মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম
মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম
ইন্দ্রপ্রস্থে দিনগুলো বেশ কাটছিল, কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে বিদায়ের সুর বাজল। শ্রীকৃষ্ণ স্থির করলেন এবার তাঁকে দ্বারকায় ফিরতে হবে। অর্জুনের মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কৃষ্ণের সান্নিধ্য মানেই তো এক বুক আত্মবিশ্বাস আর অনাবিল আনন্দ। যাওয়ার বেলায় কৃষ্ণ হাসিমুখে আশ্বস্ত করলেন, "পার্থ, যখনই আমায় স্মরণ করবে, আমি তোমার পাশেই থাকব।" পরম মমতায় সবাইকে বিদায় জানিয়ে তিনি দ্বারকার পথে রওয়ানা হলেন।
কৃষ্ণ চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই অর্জুনের সামনে এসে দাঁড়ালেন ময় দানব। খাণ্ডবদাহনের সেই ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড থেকে অর্জুনই তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতা ময় ভোলেননি। তিনি চাইলেন পান্ডবদের জন্য বিশেষ কিছু করতে।
ময় বিনম্র স্বরে বললেন, "হে মহাবীর, আমি মৈনাক পর্বতের দিকে যাত্রা করতে চাই। সেখানে বিন্দুসর হ্রদের কাছে এককালে দানবরাজ বৃষপর্বার রত্নভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিলাম। যদি সেগুলো আজও অবিকৃত থাকে, তবে আমি তা আপনার জন্য নিয়ে আসব। সেখানে ভীমের জন্য এক অজেয় গদা আর আপনার জন্য 'দেবদত্ত' নামক এক দিব্য শঙ্খও রক্ষিত আছে।"
কথা শেষ করেই ময় উত্তর দিকে যাত্রা করলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেই পবিত্র বিন্দুসরে পৌঁছলেন, যেখানে রাজা ভগীরথ গঙ্গা আনয়নের জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। স্থানটি ছিল অলৌকিক মহিমায় ভাস্বর—প্রজাপতি ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ইন্দ্র, যম ও মহাদেব সেখানে যজ্ঞ করেছিলেন। ময় দানব নিপুণভাবে খুঁজে বের করলেন সেই গুপ্ত ঐশ্বর্য। রাশি রাশি রত্ন, স্বর্ণালঙ্কার আর সেই কাঙ্ক্ষিত গদা ও দেবদত্ত শঙ্খ নিয়ে তিনি ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে এলেন।
অর্জুন হাতে পেলেন চাঁদের মতো উজ্জ্বল দেবদত্ত শঙ্খ, যার ধ্বনি শত্রুর হৃদয়ে কম্পন ধরায়। ভীম পেলেন তাঁর সেই বিশাল গদা। উপহার প্রদানের পর ময় দানব শুরু করলেন তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি—যুধিষ্ঠিরের জন্য এক রাজসভা বা 'ময়সভা' নির্মাণ। আট হাজার কিঙ্কর দানব দিনরাত পরিশ্রম করে গড়ে তুলল এমন এক প্রাসাদ, যা মর্ত্যের মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়।
সেই সভার কারুকাজ ছিল বড় অদ্ভুত। মাঝখানে এক স্বচ্ছ সরোবর, যার সিঁড়িগুলো রত্নখচিত। জলে ফুটে আছে হরেক রঙের পদ্ম। কিন্তু ময়ের মায়াবি কারসাজিতে সেই জলাশয়কে মনে হতো নিরেট চাতাল। বহু অভ্যাগতই সেখানে স্থলভ্রমে জলে পা দিয়ে ফেলতেন। চারদিকে সুগন্ধি বৃক্ষ আর রত্নদ্যুতিতে ঝকঝক করছিল সেই স্বর্গীয় সভা।
শুভ দিনে সভার উদ্বোধন হলো। দেশ-দেশান্তর থেকে ঋষি, ব্রাহ্মণ ও রাজন্যবর্গ এলেন। যুধিষ্ঠির অকাতরে দান করলেন সহস্র গাভী ও স্বর্ণ। শঙ্খধ্বনি আর মঙ্গলাচরণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ভ্রাতৃবর্গসহ সিংহাসনে বসলেন। আসিতে, ব্যাসদেব আর দেবল ঋষির উপস্থিতিতে সেই সভা এক অপার্থিব রূপ নিল।
ঠিক সেই সময়েই সেখানে পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। বেদ-পুরাণে অগাধ পাণ্ডিত্য আর ত্রিলোক ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ নারদের আগমনে সবাই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন। যুধিষ্ঠির যথোচিত সম্মানে তাঁকে অর্ঘ্য নিবেদন করলেন। নারদ খুশি হয়ে পাণ্ডবদের রাজধর্ম ও সুশাসনের গূঢ় তত্ত্ব বোঝাতে শুরু করলেন।
তিনি বললেন, "যুধিষ্ঠির, রাজৈশ্বর্য যেন কখনও তোমাকে অন্ধ না করে। মনে রেখো, প্রজার সুখেই রাজার সুখ। একজন প্রকৃত রাজাকে হতে হবে বীর্যবান, বুদ্ধিমান এবং ন্যায়পরায়ণ। দণ্ডনীতি আর ক্ষমার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।"
নারদ আরও শোনালেন ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলারক্ষা আর দুস্থদের সেবা করার কথা। তিনি সতর্ক করলেন, অহংকার যেন কখনও তাঁদের ভ্রাতৃপ্রেমে ফাটল না ধরায়। যুধিষ্ঠির গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই অমূল্য উপদেশগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিলেন। এইভাবে ঋষিদের আশীর্বাদ আর দিব্য ঐশ্বর্যে ইন্দ্রপ্রস্থের গৌরব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল।

Comments
Post a Comment