নির্বাসনের পথ: হস্তিনাপুর ত্যাগ
উত্তরমুখী পথ ধরে তাঁরা এগিয়ে চললেন।
শকুনি অক্ষক্রীড়ার ছক কষেছিল, আর দুর্যোধন মেতেছিল সিংহাসনের অন্ধ কামনায়। সেই কপট পাশার দানে সর্বস্ব হারিয়ে—রাজ্য, ঐশ্বর্য, এমনকী নিজের আত্মমর্যাদাটুকুও খুইয়ে—পাঁচ পাণ্ডব ভাই আজ হস্তিনাপুরের রাজপথ দিয়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে এলেন। পাশে দ্রৌপদী। সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত এক অনিশ্চিত পথ। তাঁদের সঙ্গে কোনো রাজছত্র নেই, রাজকোষ নেই, নেই কোনো চতুরঙ্গ সেনা। আছে শুধু তাঁদের নিজেদের শরীর আর অন্তরের দহন।
প্রাসাদ থেকে পা বাড়াতেই তাঁদের পিছনে এসে দাঁড়ালেন ইন্দ্রসেন—পাণ্ডবদের আজীবনের বিশ্বস্ত প্রধান অনুচর। সঙ্গে চব্বিশজন ভৃত্য, প্রত্যেকের সাথে তাঁদের স্ত্রীরা। এঁদের কাউকে ডেকে নিতে হয়নি, কোনো আদেশ বা অনুরোধের অপেক্ষা তাঁরা করেননি। রাজপরিবারের এই চরম বিপর্যয়ের দিনে তাঁরা নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছিলেন পলকের মধ্যে। যে পাণ্ডবেরা তাঁদের এতদিন আগলে রেখেছেন, তাঁদের এমন একাকী এই গভীর অরণ্যের দিকে চলে যেতে দিতে অন্তরে সায় দেয়নি এই সামান্য মানুষদের।
এদিকে হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে তখন এক থমথমে অন্ধকার। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর বিষাদ মিলেমিশে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
নাগরিকেরা নিজেদের চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে সবটা—সেই পাশাখেলার দম্ভ, কুরুসভার মাঝখানে দ্রৌপদীর চরম লাঞ্ছনা, আর কুলের সেইসব মহৎ গুরুজনদের মেরুদণ্ডহীন নীরবতা, যাঁরা চাইলে এই পাপ রুখতে পারতেন। আর আজ, যাঁদের তাঁরা ভালোবেসেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন আজীবন, সেই পাঁচ যুবরাজ মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছেন নগর ছেড়ে। এই নির্মম সত্যটা যখন শহরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, তখন অনেকেই আর তা সহ্য করতে পারলেন না।
রাস্তায়, ঘরের দাওয়ায় সাধারণ মানুষ ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল, আর সেইসব কথায় কোনো জড়তা ছিল না, ছিল এক অমোঘ সত্যের স্পষ্ট উচ্চারণ।
"ক্রূর দুর্যোধন এবার এই রাজ্য শাসন করবে ওই কুটিল শকুনির বুদ্ধিতে," একজন প্রবীণ নাগরিক বলে উঠলেন। "যে হাত আজ ক্ষমতা দখল করেছে, সেখানে কোনো ধর্মের ছোঁয়া নেই। এমন মানুষের অধীনে আমরা হস্তিনাপুরে শান্তিতে বাঁচব কী করে? আমাদের ভবিষ্যৎ কী? কিসের আশা নিয়ে টিকে থাকব এখানে?"
