কয়েক মুহূর্ত নীরব রইলেন, তারপর আবার শুরু করলেন:
"ভেবে দেখুন, একটা গাছের কোটরে যদি আগুন জ্বলে ওঠে, তবে সে ভেতর থেকে গোটা গাছটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ঠিক তেমনি, ঈর্ষা বা লালসার একটা ছোট বীজও মানুষের সমস্ত পুণ্য ও সমৃদ্ধিকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে খাক করে দিতে পারে।"
"যিনি প্রকৃত ত্যাগী," শৌনক বললেন, "তিনি হয়তো পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মালিক হতে পারেন, কিন্তু মনে মনে তিনি জানেন যে এর কোনো কিছুই তাঁর নিজস্ব নয়। যিনি জাগতিক লালসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তিনি সমস্ত হিংসা-দ্বেষের ঊর্ধ্বে এবং কর্মের শিকল তাঁকে বাঁধতে পারে না। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার বা সচ্ছল জীবনযাপন করার মধ্যে কোনো অন্যায় নেই—কিন্তু সেইসব জিনিসের প্রতি আসক্ত বা অন্ধ হয়ে যাওয়াটাই হলো বিনাশের কারণ।"
ঋষির কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা নরম হলো।
"জ্ঞান আর বিবেকের আলো দিয়ে নিজেকে মোহমুক্ত করুন রাজন। পদ্মপাতার ওপর জল পড়লেও পাতাটি কিন্তু সেই জলকে ধরে রাখে না—জলবিন্দু তার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়, পাতাকে ভেজাতে পারে না। একজন বিবেকবান, সত্যসন্ধানী এবং আত্মজ্ঞানী মানুষের চরিত্রও ঠিক তেমনই হওয়া উচিত—আসক্তি তাঁকে কখনো স্থায়ীভাবে গ্রাস করতে পারে না। তিনি চারপাশের স্নেহ-ভালোবাসা গ্রহণ করেন, ফিরিয়েও দেন, কিন্তু তাতে ডুবে যান না।"
শৌনকের কথায় এবার একটু তীক্ষ্ণ ধার প্রকাশ পেল।
"জাগতিক বিষয় মনের মধ্যে লালসা তৈরি করে। লালসা থেকে জন্ম নেয় সেই বিষয়কে পাওয়ার অন্ধ বাসনা। আর যখন মানুষ সেই জিনিসটি পেয়ে যায়, তখন কিন্তু তার ইচ্ছা ফুরিয়ে যায় না—বরং তা আরো বেড়ে যায়, আরো নতুনের দিকে হাত বাড়ায়। এই লোভই হলো সমস্ত পাপের মূল। আর এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা কী জানেন? মানুষের বার্ধক্য এলেও এই লোভের কখনো বার্ধক্য আসে না। আশি বছরের একজন বৃদ্ধও বিশ বছরের যুবকের মতোই লোভে অন্ধ হতে পারেন। এটি এমন এক ব্যাধি যা শরীর ও মন দুই জায়গাতেই বাসা বাঁধে, যার কোনো পার্থিব ওষুধ নেই। প্রকৃত শান্তি, চিরন্তন শান্তি কেবল সেই মানুষটাই পেতে পারেন, যিনি এই তৃষ্ণা থেকে মুক্ত।"
সবশেষে তিনি একবারে সোজাসুজি মোক্ষম কথাটি বললেন:
"প্রচুর ধনসম্পদ জমা করে এই পৃথিবীতে কোনো মানুষ কখনো সুখী হতে পারেনি। কিন্তু যে মানুষ তার যা আছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট—তার পরিমাণ যতই কম হোক না কেন—এবং দিনরাত পাওয়ার আশায় হাহাকার করে মরে না, সেই মানুষটাই চিরসুখী। ধার্মিক জীবনযাপনের জন্য সম্পদের প্রতি লোভী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অতএব রাজন—আজ আপনার যা আছে, তার চেয়ে বেশি কিছুর আকাঙ্ক্ষা করবেন না। আপনি যদি ধর্মের পথে চলতে চান, তবে এখন যেভাবে আছেন, ঠিক সেভাবেই বাঁচুন। এটাই আপনার জন্য প্রকৃত ও একমাত্র পথ।"
যুধিষ্ঠির তাঁর মাথা তুললেন এবং অত্যন্ত সততার সঙ্গে উত্তর দিলেন:
"হে ব্রাহ্মণ, আমি চাই আপনারা আমার মনের কথাটি পরিষ্কারভাবে বুঝুন। আমি নিজের ভোগবিলাস বা আরামের জন্য সম্পদের লালসা করছি না। আমার নিজের জন্য কোনো ক্ষোভ বা লোভ নেই। আমার যন্ত্রণার কারণ অন্য জায়গায়—আমি আপনাদের সবাইকে অন্ন দিতে পারছি না। আমি পাণ্ডুবংশের সন্তান, জন্ম ও সংস্কারে আমি গৃহস্থ। একজন গৃহস্থের পরম ধর্ম হলো অতিথির জন্য অন্ন রান্না করা, আশ্রিত সাধু-সন্ন্যাসীদের সেবা করা এবং যাঁরা তাঁর সঙ্গে চলেছেন তাঁদের আশ্রয় দেওয়া। এটা আমার রাজকীয় অহংকার বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়—এটাই আমার ধর্ম, আমার ক্ষাত্রধর্ম ও গৃহস্থধর্ম। আর আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি আমার সেই পরম ধর্ম পালন করতে পারছি না। এই অক্ষমতাই আমাকে তিলে তিলে দগ্ধ করছে।"
শৌনক মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না—ছিল কেবল অগাধ সহানুভূতি ও প্রজ্ঞা।
"হে ধর্মরাজ," তিনি বললেন, "আপনার জীবনের এটাই বোধহয় ধর্মের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আপনার মতো পুণ্যবান ও দয়ালু মানুষ অতিথিদের না খাইয়ে নিজেরা একগ্রাস অন্ন মুখে তুলতে পারেন না। চারপাশের মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে আপনারা নিজেরা উপোস করে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। অথচ এই পৃথিবীতেই এমন কিছু পাপিষ্ঠ মানুষ আছে যারা অন্যের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে নিজের পেট ভরায়। এই বৈপরীত্য আমাদের সবারই চোখে পড়ে।"
তিনি একটু থামলেন।
"কিন্তু বেদের উপদেশ শুনুন রাজন। যে মানুষ নিজের কর্তব্য বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মের সঙ্গে পালন করে—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, যিনি নিজের সততা বিসর্জন দেন না—তিনি শেষ পর্যন্ত জন্ম ও মৃত্যুর এই অন্তহীন চক্র থেকে মুক্তি পান। এটাই সৎ কর্মের সর্বোচ্চ পুরস্কার।"
তিনি যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন।
"তাই ধর্মরাজ, আপনাকে আমার পরামর্শ—বেদের নির্দেশ মেনে চলুন। আপনার নিত্যদিনের প্রার্থনা করুন, ঈশ্বরের আরাধনা করুন। আর এই প্রার্থনা করুন যেন আপনার চারপাশের এই ব্রাহ্মণদের ঈশ্বর সেই অন্তরের শক্তি এবং বাস্তব সামর্থ্য দেন, যাতে তাঁরা এই অরণ্যে আপনার পাশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারেন। এটুকুই আপনার করণীয়। বাকিটা আপনি দেবতাদের ওপর এবং এই অরণ্যের ওপর ছেড়ে দিন। যে মানুষ সরল ও সৎ হৃদয়ে বাঁচে, প্রকৃতি ও ঈশ্বর তার অন্নসংস্থান কোনো না কোনোভাবে করে দেন।"
যুধিষ্ঠির দীর্ঘক্ষণ এই গভীর কথাগুলো নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
তাঁর চারপাশে তখন অরণ্যের মৃদু বাতাস বইছে, গাছের পাতাগুলো চঞ্চল হয়ে উঠছে। কাছেই কোথাও কোনো পাহাড়ি নদী কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছিল। ব্রাহ্মণেরা পরম শ্রদ্ধায় ও নীরবতায় অপেক্ষা করছিলেন এবং গভীর চোখে দেখছিলেন তাঁদের প্রিয় নেতাকে—এই এক রাজ্যহীন রাজা, যিনি বনের রুক্ষ মাটিতে বসে আছেন, যাঁর সমস্ত বৈষয়িক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অথচ যিনি নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন শত শত মানুষের কল্যাণের এক পরম অদৃশ্য দায়িত্ব।
পাণ্ডবদের অরণ্যবাসের এটাই ছিল প্রথম প্রকৃত সকাল। দীর্ঘ তেরো বছরের সেই কঠিন ও মায়াবী বনবাসের দিনগুলো এভাবেই শুরু হয়ে গেল।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি অংশে এবং সভা পর্ব ১৬টি অংশে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ২য় অংশের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

Comments
Post a Comment