এই অন্ধকারের মধ্যেই তাঁরা এক অদ্ভুত, অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন। মনে মনে, নিঃশব্দে একজোট হলেন সকলে।
"চলো, পাণ্ডবেরা যেখানে যাচ্ছেন, আমরাও সেখানেই যাই। ওই কপট, দুর্নীতিবাজদের রাজপ্রাসাদে থাকার চেয়ে বনের মধ্যে সত্যনিষ্ঠ মানুষদের পাশে থাকা অনেক বেশি সুখের।"
যেমন কথা, তেমনই কাজ। হস্তিনাপুরের এক বিশাল জনতা—যাঁরা এই শহরেই নিজেদের সংসার পেতেছিলেন, যাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার বৈষয়িক কোনো কারণই ছিল না, কেবল মনের ভেতরের এক তীব্র নৈতিক তাড়নায় তাঁরা শহরের সীমানা পেরিয়ে পা বাড়ালেন। উত্তরের পথ ধরে দ্রুত হেঁটে একসময় তাঁরা ধরে ফেললেন পাণ্ডবদের। যখন সামনাসামনি দেখা হলো, তাঁদের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল এক দৃঢ় সংকল্পের সুর, যা সহজে ভাঙার নয়।
যুধিষ্ঠিরের পথ আটকে দাঁড়িয়ে এক আবেগঘন কণ্ঠে তাঁরা বললেন, "আমাদের ওই অধার্মিক, পাপের নগরীতে ফেলে রেখে আপনারা কোথায় চলে যাচ্ছেন হে ধর্মরাজ? কৌরবেরা আপনাদের সাথে যা যা করেছে, সব আমরা নিজের চোখে দেখেছি। আমাদের ত্যাগ করবেন না। আমাদেরও সাথে নিয়ে চলুন। ওই পাপিষ্ঠ দুর্যোধনের ছায়ায় আমরা আর থাকতে চাই না, আমরা আপনাদের পাশেই থাকতে চাই।"
মানুষগুলোর মুখাবয়বে গভীর আর্তি আর উৎকণ্ঠা। তাঁরা পথ জুড়ে যুধিষ্ঠিরকে ঘিরে দাঁড়ালেন। ভিড়ের মধ্য থেকে আরও কিছু গলা ভেসে এলো:
"দুর্যোধনের মতো এক পতনোন্মুখ, চরিত্রহীন রাজার অধীনে যদি আমরা হস্তিনাপুরে থেকে যাই, তবে আমাদেরও অধঃপতন হবে। আমাদের চারপাশের এই দুর্নীতি আমাদেরও অধার্মিক আর অসুখী করে তুলবে। আমরা তেমন জীবন চাই না। আমরা আপনাদের মতো সৎ আর ধার্মিক মানুষদের মাঝে বাঁচতে চাই।"
যুধিষ্ঠির শান্তভাবে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলেন, একটিবারও মাঝপথে কাউকে থামিয়ে দিলেন না। কথা শেষ হলে তিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এই সাধারণ মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা তাঁর অন্তরের গভীরে গিয়ে আঘাত করেছিল। এরপর যখন তিনি মুখ খুললেন, তাঁর কণ্ঠে ছিল সেই চিরপরিচিত মৃদুতা আর গভীর বিনয়, যা শত বিপদেও তাঁকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে রাখে।
"আমাদের প্রতি ভালোবাসার টানেই আপনারা এই উদার কথাগুলো বলছেন," যুধিষ্ঠির বললেন, "এবং আমরা আপনাদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ। আমাদের এই দুর্ভাগ্যের দিনে আপনারা আমাদের যতটা যোগ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি সম্মান দিচ্ছেন। কিন্তু আমি আপনাদের কাছে হাত জোড় করে একটা কথা বলি—আমাদের এতখানি কৃতিত্ব দেবেন না। আমাদের মধ্যে যদি কোনো ভালো গুণ থেকে থাকে, তবে তা আপনাদের এই অকৃত্রিম স্নেহেরই প্রতিচ্ছবি মাত্র।"
একটু থেমে, অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধীর কণ্ঠে তিনি আসল কথাটা বললেন।
"একবার ভাবুন, যাঁরা হস্তিনাপুরে রয়ে গেলেন তাঁদের কথা। আমাদের বৃদ্ধ জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র সেখানে আছেন—যিনি অন্ধ, জরাজীর্ণ এবং এই মুহূর্তে এক গভীর অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছেন। আছেন পিতামহ ভীষ্ম, পরম জ্ঞানী বিদুর। আছেন আমাদের জননী কুন্তী আর গান্ধারী। এঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে এক চরম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আর এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে কিছু ভালো মানুষের থাকা বড্ড প্রয়োজন। আপনাদের প্রয়োজন ওখানে, আমাদের সাথে এই অরণ্যে নয়।"
তিনি সমবেত জনতার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো আর্দ্র, কিন্তু কণ্ঠে এক অলঙ্ঘনীয় সিদ্ধান্ত।
"আপনারা যে এতটা পথ আমাদের সাথে হেঁটে এসেছেন, সেটাই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। কিন্তু আর নয়। এবার আপনারা হস্তিনাপুরে ফিরে যান। আমার সেইসব পরিজনেরা, যাঁরা আজ চরম শোকে আকুল, আপনাদের উপস্থিতি তাঁদের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেবে। আপনারা যদি সত্যিই আমাকে সুখী দেখতে চান, তবে আমার এই একটা অনুরোধ রাখুন। ফিরে যান, আর তাঁদের একটু আগলে রাখুন।"
এই কথার পর আর কোনো তর্কের অবকাশ থাকে না। যুধিষ্ঠির তাঁদের কোনো আদেশ দেননি, কর্কশভাবে চলেও যেতে বলেননি। তিনি শুধু এমন এক আত্মমর্যাদা আর পরার্থপরতা নিয়ে অনুরোধটা করেছিলেন যে, তার ওপর কথা বলা কারো সাধ্যে কুলোল না।
নাগরিকেরা আরও কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন—অসহায়, স্তব্ধ, বিষণ্ণ। তারপর, ভারী মন আর চোখের জল লুকিয়ে, তাঁরা ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। শুরু হলো হস্তিনাপুরের দিকে ফিরে যাওয়ার সেই দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পথচলা।
তাঁদের বুকে তখন কেবলই এক অন্তহীন হাহাকার। তবুও, তাঁরা ফিরে গেলেন।
পাণ্ডবেরা আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
দিনের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছে এবং সন্ধ্যার ধূসর ছায়া নামছে পৃথিবীর বুকে, তখন তাঁরা এসে পৌঁছলেন পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল, প্রাচীন বটবৃক্ষ—যার নাম 'প্রমাণ'। সেই মহীরুহের সুবিস্তৃত ছায়ার নিচে, শান্ত নদীর কলতানে মুখরিত আশ্রয়ে তাঁরা সেদিনের মতো যাত্রা শেষ করলেন।
নদীর শীতল জলে তাঁরা হাত-মুখ ধুয়ে নিলেন। কোনো আহার্য নেই, পাত্র থেকে কেবল সামান্য জল পান করে তাঁরা সেই গাছতলার ঠান্ডা অন্ধকারে এসে বসলেন।
তবে সেই নির্জনতাও বেশি ক্ষণ স্থায়ী হলো না। অন্ধকার ভেদ করে একে একে আসতে লাগলেন ব্রাহ্মণেরা—তাঁদের কেউ ডাকেনি, কোনো রাজকীয় আমন্ত্রণ ছিল না। কেবল যুধিষ্ঠিরের পুণ্য আর জ্ঞানযোগের আকর্ষণে, যেমনটা বরাবর হয়ে এসেছে, এই বিদগ্ধ ও ধর্মপ্রাণ মানুষেরা নিজেদের তাগিদেই ছুটে এলেন। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁরা সেই বটবৃক্ষের নিচে আসন গ্রহণ করলেন। রাত যত গভীর হতে লাগল, নদীর তীরের সেই নিকষ অন্ধকার ছাপিয়ে বাতাসে ভেসে আসতে লাগল পবিত্র বেদমন্ত্রের উচ্চারণ আর শাস্ত্রের গূঢ় আলোচনা। সেই গম্ভীর, শান্ত কণ্ঠস্বরগুলো রাতের অন্ধকারকে এক অপার্থিব রূপ দিল।
এ কোনো রাজপ্রাসাদ নয়। এ নয় সেই মায়াবী ইন্দ্রপ্রস্থ। এক রাজপুত্রের জীবন থেকে যা যা প্রত্যাশিত, তার কিছুই এখানে ছিল না।
কিন্তু এখানে ছিল প্রবহমান গঙ্গা, ছিল শতবর্ষের প্রাচীন সেই বটবৃক্ষ, পাশে ছিলেন কিছু পরমাত্মীয় সৎ মানুষ, আর ছিল এক পরম তৃপ্তি—হস্তিনাপুর ছেড়ে আসার সময় তাঁরা নিজেদের ধর্ম আর সম্মানটুকু বিসর্জন দিয়ে আসেননি।
নির্বাসনের প্রথম রাতের জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল।
বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১টি অংশে এবং সভা পর্ব ১৫টি অংশে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে বনপর্বের ১ম অংশের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত অংশ এই ব্লগেই পাওয়া যাবে।

Comments
Post a Comment